ইলহান ওমরের অবিশ্বাস্য জয়

যুক্তরাষ্ট্রের ছোট একটি এলাকার জনপ্রতিনিধি হয়েও ইলহান যেন এখন বিশ্বের শত কোটি মানুষে জনপ্রতিনিধি - ইলহান ওমরের ফেসবুক থেকে

  • ইলিয়াস হোসেন
  • ১৬ আগস্ট ২০২০, ১৭:১৮

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সরব এক মুসলিম কংগ্রেস সদস্য। যিনি ইসরাইলের কট্টর সমালোচক। কাশ্মীরে ভারতের নিপীড়নমুলক শাসনের নিন্দায়ও তিনি সোচ্চার। সৌদি আরবের শাসকদের জবাবদিহিতার কথা জোরোশোরে বলছেন । যুক্তরাষ্ট্রের আলোচিত এই কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর। এক উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে আবারও ডেমোক্রেট দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। বিপুল ভোটে তিনি হারিয়েছেন ইহুদি লবির পছন্দের প্রার্থীকে। আসুন জেনে নেই খ্যাতিমান এই মার্কিন রাজনীতিকের সেই অবিশ্বাস্য জয়ের নেপথ্যর গল্প।

২০১৮ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলের মনোনয়নে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন ইলহান ওমর। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যে দুই মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হন তাদেরই একজন ইলহান। এরপর হিজাব পরে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে তিনি আরেক ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

তার পরের ইতিহাস শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়ার। যুক্তরাষ্ট্রের ছোট একটি এলাকার জনপ্রতিনিধি হয়েও ইলহান যেন এখন বিশ্বের শত কোটি মানুষে জনপ্রতিনিধি। তিনি কুড়িয়েছেন বিশ্বখ্যাত তারকার সুনাম। তবে এসব কিছুই তিনি করেছেন ইসলামে বিশ্বাস এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল আস্থা রেখেই।

তবে বৈরি স্রোতে সাতার কাটতে গিয়ে তিনি শত্রু বানিয়ে ফেলেছেন আমেরিকার উগ্র শেতাঙ্গ, রিপাবলিকান দলের নেতাকর্মী আর প্রভাবশালী ইহুদি লবি ও রক্ষণশীল গণমাধ্যমকে। ট্রাম্পের নীতির সঙ্গে তার বিরোধ তো নিত্যদিনের।
শুধু তাই নয়, ডেমোক্রেট দলেও তার শত্রু কম নয়। তবে তিনি আপোস করেননি, হালও ছাড়েননি। এগিয়েছেন দৃঢ় পদক্ষেপে। তার তাতে শত্রæ যেমন বেড়েছে তেমনি বন্ধু জুটেছে বেসুমার।

এ অবস্থায় ১১ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয় মিনেসোটায় তার আসনের ডেমোক্রেট দলীয় মনোনয়নের লড়াই। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস পদে প্রতি দুই বছর পর পর ভোট হয়। সিনেট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট হয় চার বছর পরপর। নির্বাচনে ইলহানের প্রতিদ্ব›দ্বী ছিলেন প্রগতিশীল দাবিদার মেল্টন মক্স। ইলহান ওমরের আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সোচ্চার ভূমিকার কট্টর সমালোচক তিনি। তিনি চান, মিনেসোটার প্রার্থী শুধু নিজ এলাকার ইস্যু নিয়েই কথা বলবেন। কিন্তু ভোটাররা মেল্টনের যুক্তি নাকচ করে দিয়েছেন।

ইলহান ওমর ১৫ শতাংশে বেশি ভোট পেয়ে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন । যুক্তরাষ্ট্রের এই আসনটি ডিপ ব্লু অঞ্চলের অংশ যেখানে ডেমোক্রেট মনোনয়ন পাওয়া মানেই নির্বাচনে অবধারিত জয়। ফলে আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদে কংগ্রেস বা হাউস অব রিপেজেনটেটিভের আসন অলংকৃত করতে যাচ্ছেন ইলহান।

তার এ বিজয় শুধু একজন প্রতিদ্বদ্বীকে হারিয়ে আরেকজনের জয় নয়। এর মাধ্যমে ইসরাইল ও মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে ডেমোক্রেট ভোটারদের মনোভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর সুদুরপ্রসারী প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে। ট্রাম্পকে হারিয়ে জো বাইডেন জয়ী হলে সেটা আরও বেশি দৃশ্যমান হবে। তবে ইলহানের এবারের জয় সহজসাধ্য ছিল না।

দেশটির শেতাঙ্গ গোষ্ঠী ও ইহুদিবাদী লবি তার প্রতিদ্বন্দ্বী মেল্টনের পেছনে রাশি রাশি টাকা ঢেলেছে। বড় বড় দাতারা মেল্টনের নির্বাচনী তহবিলে টাকা দিয়েছেন। এমনকি একজন সুপরিচিত রিপাবলিকান সমর্থকও মেল্টনকে বিপুল অর্থ দিয়েছেন। তার তহবিলের ২০ ভাগই এসেছে ইহুদিবাদী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে। সব মিলিয়ে ৪০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩৪ কোটি টাকা তিনি সংগ্রহ করেছেন একটি ছোট এলাকার দলীয় মনোনন লাভের লড়াইয়ের জন্য।

করোনা ভাইরাসের কারণে এবার মাঠে লড়াই হয়নি। প্রচারণা চলেছে অনলাইন ও মূলধারার গণমাধ্যমে। তাতে মেল্টন টাকার বন্যা বইয়ে দিয়েছেন। বিপরীতে ইলহান ওমর কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর টাকা নেননি। কারণে তাতে তাদের আবদার রক্ষার জন্য তাকে আপোস করতে হবে। তিনি হাত পেতেছেন সাধারণ মানুষের কাছে। তিনি নিয়েছেন সর্বোচ্চ ২০০ ডলার পর্যন্ত অনুদান। তবে তার ভরসা ছিল ভোটাররা। তিনি নিশ্চিত ছিলেন তার জয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। তাই ভোটের দিনও তাকে খোশমেজাজে দেখা গেছে। নির্বাচনী টিম নিয়ে হোটেল খেতেও দেখা গেছে তাকে।

দেড় বছর কংগ্রেস সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যেমন আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন তেমনি জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতেও রেখেছেন অনন্য অবদান। গৃহহীনদের জন্য আবাসন, ছাত্র ঋণ মওকুফ, আয় বৈষম্য দূর করা, ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটার্স আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। এই অল্প সময়ে তিনি কংগ্রেসে ৪৮টি বিল ও সংশোধনী উত্থাপন করেছেন এবং ৫৪৮টি বিলে সহ উত্থাপকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

এসব করতে গিয়ে রিপাবিলকান ও ট্রাম্প সমর্থকদের রোষানলে পড়েছেন তিনি। ট্রাম্প সমর্থকরা তাকে ইহুদিবিদ্বেষী বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি আমেরিকার তথাকথিত মূল্যবোধ ধারণ করেন কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। শুধু তাই নয়, তাকে তার পৈত্রিক দেশ সোমালিয়ায় ফিরে যেতে বলেছেন। ফক্স নিউজসহ রক্ষণশীল গণমাধ্যমগুলো তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও টানাহেচড়া করতে ছাড়েনি। তবে এতে ভড়কে যাননি ইলহান।

নির্বাচনে তাকে নিয়ে নোংরা প্রচারণা চললেও ইলহাম ছিলেন অবিচল। তিনি বলেছেন, নিজ সম্প্রদায়ের জীবনে আপনি যদি প্রতিদিনই প্রভাব ফেলতে পারেন তবে করপোরেট ডলার আপনাকে হারাতে পারবে না। মিনেসোটার সংগঠিত জনগণ সংগঠিত অর্থকে পরাজিত করবে বলেও মত দিয়েছিলেন তিনি।

ইলহান ওমর হলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল চার নারী কংগ্রেস সদস্যের একজন যাদেরকে বলা হয়ে স্কোয়াড। এই স্কয়াডের বাকি তিন সসদ্য হলেন কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্তেজ, ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভুত রাশিদা তালিব এবং আয়ানা প্রেসলি। কংগ্রেসের পরবর্তী মেয়াদের তাদের প্রত্যেকের জয় নিশ্চিত হয়ে গেছে।

নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলের বামঘেষা অংশের জোরালো সমর্থন পেয়েছেন ইলহান। এর মধ্যে অন্যতম হলেন ওকাসিও কর্তেজ ও স্পিকার ন্যানসি পেলোসি। পিউ রিসার্চ সেন্টার এক হিসাবে বলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৩৪ লাখ। তবে এটা দ্রæত বর্ধনশীল। এক দশক আগের তুলনায় বেড়েছে মুসলিম বেড়েছে ১০ লাখ। তবে দেশটিতে মুসলিমরা নানা বৈষমের স্বীকার। ফলে ইলহামের এই যাত্রাও ছিল কণ্টকাকীর্ণ।

সোমালিয়া থেকে এসে ইলহান যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়েছেন। তার জন্ম ১৯৮১ সালে মোগাদিসুতে। সোমালিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালে ১৯৯১ সালে তিনি বাবার সাথে কেনিয়ায় পালিয়ে যান। তারা কেনিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে প্রায় চার বছর অবস্থান করেন। ২৫ বছর পর ৩৭ বছর বয়সে ২০১৮ সালের ইলহান কংগ্রেসে একজন মুসলিম প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। আসুন জেনে নেই ইলহান ওমরের জীবনের কিছু দিক।

পিতা- মাতার সাত সন্তানের মধ্যে ইলহান সবচেয়ে ছোট। তার বাবা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতেন। ইলহানের বয়স যখন প্রায় দুই বছর, তখন তার মা মারা যান। বাবা এবং দাদার কাছে তিনি বড় হন। ১৯ বছর বয়সে ২০০০ সালে ইলহান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন। নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

২০১৮ সালে জেতার পর তার প্রথম ভাষণে, ইলহান ওমর বলেছিলেন, ‘আজ রাতে অনেকগুলো প্রথম বিশেষণের অধিকারী হিসাবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি। প্রথম অশ্বেতাঙ্গ হিসাবে আমি কংগ্রেসে এই রাজ্যকে প্রতিনিধিত্ব করতে চলেছি। আমি হিজাব পরিহিত নারী হিসাবে কংগ্রেস যাচ্ছি। আমিই প্রথম শরণার্থী যে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছি, এবং প্রথম একজন মুসলিম নারী হিসাবে কংগ্রেসে যাচ্ছি।’

ইলহানের হিজাব পরা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। এ ব্যাপারে ইলহান বলেন, ‘আমার মাথায় কেউ হিজাব পরিয়ে দেয়নি। আমি নিজেই তা পরেছি। এটা আমার ব্যাপার।’

নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভের পর ইলহান বলেছেন, আজ শুধু আমাদের আন্দোলনই জয়ী হয়নি, আমরা পরিবর্তনের ম্যান্ডেট পেয়েছি। ছবি : ইলহান ওমরের ফেসবুক থেকে
নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভের পর ইলহান বলেছেন, আজ শুধু আমাদের আন্দোলনই জয়ী হয়নি, আমরা পরিবর্তনের ম্যান্ডেট পেয়েছি। ছবি : ইলহান ওমরের ফেসবুক থেকে

 

তিনি সবার জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষার্থীদের ঋণ মওকুফ ইত্যাদি বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের কথা বলেন। গৃহায়ন সুবিধার প্রতিও গুরুত্ব দেন। কলেজের যেসব শিক্ষার্থীর পরিবারের আয় অনেক কম তাদের বিনা বেতনে অধ্যয়নের কথা বলেন। শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। ফলে ভোটাররা তাকে তো ভালবাসবেই।

নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভের পর ইলহান বলেছেন, আজ শুধু আমাদের আন্দোলনই জয়ী হয়নি, আমরা পরিবর্তনের ম্যান্ডেট পেয়েছি। আমাদের পরাজিত করতে বাইরের শক্তি কাজ করলেও আবার আমরা রেকর্ড ভোট পেয়েছি। আমাদের ওপর হামলা চালালেও আমাদের সমর্থন শুধু বেড়েই চলেছে।

ইলহাম যে অতিশয়োক্তি করেননি তা বোঝা যায় তার প্রতি মানুষের অব্যাহত সমর্থন দেখে। ভোটের দিনও তার অনেক তরুণ সমর্থক জড়ো হয়েছিলেন মিনেসোটার ডিঙ্কিটাউনে। তারা স্লোগান দেন ‘ইলহান, আমরা তোমায় ভালোবাসি।’

বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে