হিরোশিমায় এটম বোম ফেলা হয় যে বিমান থেকে

জাপানের হিরোশিমায় এটম বম্ব নিক্ষেপ করে যে বিমান থেকে তার নাম এনোলা গে - ব্রিটেনিকা ডটকম

  • মেহেদী হাসান
  • ১৯ আগস্ট ২০২০, ২১:১০

জাপানের হিরোশিমায় এটম বম্ব নিক্ষেপ করে যে বিমান থেকে তার নাম এনোলা গে । আর নাগাসাকিতে এটম বম্ব নিক্ষেপ করা বিমানটির নাম বক্সকার। এনোলা গে এবং বক্সকার আসলে বোয়িং নির্মিত বি-২৯ সুপার ফোরট্রেস বোমারু বিমান। ফলে বোয়িং বি-২৯ এনোলা গে হলো বিশ্বের প্রথম পরমানু বোমা হামলকারী একমাত্র যুদ্ধ বিমান।

পরমানু বোমা হামলার কারনে বি-২৯ সুপার ফোরট্রেস বিশ্ব ইতিহাসে বহুল আলোচিত এক বিমানের নাম। তেমনি এটি আরো অনেক রেকর্ডের অধিকারী। এক টানা ৪ দিন উড়ে পৃথিবীর চার দিকে প্রথম পরিভ্রমন করে বি-২৯ । এ ধরনের আরো অনেক রেকর্ডের কারনে এভিয়েশন ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে বি-২৯ সুপার ফোরট্রেস বোমারু বিমান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর বি-২৯ বোমারু বিমান এক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানে যত বোমা হামলা হয় তার ৯১ ভাগ পরিচালনা করা হয় বি-২৯ বমারের মাধ্যমে। বোয়িং এর তথ্য অনুযায়ী জাপানের টোকিও শহরে এক সাথে ১ হাজার বি-২৯ বোমারু বিমান বোমা হামলায় অংশ নেয় ।

১৯৫০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আর সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বোমারু বিমান বি-২৯ সুপার ফোরট্রেস।
জাপানে এটম বোমা মিশন পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বোয়িং বি-২৯ সুপার ফোরট্রেস বোমারু বিমান বাছাই করে। এজন্য পরমানু বোমা বহনে উপযুক্ত করে ৬৫টি বি-২৯ বিমান তৈরি করা হয়। ৬৫টি বি-২৯ বিমানকে বলা হয় সিলভার প্লেট সিরিজ।

যুক্তরাষ্ট্রের পরমানু প্রকল্পের নাম ম্যানহাটান প্রজেক্ট। এ প্রজেক্টের সাথে জড়িত যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার ফোর্সের কোড নামও দেয়া হয় সিলভার প্লেট। জাপানে পরমানু বোমা হামলা মিশন পরিচালনার আগে সিলভার প্লেট সিরিজের ৬৫টি বি-২৯ বিমানের মাধ্যমে প্রশিক্ষন ও মহড়া পরিচালনা করা হয়। ৬৫টি বি-২৯ বিমান থেকে দুটি বিমান বাছাই করা হয় জাপানে পরমাণু বোমা হামলার জন্য।

হিরোশিমায় ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট এটম বোমা ফেলা হয় যে বি-২৯ বিমান থেকে তার পাইলট ও কমান্ডার ছিলেন কর্নেল পল ডবিøউ তিব্বেতস। মিশন পরিচালনার আগের দিন ৫ আগস্ট পল তিব্বেতস বি-২৯ বিমানটির নাম রাখেন এনোলা গে। এনোলা গে হলো পাইলট পল তিব্বেতস এর মায়ের নাম। ফলে হিরোশিমায় এটম বোমা নিক্ষেপকারী বি-২৯ বিমানটির নাম হয়ে যায় এনোলা গে। এনোলা গের কো পাইলট ছিলেন ক্যাপ্টেন রবার্ট এ লুইস।

১৯৪৫ সালের ১৪ জুন ক্যাপ্টেন লুইস এটম বোমা লিটল বয়সহ এনোল গে বিমানটি উড়িয়ে নেন ওমাহা থেকে উটাহতে। এর ১৪ দিন পর বিমানটি প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়াম দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করে । ৬ জুলাই গুয়াম দ্বীপ থেকে বিমানটি যাত্রা করে মেরিনা আইল্যান্ডের তিনিয়ান দ্বীপের নর্থ ফিল্ডে। ৬ আগস্ট হিরোশিমায় লিটল বয় নিক্ষেপের আগে আট বার মহড়া পরিচালনা করে বিমানটি। এ মহড়ার অংশ হিসেবে ২৪ ও ২৬ জুলাই জাপানের কোবে এবং নাগোয়ায় পাম্পকিন বোমা নিক্ষেপ করে। এনোলা গে সর্বশেষ রিহার্সল মিশন পরিচালনা করে ৩১ জুলাই।

৬ আগস্ট মেরিনা আইল্যান্ডের তিনিয়ান দ্বীপের নর্থ ফিল্ড থেকে জাপানে পৌছতে ৬ ঘন্টা লাগে বিমানটির । এনোলা গের সাথে এসময় আরো ২টি বি-২৯ বোমারু বিমান অংশ নেয় এটম বোমা মিশন পরিচালনায়। এর একটির নাম দেয়া হয় গ্রেট আর্টিস্ট এবং অন্যটির নেসাসারি ইভল। নেসাসারি ইভলের দায়িত্ব ছিল এটম বোমা হামলার ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ।

জাপানের সময় সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ৩১ হাজার ৬০ ফিট উপর থেকে ফেলা হয় পারমানবিক বোমা লিটল বয়। লিটল বয় নিচে পৌছতে সময় নেয় ৫৩ সেকেন্ড। হিরোশিমা শহর থেকে ১ হাজার ৯০০ ফিট উপরে বিস্ফোরিত হয় লিটল বয়।

মিশন পরিচালনা শেষে ২টা ৫৮ মিনিটে বি-২৯ এনোলা গে আবার ফিরে আসে মেরিনা আইল্যান্ডের তিনিয়ান দ্বীপে। বিমান থেকে নামার সাথে সাথে পাইলট কর্ণেল পল তিব্বেতসকে দেয়া হয় যুক্তরাষ্ট্র আর্মির দ্বীতিয় সর্বোচ্চ পদক ডিসটিংগুইশড সার্ভিস ক্রস।

৯ আগস্ট বি-২৯ বক্সকার নামে আরেকটি বোমারু বিমান নাগাসাকি শহরে নিক্ষেপ করে ফ্যাট ম্যান নামে পারমানবিক বোমা। এর পাইলট ছিলেন মেজর চার্লস ডব্লিউ সোয়েনি। নাগাসাকি শহর থেকে ১ হাজার ৬৫০ ফিট উপরে বিস্ফোরিত হয় ফ্যাট ম্যান। ১৯৪৫ সালের ৬ নভেম্বর এনোলা গে মেরিনা আইল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেয়া হয়। ১৯৪৬ সাল থেকে এনোলা গে এবং বক্সকার সংরক্ষনের উদ্যোগ নেয়া হয়।

নিউক্লিয়ার বম্বিং মিশনে নিয়োজিত বি-২৯ এনোলা গে বিমানটিতে মোট ১২ জন ক্রু ছিল। শেষ পাইলট থিওডোর ভ্যান কার্ক মারা যায় ২০১৪ সালের ২৮ জুলাই। তখন তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।

জাপানে এটম বম্বিং মিশন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সুপার সিক্রেট বা সর্বোচ্চ গোপনীয় একটি মিশন। যুক্তরাষ্ট্রে যখন বি-২৯ এনোলা গে বিমানে লিটল বয় বসানো হয় তখন বিমানটি গোপন রাখা হয় যাতে মিশনের লোকজন ছাড়া এয়ার ফোর্সের অন্য কোনো সদস্য এ বিষয়ে কিছুই জানতে না পারে। এমনকি মেরিনা আইল্যান্ডের তিনিয়ান দ্বীপে যখন পারমানবিক বোমাসহ বি-২৯ বিমানটি অবতরণ করে তখনো সেখানে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো সৈনিক, বৈমানিক এ বিষয়ে কিছুই জানত না। এমনকি মিশন পরিচালনাকারী ইউনিটেরও অন্য কোনো বৈমানিক এ বিষয়ে ছিল পুরো অন্ধকারে।

ইনোলা গে বিমানটি বর্তমানে রাখা আছে ওয়াশিংটনের ডালাস এয়ার পোর্টের স্মিথ সোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার এন্ড স্পেস মিউজিয়ামে। যাদুঘরে বিমানটির নাম লেখা রয়েছে ‘বোয়িং বি-২৯ সুপার ফোরট্রেস এনোলা গে’। বক্সকার রাখা আছে ওহাইও রাজ্যে অবস্থিত ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ইউনাইটেড স্টেটস এয়ার ফোর্স এ।

বি-২৯ প্রথম আকাশে ওড়ে ১৯৪২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। মোট ৩ হাজার ৯৭০টি বি-২৯ সুপার ফোরট্রেস বোমারু বিমান নির্মান করা হয়। এটি একটি স্ট্রাটেজিক, হেভি বমার। এর ইঞ্জিন সংখ্যা ৪টি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় সব বি-২৯ বোামরু বিমান ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় পর্যন্ত বি-২৯ ছিল সর্বোচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন বিমান। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহার করা সবচেয়ে বড় বোমারু বিমান।

বি-২৯ বোমারু বিমান প্রথম যুদ্ধ মিশন পরিচালনা করে ভারত থেকে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ৫টি ঘাটিতে ৭৭টি বি-২৯ বিমান মোতায়েন করে। ১৯৪৪ সালেল ৫ জুন ভারত থেকে সর্বপ্রথম ব্যাংককে হামলা চালায় এ বিমান।

জাপানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য এসময় চীনের চেংদু এলাকায়ও মোতায়েন করা হয় ৬৮টি বি-২৯ বমার। ১৯৪৪ সালের ১৫ জুন ৪৭টি বি-২৯ বিমান চেংদু ঘাটি থেকে জাপানে হামলা শুরু করে। জাপান, থাইল্যান্ড সিঙ্গাপুরসহ পুরো দক্ষিন পূর্ব এশিয়ায় বি-২৯ বোমারু বিমান অপারেশন পরিচালনা করে চীন, ভারত ও উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের মেরিনা আইল্যান্ড থেকে ।

১৯৪৫ সালের ২৯ মার্চ পর্যন্ত ভারত থেকে মিশন পরিচালনা করে বি-২৯। এরপর গুয়াম দ্বীপসহ মেরিনা আইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র জাপানের কাছ থেকে পুন দখলের পর সেখান থেকে অপারেশন পরিচালনা করে বি-২৯।

১৯৬০ যুক্তরাষ্ট্র বি-২৯ বিমান অবসরে পাঠালেও ২টি বিমান এখন পর্যন্ত চালু রেখেছে । এ বিমান দুটির নাম এফআই এফআই এবং ডক। এফআই এফআই মাঝে মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার মধ্যে চলাচল করে। বিভিন্ন এয়ার শোতে অংশ নেয় এ বিমান।

অপরদিকে পরমাণু বোমা মিশন পরিচালনার জন্য নির্মিত ৬৫টি বি-২৯ সিলভার প্লেট সিরিজের ২২টি বিমান যাদুঘরে রক্ষিত আছে বর্তমানে । এর মধ্যে ২০টি যুক্তরাষ্ট্রে, ১টি বৃটেনে এবং ১টি দক্ষিন কোরিয়ায়। বি-২৯ বিমানের নির্মাতা বোয়িং। তবে জাপানে এটম বোমা নিক্ষেপকারী বি-২৯ বিমান তৈরি করে গেøন এল মার্টিন কোম্পানী। বর্তমানে এটি লকহিড মার্টিন এর সাথে একীভূত।

হিরোশিমায় ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট এটম বোমা  ফেলা হয়  যে বি-২৯ বিমান থেকে তার  পাইলট ও  কমান্ডার ছিলেন কর্নেল পল ডব্লিউ  তিব্বেতস। ছবি : ব্রিটেনিকা ডটকম
হিরোশিমায় ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট এটম বোমা ফেলা হয় যে বি-২৯ বিমান থেকে তার পাইলট ও কমান্ডার ছিলেন কর্নেল পল ডব্লিউ তিব্বেতস। ছবি : ব্রিটেনিকা ডটকম

 

পরমাণু বোমা কর্মসূচীর জন্য সিলভার প্লেট সিরিজের ৬৫টি বি-২৯ সহ গেøন এল মার্টিন কোম্পানী ৫৩৬ টি বি-২৯ সুপর ফোরট্রেস বোমরু বিমান তৈরি করে তখন। এ ছাড়া বেল এয়ারক্রাফটও নির্মান করে ৬৬৮টি বি-২৯ বিমান।

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বৃটেনের বিমান বাহিনী ব্যবহার করেছে বি-২৯ বোমারু বিমান বিমান। বি-২৯ এর পাইটলট সংখ্যা ১১ জন। বিমানটির দৈর্ঘ্য ৯৯ ফিট। উচ্চতা ২৭ ফিট। শূণ্য বিমানটির ওজন ৩৩ টন ৭৯৩ কেজি। গ্রস ওয়েট ৫৪ টন। ম্যাক্সিম্যাম টেক অফ ৬০ টন ৫৫৫ কেজি। উই স্প্যান বা দুই ডানার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের দৈর্ঘ্য ১৪১ ফিট। ম্যাক্সিমাম স্পিড ঘন্টায় ৩৫৭ মাইল।

২টন ৩০০ কেজি ওজনের বোমা নিয়ে সর্বোচ্চ উচ্চতায় উড়তে পারে। সর্বনিম্ম উচ্চতায় বহন করতে পারে ১০ টন ওজনের বোমা। কয়েকটি বি-২৯ বিমান তখন উড়ন্ত টেলিভিশন ট্রান্সমিটার হিসেবে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন কোম্পানীর পক্ষ থেকে। বি-২৯ এর একটি ভার্সন হলো বি-৫০। ১৯৪৯ সালে বি ৫০ বোমারু বিমান টানা ৯৪ ঘন্টা আকাশে ওড়ে পৃথিবীর চার দিকে পরিভ্রমন করে যা এভিয়েশন ইতিহাসে প্রথম।

বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে