বসফরাস প্রণালী, ফেরাতে পারে তুরস্কের গৌরবোজ্জ্বল অতীত

উসমানীয় শাসনামলে বসফরাসের তীরে ৬২০টি ওয়াটার ফ্রন্ট বাড়ি নির্মাণ করা হয় যা এখনো বিদ্যমান - টিআরটি ওয়ার্ল্ড

  • মেহেদী হাসান
  • ২৪ আগস্ট ২০২০, ১৭:৩০

বিশ্বের সবচেয়ে সরু প্রণালীর নাম বসফরাস প্রণালী। সরু এ প্রণালী চারটি সাগরকে যুক্ত করেছে। দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের বৃহত্তর অঞ্চলজুড়ে বাণিজ্যিক এবং সামরিক আধিপত্য বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। চারশ বছরের অধিক সময় ধরে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল বসফরাস প্রণালী।

বর্তমানে বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে অন্যতম কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালী।

বসরাস প্রণালী কৃষ্ণ সাগর এবং মর্মর সাগরকে যুক্ত করেছে। মর্মর সাগর দারদানেলস প্রণালীর মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে এজিয়েন সাগরে। এজিয়েন সাগর যুক্ত ভূমধ্য সাগরের সাথে। এভাবে চারটি সাগরকে যুক্ত করেছে বসফরাস প্রণালী।

বসফোরাস প্রণালী এবং দারদানেলস প্রণালী উভয়ের অবস্থান তুরস্কের মধ্যে। এ দুটি প্রণালীকে একত্রে টার্কিস প্রণালীও বলা হয়। কৃষ্ণ সাগর তীরের দেশ রাশিয়া, ইউক্রেন, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া এবং জর্জিয়ার বাণিজ্যিক এবং যুদ্ধ জাহাজের ভূমধ্য সাগর ও অন্যান্য সাগরে প্রবেশের একমাত্র পথ বসফরাস প্রণালী।

এসব দেশের জাহাজ বসফরাস প্রণালী- মর্মর সাগর- দারদানেলস প্রণালী হয়ে এজিয়েন সাগর এবং ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করতে পারে। এরপর ভূমধ্য সাগর থেকে জিবরাল্টার প্রণালী হয়ে উত্তর আটলাল্টিক সাগর এবং মিশরের সুয়েজ খাল হয়ে লোহিত সাগর, আরব সাগর আর ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করতে পারে ।

বর্তমানে ভৌগোলিক আধিপত্যকেন্দ্রিক লড়াইয়ের কারণে রাশিয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বসফরাস প্রণালী। এ প্রণালী দিয়ে দেশটি সহজে ভূমধ্য সাগর হয়ে উত্তর আটলান্টিক, লোহিত সাগর, আরব সাগর, ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করতে পারে। এ কারণে বসফরাস প্রণালী বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌ রুট। রাশিয়ার উত্তরে যদিও বাল্টিক সাগর, কারা সাগরসহ আরো কয়েকটি সাগর রয়েছে। কিন্তু এসব সাগর পথ খুবই দীর্ঘ আর বরফশীতল এবং অনেক এলাকা বরফাচ্ছাদিত।

বসফরাস প্রণালী আর এজিয়েন সাগরকে যুক্ত করেছে মর্মর সাগর। মর্মর সাগর তুরস্ক ভূখন্ড বেষ্টিত। ফলে বসফোরাস প্রণালীকে কেন্দ্র করে তুরস্কের হাতে রয়েছে ভবিষ্যত আধিপত্যকেন্দ্রিক রাজনীতির অন্যতম চাবিকাঠি।

তুরস্কের উত্তরে কৃষ্ণ সাগর, পশ্চিমে এজিয়েন সাগর আর দক্ষিণে ভূমধ্য সাগর। কৃষ্ণ সাগরের মূল উপকূলভাগ তুরস্কের। আর ভূমধ্য সাগরেও তুরস্কের রয়েছে বিশাল উপকূল রেখা। বসফরাস প্রণালীর দক্ষিণে তুরস্কের আনাতোলিয়া আর উত্তেরে তুরস্কের থ্রেস। থ্রেসের অবস্থান ইউরোপের দক্ষিণ পূর্ব-ভাগে। থ্রেস ইউরোপীয়ান টার্কি নামে পরিচিত।

এজিয়েন সাগরে উপকূল ভাগ রয়েছে শুধু তুরস্ক আর গ্রিসের। অপর দিকে ভূমধ্য সাগরের তীরে তুরস্ক ছাড়া অপর যেসব দেশ অবস্থিত সেগুলো হলো মিশর, লিবিয়া, ইতালি, গ্রিস, সিরিয়া, ইসরাইল, তিউনিশিয়া, লেবানন। এ ছাড়া দ্বীপ রাষ্ট্র সাইপ্রাস এবং মাল্টার অবস্থান ভূমধ্য সাগরে।

বর্তমানে ভূমধ্য সাগর ঘিরে সব পরাশক্তিগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে। এ লড়াইয়ের সাথে যুক্ত ভূমধ্য সাগরপারের দেশগুলোও। এখানে মোতায়েন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, বৃটেন, ফ্রান্সসহ আরো বিভিন্ন দেশের রণতরী। আর ভূমধ্য সাগর ঘিরে বৈশ্বিক রাজনীতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তুরস্কের বসফরাস প্রণালী, মর্মর সাগর আর দারদানেলস প্রণালী।

বসফরাস প্রণালী একটি আন্তর্জাতিক জলপথ। ভূমধ্য সাগর আর কৃষ্ণ সাগরের মধ্যে একমাত্র পানিপথ হওয়ায় প্রাচীনকাল থেকে বাণিজ্যিক এবং সামরিক উভয় কারণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট। আর বর্তমানে কৌশলগত কারণে এটি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বসফরাস প্রণালীর ওপর আধিপত্য নিয়ে আধুনিক ইতিহাসে ঘটেছে অনেক যুদ্ধ-সংঘাত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৮৭৭-৭৮ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্য-রাশিয়া যুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহনী আক্রমণ চালায় দারদানেলস প্রণালীতে। উসমানীয় সাম্রাজ্য বনাম রাশিয়া যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে ছিল বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, সার্বিয়া এবং মন্টেনিগ্রো।

নীল জলরাশি আর চলাচলরত জাহাজ এ প্রণালীকে করেছে নয়নাভিরাম। ছবি : পিন্টারেস্ট
নীল জলরাশি আর চলাচলরত জাহাজ এ প্রণালীকে করেছে নয়নাভিরাম। ছবি : পিন্টারেস্ট

 

খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে গ্রিস এ প্রণালী দিয়ে কৃষ্ণসাগর উপকূলের দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য পরিচালনা করত। দুইহাজার বছর আগে পারস্য সম্রাট প্রথম দারিয়াস বসফরাস প্রণালী হয়ে অভিযান পরিচালনা করেন এবং পূর্ব ইউরোপের দানিউব নদীর তীরে পৌঁছান। পারস্য, রোমান, বাইজানটাইন উসমানীয় শাসনামল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বসফরাস প্রণালী নিয়ে বৃহৎ অনেক শক্তির মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে।

১৪৫৩ সালের ২৯ মে উসমানীয়রা কনস্টান্টিনোপল বা ইস্তাম্বুল জয় করে। এরপর বসফরাস প্রণালীর উভয় তীরে শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করে উসমানীয়রা; যাতে দীর্ঘমেয়াদে এ প্রণালীর ওপর তারা আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে পারে। ১৪৯২ সালে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার যেমন ইতিহাসে স্মরণীয় অধ্যায় তেমনি ১৪৫৩ সালে উসমানীয়দের ইস্তাবুল জয় ইতিহাসের বড় ধরনের বাক পরিবর্তনকারী অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। এর মাধ্যমে অবসান ঘটে রোমান সাম্রাজ্যের সর্বশেষ অবশিষ্ট বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের। এরপর থেকে ৪শ বছর ধরে বসফরাস প্রণালীর ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় থাকে উসমানীয়দের।

উসমানীয় সাম্রাজ্য একসময় পৌঁছে যায় ইউরোপের সার্বিয়া পর্যন্ত। আর পুরো কৃষ্ণসাগরের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় উসমানীয়দের। উসমানীয়রা কৃষ্ণসাগরের নাম দেয় অটোম্যান লেক। এখানে তখন রাশিয়ানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। যদিও রাশিয়ার উপকূলভাগ রয়েছে এ সাগরজুড়ে।

কিন্তু উনিশ শতকের শুরু থেকেই উসমানীয় সাম্রাজ্যে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বসফরাস প্রণালী নিয়ে বিভিন্ন চুক্তি হয়। এসব বিভিন্ন দেশ প্রণালীটি ব্যবহারের অনুমতি পায়। রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী ১৮৩৩ সালের এক চুক্তিবলে অন্যান্য দেশের জন্য বসফরাস ও দারদানেলস প্রণালী বন্ধ করে দেয়া হয়।

১৮৪১ সালে লন্ডন স্ট্রেইট চুক্তি হয় রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া এবং প্রুশিয়ার মধ্যে। এ চুক্তি বলে বসফরাস প্রণালীতে আবার উসমানীয়দের আইন ফিরিয়ে আনা হয় এবং এ প্রণালী দিয়ে সমস্ত যুদ্ধজাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে রাশিয়ার রণতরী প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায় ভূমধ্য সাগরে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালে এক চুক্তি অনুযায়ী বসফরাস প্রণালীর তীরে অবস্থিত উসমানীয় দুর্গগুলো বিজয়ী মিত্র শক্তির অধীনে চলে যায় এবং বসফরাসকে বেমসামরিক ও আন্তর্জাতিক ভূখন্ড ঘোষণা করা হয় লিগ অব নেশনস এর অধীনে। তবে তুরস্কে এ চুক্তির বিরুদ্ধে তখন বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। তারা এ চুক্তি অস্বীকার করে। এ চুক্তি ছিল তুরস্ককে বাদ দিয়ে করা একতরফা এবং তুরস্কের ওপর চাপিয়ে দেয়া এক চুক্তি। পরবর্তীতে ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত হয় লুজান চুক্তি। যেখানে বসফরাস প্রণালীকে তুরস্কের ভূখন্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

লুজান চুক্তি অনুযায়ী এ প্রণালী দিয়ে বিদেশি সমস্ত বাণিজ্যিক এবং যুদ্ধজাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়। তবে তুরস্ক এবারও এ চুক্তির শর্তের বিরোধীতা করে এবং প্রণালী এলাকায় সামরিকায়ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৯৩৬ সালের আরেক চুক্তি অনুসারে বসফরাস প্রণালীকে একটি আন্তর্জাতিক শিপিং লেন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একইসাথে কৃষ্ণসাগর অঞ্চল ছাড়া অন্য দেশগুলোর যুদ্ধজাহাজ চলাচলের ওপর বাধা আরোপের ক্ষমতা দেয়া হয় তুরস্কের হাতে। এ চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে।

বসফরাস প্রণালীর দৈর্ঘ্য ১৯ মাইল। সর্বনিন্ম প্রশস্ত পয়েন্ট ১ মাইলেরও কম মাত্র ৭০০ মিটার। সর্বনিম্ন গভীরতা ১২০ ফিট এবং সর্বোচচ গভীরতা ৪০৮ ফিট। দারদানেলস প্রণালীর দৈর্ঘ্য ৩৮ মাইল। সর্বন্মি প্রশস্ত পয়েন্ট ৭৫০ মিটার বা পৌনে এক মাইল।
ইউরোপ এবং এশিয়া মহাদেশকে পৃথকারী একমাত্র প্রাকৃতিক সীমানা হলো বসফোরাস প্রনালী। বছরে ৫০ হাজারের বেশি জাহাজ চলাচল করে সরু এ প্রণালী দিয়ে। দৈনিক জ্বালানি তেল বহন করা হয় ৩০ লাখ ব্যারেল। এ তেল বহন করে মূলত রাশিয়া।

বসফরাস প্রণালীর উভয় তীরে অবস্থিত তুরস্কের সবচেয়ে জনবহুল, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক আর অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর ইস্তাম্বুল। বিশ্বে সীমিত কয়েকটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল শহর রয়েছে এবং ইস্তাম্বুল তার একটি।

বসফরাস প্রণালীর দুই তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা কয়েকশত বছরের সারি সারি পুরনো বাড়ি, সবুজ গাছপালা, কোথাও উঁচু-নিচু পাহাড়ি এলাকা। ছবি : পিন্টারেস্ট
বসফরাস প্রণালীর দুই তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা কয়েকশত বছরের সারি সারি পুরনো বাড়ি, সবুজ গাছপালা, কোথাও উঁচু-নিচু পাহাড়ি এলাকা। ছবি : পিন্টারেস্ট

 

বসফরাস প্রণালীর উত্তর তীরে মর্মর সাগরের একেবারে কোল ঘেঁষে অবস্থিত তুরস্কের ঐতিহাসিক হাজিয়া সোফিয়া, ব্লু মস্কসহ আরো অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা। বসফরাস প্রণালীর তীরেই মর্মর সাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত তুরস্কের আরেক ঐতিহাসিক স্থাপনা তোপকাপি প্যালেস মিউজিয়াম। বসফরাসের তীর ঘেঁষে রয়েছে উসমানীয় সুলতানদের ১১টি সুরম্য প্রাসাদ। এখানেই ছিল তাদের আবাসিক এবং প্রশাসনিক হেডকোয়ার্টার।

উসমানীয় শাসনামলে বসফরাসের তীরে ৬২০টি ওয়াটার ফ্রন্ট বাড়ি নির্মাণ করা হয় যা এখনো বিদ্যমান। বসফরাস প্রণালীর দুই তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা কয়েক শ বছরের সারি সারি পুরনো বাড়িঘর, সবুজ গাছপালা, কোথাও উঁচু-নিচু পাহাড়ি এলাকা, নীল জলরাশি আর চলাচলরত বিভিন্ন ধরনের জাহাজ এ প্রণালীকে করেছে নয়নাভিরাম। বসফরাস প্রণালীর ওপর রয়েছে তিনটি সেতু। বসফরাস প্রণালী এলাকা তুরস্কের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ।

বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে