এক রক্তাক্ত ইতিহাস পেরিয়ে ইউরোপের বুকে দাঁড়িয়ে আছে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা। এই ভ’খন্ডের পেছনের কথা, আর সার্ব সেনাদের নৃশংসা ইউরোপের জন্য তৈরি করেছে লজ্জার একটি অধ্যায়।
সেই লজ্জা থেকে মুক্ত নয়, বৈশ্বিক শান্তির প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘও।
পঁচিশ বছর আগে স্রেব্রেনিকা শহরের সেই গণহত্যা হয়েছিলো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের সামনেই। ওই হত্যাযজ্ঞ নীরবে দাঁড়িয়ে দেখছিলো ডাচ শান্তিরক্ষীরা।
জন্মভূমির যখন এই অবস্থা, তখন গোটা জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে জাদুকরি পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন এক নায়ক।
ওই নায়কের নাম আলিজা ইজেতবেগোভিচ। গত ৮ আগস্ট পালন করা হলো তাঁর ৯৫তম জন্মদিন। ১৯২৫ সালের এই দিনে জন্মেছিলেন তিনি। এই নেতা পৃথিবী থেকে চলে গেছেন অক্টোবর মাসের ১৯ তারিখ, খুবই স্বাভাবিকভাবে। সময়টা ছিলো ২০০৩ সাল।
জীবনের এই সময়টুকুর পুরোটাই ছিলো উত্তাল। শুরুর দিকে পড়াশুনা নিয়ে কাটালেও অর্ধেক জীবন গেছে তার লড়াইয়ে।
ওই লড়াইয়ের ইতিহাস এখনো ভুলতে পারেনি বসনিয়া-হারজেগোভিনা। সারবিয়ার দেওয়া সেই যন্ত্রণার স্মৃতি অতো সহজে ভুলে যাওয়ার নয়। ইউরোপের জঘণ্যতম দিনগুলো রক্তের রঙ নিয়েই তথাকথিত সভ্যতার পতাকাধারীদের লজ্জা দিয়ে যাচ্ছে এখনো।
সার্ব সেনাদের উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা আর মুসলিম বিদ্বেষ ডেকে এনেছিলো ধ্বংসের দিন। ওইসব দিনে চোখ বন্ধ ছিলো ‘সভ্য বিশ্বে’র। তখন নিজেদের লড়াই নিজেদের মতো করেই লড়তে হয়েছিলো আলিজাদের। সেই লড়াই থেকেই তৈরি হয়েছে আজকের প্রকৃত স্বাধীনতা।
উত্তলা সময়ে স্রেব্রেনিকা ছিলো জাতিসংঘ ঘোষিত নিরাপদ এলাকা। বসনিয়া আর হার্জেগোভিনা থেকে নির্যাতিত মুসলমানরা দলে দলে স্রেব্রেনিকায় এসে আশ্রয় নিতো। ওখানে তাঁবু গেড়ে দিয়েছিলো জাতিসংঘ। অভয় দেওয়া হয়েছিলো, নিরাপদ এই শহরে কোনো আক্রমণ হবে না।
জাতিসংঘ ওই এলাকায় অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দেয়। এতে নির্যাতিত মুসলমানদের হাতে প্রতিরোধের জন্য যেসব হালকা অস্ত্র ছিলো, সেগুলোও কেড়ে নেয়া হয়। মুসলমানরা অস্ত্র রাখার আবেদন করলে, তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
অন্যেিদক সার্ব সেনাদের থেকে অস্ত্র নেওয়া হয়নি। বরং তাদের সুযোগ করে দেওয়া হয় নিরস্ত্র মাটির সন্তানদের ওপর আক্রমণ করার। ওখানে নিয়োজিত ছিলো ডাচ শান্তিরক্ষী। তাদের সামনেই সার্ভরা ধ্বংসযজ্ঞ চালায় তথাকথিত নিরাপদ শহর স্রেব্রেনিকা।
গুলির মুখে মৃত্যু হয় নিরস্ত্রদের। বেঁচে যাওয়া মুসলমানরা পালাতে থাকে বুনো আতঙ্ক নিয়ে। এতেও ক্ষান্ত হয়নি পশুরু। বন থেকে ট্রেইল ধরে খুঁজে খুঁজে ধরে আনা হয় মুসলিমদের। সার ধরে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয় তাদের। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সার্ব বাহিনীর হামলায় দুই লাখের বেশি বসনীয় নিহত ও প্রায় বিশ লাখ শরণার্থী হয়। পরে সার্বিয়া এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইলেও একে গণহত্যা বলে উল্লেখ করতে নারাজ। তবে এখনো যখন স্রেব্রেনিকার মাটির তলায় নতুন নতুন কঙ্কাল পাওয়া যায়, তখন বিব্রত হয় সার্বিয়া। বিশ্বের সামনে খুলে যায় ইউরোপের সভ্যতার মুখোশ।
যার নেতৃত্বে ওই মুখোশ খুলে দেওয়া হয়, সেই আলিজার মৃত্যু হয়েছে ১৫ বছর আগে। কয়েকদিন আগে পালন করা হয়েছে তার ৯৫তম জন্মবার্ষিকী। বসনিয়ার উত্তপ্ত সময়ে দেশটির হাল ধরে রেখেছিলেন তিনিই। ১৯৯২ সালের পয়লা মার্চ দেশটি প্রথম স্বাধীন হয়। তবে কাগজে স্বাধীনতা থাকলেও সার্বরা সেটা মানতে চায়নি। এ কারণেই শুরু হয় নিধন। দেশটি পরিণত হয় যুদ্ধের মাঠে। ওই মাঠে নির্যাতিতদের পতাকা তুলে ধরেছিলেন তিনিই।
আলিজা ইজেতবেগোভিচের বড় পরিচয় তিনি একজন নায়ক, রাজনীতির নায়ক। এর বাইরে তার পেশা ছিলো উকালতি। আর ছিলেন একজন সুলেখক। ‘ইসলামিক ডিকারেশন’ শিরোনামে তার একটি বই সারাবিশ্বে ব্যাপক পরিচিত। এটি প্রকাশ হয়েছিলো ১৯৭০ সালে। এতে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে লিখেছেন। মুসলমানদের নিয়ে তার চিন্তা ও কাজের কারণে স্বাধীনতার আগেও বহুবার নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৩ সালে আরও ১২ চিন্তাবিদের সঙ্গে তাকেও ১৪ বছরের জেল দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ তোলা হয়। বলা হয়, তিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।
১৪ বছরের শাস্তি দেওয়া হলেও পাঁচ বছর আট মাস কারাভোগের পর ১৯৮৮ সালের নভেম্বরে ফোকা কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। ওই বছরই সরাসরি রাজনীতিতে নাম লেখান আলিজা। ১৯৯০ সালে গঠন করেন ‘পার্টি অব ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন (এসডিএ)। এই দলের উদ্দেশ্য হয় বসনীয়দেরকে নিজেদের ভ’মিতে ক্ষমতায়ন করা।
তখন যুগোশ্লাভিয়ার ছয়টি প্রজাতন্ত্রের একটি বসনিয়া-হারজেগোভিনা। যুগোশ্লাভিয়ায় থেকেই দানা বাঁধতে থাকে তার আন্দোলন। মুসলমানদের কাছে জনপ্রিয় নেতা হয়ে উঠেন তিনি।
নব্বইয়ের দশকে নির্বাচনে মোট ২৪০টি আসনের মধ্যে ৮৬টি আসন পায় তার দল। আর ১৯৯২ সালে সরাসরি স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট হয়। এতে ৬৪ শতাংশ ভোট পড়ে স্বাধীনতার পক্ষে। এক মাস পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আমেরিকা স্বাধীন দেশ হিসেবে বসনিয়া-হারজেগোভিনাকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু বসনিয়ার সার্বরা এই স্বাধীনতাকে প্রত্যাখ্যান করে। সার্ব সামরিক নেতা র্যাদোভান কারাদজি মুসলমানদের ওপর হামলে পড়েন। শুরু হয় গণহত্যা।
তবে ওই হত্যা দমাতে পারেনি আলিজা ইজেতবেগোভিচ এর অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামকে। তার নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক মহলে ছিলো ব্যাপক আলোচিত।
আলিজা প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। ২০০০ সালে অক্টোবর পর্যন্ত যৌথ প্রেসিডেন্সির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।
বসনিয়ার মহান এই নেতাকে এ বছর অনাড়ম্বরভাবে স্বরণ করা হয়েছে রাজধানী সরজেভোতে। করোনার কারণে মানুষের ঢল নামেনি। তবে নেমেছে তার জন্য প্রার্থনার ঢল।
দেশটির থ্রি ম্যাম্বার প্রেসিডেন্সির সদস্য সেফিক জাজেরোভিচ এই আয়োজনে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আলিজা ইজেতবেগোভিচ বসনিয়া এবং হার্জেগোভিনার আধুনিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তার লড়াই জাদুর মতো কাজ করেছে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে প্রায় অসম্ভব উপারে কঠিন পরিস্থিতি থেকে উৎরিয়ে আনা হয়েছে।’
২০০৩ সালের ১৯ অক্টোবর এই নায়কের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। তার জীবনের শেষ দিকের সময়টা পৃথিবীর আকাশে তারার মতো জ্বলজ্বল করলেও শুরুর সময়ের খোঁজ খুব কম পাওয়া যায়।
এই নেতার জন্ম হয়েছিলো ১৯২৫ সালো ৮ আগস্ট। তার পরিবার ছিলো ধর্মপ্রাণ মুসলিম। ১৯৩৮ সালে তিনি চলে যান সারজেভোতে। ওই শহরেই চলতে থাকে তার পড়ালেখা। ১৯৪৩ সালে তিনি স্নাতক হন। পরের তিন বছর পড়েছেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর পর সারজেভো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন নিয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
পড়ালেখা শেষ করে সারজেভোর দুটি বড় পাবলিক কর্পোরেশনের আইন উপদেষ্টা ছিলেন।
আলীজা ইজেতবেগোভিচ এর স্ত্রী ছিলেন হালিদা রেপোভ্যাক। তিনি ২০০৩ সালে মারা যান। তাদের তিন সন্তান। এদের মধ্যে দুই কন্যা। বড় মেয়ে লেজলা গণিতবিদ। ছোট সাবিনা ফরাসি এবং ইংরেজি ভাষার শিক্ষক। সময়ে সময়ে বাবার লেখাগুলোকে ওই ভাষায় অনুবাদ করেছেন। আর একমাত্র ছেলে বাকির ছিলেন পেশায় স্থপতি। তিনি বাবার সুরক্ষা বাহিনীর প্রধান হিসেবেও কাজ করেছেন। ১৯৯৩ এবং ৯৪ সালে তিনি একটি বিশেষ বাহিনীর কমান্ড করেন।
পরিবারের ব্যাপারে এসব তথ্য ছাড়া বিস্তারিত কিছু গণমাধ্যমে পাওয়া যায় না। তবে বসনিয়ায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের নেতা হিসেবে আলিজা ইজেতবেগোভিচ, রক্তের সাগর পেরিয়ে আসা নায়ক।
বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে