বলিউডের মুসলিম অভিনেতাদের নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে নানা বির্তক চলছে। ব্যক্তিগত জীবনে এই অভিনেতাদের ধর্মপালনের খবর খুব কমই প্রকাশ হয়। বলিউডের স্টার খান হিসাবে পরিচিত শাহরুখ, আমির ও সাইফ আলী বিয়েও করেছেন হিন্দুধর্মাবলম্বী নারীদের। কিন্তু এরপরও মুসলিম পরিচয়ের কারণে তারা বিভিন্ন সময় হিন্দুত্ববাদি রাজনীতির টার্গেটে পরিণত হয়েছেন।
সম্প্রতি অভিনেতা আমির খানকে ক্ষমতাসীন বিজেপির অনেক নেতা দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এমনকি তার অভিনীত সিনেমা বর্জনের ডাক দেয়া হয়েছে।
অভিনেতা আমির খান “লাল সিং চাড্ডা” নামে একটি সিনেমার শুটিংয়ে তুরস্ক সফর করেন। এ সময় তাকে আমন্ত্রণ জানান তুরস্কের ফার্স্টলেডি এমিনো এরদোয়ান।
প্রেসিডেন্ট ভবনের বারান্দায় বসে দু'জন কথা বলেন। সেখানে আমির খানের অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা ও সেবামূলক কার্যক্রমের প্রশংসা করেন এমিনো এরদোয়ান। ১৫ আগস্ট এই সৌজন্য সাক্ষাতের পর তুরস্কের ফার্স্টলেডি তার টুইটার একাউন্টে কিছু ছবি পোস্ট করেন।
সেখানে তিনি লিখেন ‘‘ইস্তানবুলে বিশ্ববিখ্যাত ভারতীয় অভিনেতা, চিত্রনির্মাতা এবং পরিচালক আমির খানের সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য হলো। আমি খুব খুশি হয়েছি যে তুরস্কের বিভিন্ন জায়গায় লাল সিং চাড্ডার শুটিং করবেন বলে স্থির করেছেন আমির। আমি এখন সেদিকেই তাকিয়ে।’’
টুইটারের এই বক্তব্য থেকে এটা খুব স্পষ্ট যে আমির খানের সাথে এই বৈঠক ছিলো একান্তই সৌজন্য বৈঠক। এই টুইটার বার্তায় এমিনো এরদোয়ান ভারতীয় সিনেমাটির এক ধরণের প্রচারণা করেছেন।
বিশ্ববিখ্যাত বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী তুরস্ক সফরে যান। দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিখ্যাত বহু সিনেমার শুটিং হয়েছে। এর মধ্যে অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীকে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর একটি অন্যতম কারণ তুরস্কের পর্যটন শিল্পের বিকাশ। বলা যায় এগুলো রাষ্ট্রীয় প্রচারণার অংশ।
ভারতের অসহিষ্ণু গণমাধ্যম ও হিন্দুত্ববাদি রাজনীতির প্রচারবিদরা এমিনো ও আমির খানের এই বৈঠককে দেখছেন ভারত ও তুরস্কের মধ্যে সর্ম্পকে আমির খানের বিপরীতমুখী অবস্থান হিসেবে। যেহেতু পাকিস্তানের মিত্র তুরস্কের সাথে ভারতের সর্ম্পক ভালো যাচ্ছে না। কাশ্মীর নিপীড়নমুলক শাসনের বিরুদ্ধে তুরস্ক সোচ্চার। ফলে তুরস্কের ফার্স্টলেডির সঙ্গে দেখা করে আমির খান দেশদ্রোহীতার কাজ করেছেন বলে তারা মনে করছেন। এমনকি আমির খান প্রবলভাবে ইসলামি ভাবধারায় বিশ্বাসী দাবি করে তার মুসলিম পরিচয় সামনে আনা হয়েছে। সম্প্রতি তিনি কোন কোন দেশে গিয়েছেন, কার কার সাথে দেখা করেছেন তার তদন্ত হওয়া উচিত বলেও দাবি করা হয়েছে।
ভারতে ধর্মীয় উগ্রপন্থার বিস্তার নিয়ে কথা বলায় এর আগেও আমির খান আক্রমণের শিকার হয়েছেন। ভারতে ধর্মীয় অসিহষ্ণুতা বাড়ার কারণে ২০১৫ সালে তিনি বলেছিলেন তার স্ত্রী তাকে পরামর্শ দিয়েছেন দেশ থেকে চলে যেতে। তার এই মন্তব্যর পর হিন্দুত্ববাদীরা তাকে বয়কটের আহবান জানায়। এ সময় ভারতের ই কমার্স সংস্থা প্লাপডিল তার সাথে চুক্তি বাতিল করে। তিনি এই সংস্থাটির ব্রান্ড অ্যাম্বাসডর ছিলেন।
আসুন আমরা দেখে আসি এবার কিভাবে আমির খানকে আক্রমণ করা হচ্ছে।
আমির খানের সঙ্গে তুরস্কের ফার্স্টলেডির এই সাক্ষাতের পর বিজেপির পার্লামেন্ট মেম্বার সুব্রহ্মণ্যম স্বামী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে কটাক্ষ করেন। টুইটারে তিনি লিখেন, ‘‘আমির খানকে থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের মধ্যে একজন বলে আমি যে ভুল করিনি, তা প্রমাণ হয়ে গেল।
বলিউডের তিন খান শাহরুখ, সালমান এবং আমিরকে তিনি এর আগে ‘থ্রি খান মাস্কেটিয়ার্স’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁদের সম্পত্তি কীভাবে বাড়ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। দেশে-বিদেশে তাঁদের সম্পত্তি নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত বলেও দাবি তুলেছিলেন।
বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র টুইটারে ইঙ্গিত করেন আমির খান খলিফা শাসনে বিশ্বাস করেন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মুখপাত্র শ্রীরাজ নায়ার লিখেন, ‘‘আমির খানের ছবি বয়কট করা উচিত। ধর্মান্ধ সাইফ যিনি বলেছিলেন ব্রিটিশরা আসার আগে ভারতের কোনও অস্তিত্ব ছিল না, তাকেও বয়কট করা উচিত। ব্রিটিশ ওপনিবেশের আগে ভারত একক কোনো রাষ্ট্র ছিলো না বলে একবার মন্তব্য করেছিলেন সাইফ আলি খান। আর এতে ক্ষেপে যান হিন্দুত্ববাদিরা। এবারও সে প্রসঙ্গ এনেছেন এই নেতা।
বিজেপি মুখপাত্র সুরেশ নাখুয়া টুইটারে লিখেন, ‘‘আমির খানকে এখন কোন কোন ব্র্যান্ড এনডোর্স করছেন, তা কি কারও জানা আছে? আমাকে জানান আপনারা।’’ তিনি এর মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছেন আমির খান যেসব ব্রান্ডের প্রচারের সাথে জড়িত তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে।
আমির খানকে বিজেপির নেতারা যখন এভাবে আক্রমন করছে তখন একজনকে তার পাশে পাওয়া গেছে। তিনি আম আদমি পার্টির সাবেক নেতা আশুতোষ। তিনি লিখেছেন, দেশের সমস্যাগুলি ধামাচাপা দিতেই খামোকা বিষয়টির রাজনীতিকরণ হচ্ছে। টুইটারে আশুতোষ লেখেন, ‘‘আমি আমির খানকে সমর্থন করি। ভুয়ো জাতীয়তাবাদীরা, যাঁরা দেশের অর্থনীতি, করোনা পরিস্থিতি, চিনা আগ্রাসন এবং সরকারের কাজ নিয়ে কোনও আলোচনা হোক চান না, ইচ্ছাকৃত ভাবে তাঁরা বিষয়টি নিয়ে ঝামেলা পাকাচ্ছেন।’’
এভাবে আক্রমণের পাশাপাশি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিজেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সাথে আমির খানের একটি ছবি নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
২০১৭ সালে “ সিক্রেট সুপারস্টার ” ছবির প্রচারে গিয়েছিলেন আমির খান। সে সময় আঙ্কারায় প্রেসিডেন্ট ভবনে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন তিনি। আমির খানকে দেশদ্রোহী প্রমানে এরদোয়ানের সাথে সাক্ষাতের এই ছবিও প্রচার করা হচ্ছে।
বলিউডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এখন বিজেপির নিয়ন্ত্রণে। নাগরিকত্ব আইন নিয়ে সারা ভারতে যখন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে তখন বলিউডের অভিনেতাদের নীরব ভুমিকার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন পরিচালক অনুভব সিনহা। তিনি সে সময় তিন খানের নীরবতারও সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এ ধরনের ইস্যুতে বক্তব্য দিলে এই অভিনেতাদের ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়তো। আমির খানকে নিয়ে হিন্দুত্ববাদিদের আক্রমন তার বড় প্রমান।
ভারতে অনেক অনুষ্ঠানে এখন প্রধানমন্ত্রী মোদির পাশে দেখা যায় একঝাঁক চিত্রতারকাকে। এর প্রতিদান হিসেবে তারাও এমনকিছু ছবি বানিয়ে দেন, যা সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে কাজে লাগে। নির্বাচনের আগে দেশটির প্রধান টিভি চ্যানেলগুলো প্রধানমন্ত্রী মোদির সাক্ষাৎকার প্রচার করে। এর একটি সাক্ষাৎকার নেন বলিউড সুপারস্টার অক্ষয় কুমার। শুরুতেই তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে প্রধানমন্ত্রীকে তিনি কোনো রাজনৈতিক প্রশ্ন করবেন না। অথচ ওটি ভারতের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি। দেশ তখন গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত, সমাজে অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে, এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীকে ''রাজনৈতিক প্রশ্ন'' না-করার মানে হলো, তিনি তেমন প্রশ্নই করবেন যেরকম প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রী মোদি শুনতে চান।
এ অভিনেতা এর আগেও বিজেপি-র কট্টর নীতির পক্ষে ''দেশপ্রেমমূলক'' ছবি বানিয়েছে, যাতে মুসলিমদেরকে হেয় করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো এই ''দেশপ্রেমিক'' অভিনেতাই কয়েক বছর আগে কানাডীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য ভারতের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন।
সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন ছিলেন আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধির বন্ধু। কংগ্রেস দলের টিকেটে এমপিও হয়েছিলেন অমিতাভ। মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই অমিতাভকেই দেখা গেল মোদির ''গুজরাটের কসাই'' ভাবমূর্তি পরিচ্ছন্ন করার কাজে সহায়তা করছেন।
বলিউডের প্রখ্যাত অভিনেত নাসির উদ্দীন শাহ একবার বলেছিলেন, ভারতে ঘৃণার সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে। একথা বলার পরই ভারতজুড়ে তার বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় ওঠে। সেদিন তার পক্ষে তার সহকর্মীরা কেউ এগিয়ে আসেনি। ২০০৮ সালে শাবানা আজমি দু:খ করে বলেছিলেন, এ দেশের মুসলিমদের ওপরে অবিচার করা হয়, যার জন্য আমি ও জাভেদ আখতার চাইলেও মুম্বাইয়ে ফ্ল্যাট কিনতে পারি না। দেশের মুসলিম নেতারাও এই পরিস্থিতি শোধরানোর কোনো চেষ্টা করেন না। নাসিরুদ্দিন শাহ বলেছিলেন, হিন্দি ছবিতে সন্ত্রাসবাদী মানেই মাথায় ফেজটুপি আর পাজামা পরা মুসলিমদের ছবি দেখানো হয়।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিজেপ তাইয়েপ এরদোয়ান কাশ্মীরে মানবাধিকার লংঘন নিয়ে শুরু থেকেই সোচ্চার। তিনি এ নিয়ে জাতিসংঘে কথাও বলেছেন। এরপর থেকে ভারতের উগ্রপন্থীরা তুরস্ক আর এরদোয়ানকে শত্রুরাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে এরদোয়ান ও তার স্ত্রীর সাথে আমির খানের সাক্ষতকে উগ্রপন্থীরা দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসাবে দেখছে। এ ধরনের মনোভাব ভারতের উগ্রপন্থার একটি উদহারন হিসাবে দেখা হচ্ছে। যেখানে সৌজন্যতা কিংবা ব্যক্তি ও মানবাধিকারের কোনো স্থান নেই।
বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে