যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে দেশটির ইভানজেলিক সম্প্রদায়। নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ের জন্য ইভানজেলিস্টদের বিভিন্ন সংস্থা ও গ্রুপ জোরালো ভূমিকা পালন করেছে। এরকম একটি সংস্থা হলো ইউনাইটেড ইন পারপাস বা ইউআইপি। ২০২০ সালের নির্বাচনেও ট্রাম্প যাতে পুনারায় হোয়াইট হাউজে বসতে পারেন সেজন্য ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করেছে ইউআইপি।
ইউনাইটেড ইন পারপাস মূলত খৃস্টান ধর্মে বিশ্বাসী ভোটারদের ট্রাম্পের পক্ষে আনার চেষ্টা করে। ভোটারদের মধ্যে কারা ধর্মে বিশ্বাসী তা খুঁজে বের করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সমস্ত ভোটারদের ডেটা ব্যাংক রয়েছে তাদের কাছে। এ ছাড়াও স্বাধীন, বিচ্ছিন্ন এবং সংখ্যালঘু ভোটারদেরও ট্রাম্পের পক্ষে প্রভাবিত করার জন্য নানা ধরনের কৌশলের আশ্রয় নেয়। ভোটারদের প্রভাবিত করতে অনেক সময় আশ্রয় নেয়া হয় মিথ্যাচার এবং ঘৃণা ছড়ানোর কাজে।
বিশ্বে প্রতি চারজন খৃস্টানের একজন ইভানজেলিস্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে সবচেয়ে বেশি ইভানজেলিস্টদের বসবাস। যুক্তরাষ্ট্রের চারভাগের এক ভাগ নাগরিক ইভানজেস্টি বা ইভানজেলিক্যালস। ইভানজেলিস্টরা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় শ্রেণি। প্রোটেসট্যান্ট খৃস্টানদের যত গ্রুপ রয়েছে তাদের সাবই মিলে ইভানজেলিক্যালস নামে পরিচতি। ইভানজেলিক্যালসরা বাইবেলের পাশপাশি গসপেলের প্রকাশ্য প্রচারে বিশ্বাসী।
ট্রাম্পের পক্ষে কার্যক্রম পরিচালনার কর্মকৌশল ঠিক করছে ইউনাইটেড ইন পারপাস। ইভানজেলিক এবং রিপাবলিকনাদের একজন বড় ধরনের ডোনার হলেন কেন এলড্রেড। এক বৈঠকে তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস ঈশ্বরের দান। ঈশ্বরের রাজত্ব একের পর এক গৌরবময় বিজয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে। কৌশলী আর ছদ্মবেশী ধ্বংসলীলার মধ্য দিয়ে। তার মতে করোনার কারনে লাখ লাখ আমেরিকান যিশুর প্রতি মনোযোগী হচ্ছে। ওয়ালমার্টের বাইবেলের বিক্রি শেষ হয়ে গেছে। অনলাইনে চার্চের প্রচারিত ভিডিওতে রেকর্ড হিটের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু শয়তানও বসে নেই। সেও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। করোনা ভাইরাস আমাদের অনেক পরিকল্পনা লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। করোনার কারনে আমরা আমাদের ভোটারদের সাথে সরাসরি দেখা সাক্ষাত করতে পারছি না। এরপর সংক্ষিপ্ত প্রার্থনা শেষে কেন এলড্রেড বলেন, আমরা করোনা ভাইরাসকে কোনঠাসা করে ফেলেছি। তিনি ঈশ্বরের কাছে অনুরোধ করেন করোনায় মৃত্যু থামাতে।
খৃস্টান ভোটাররা কিভাবে ট্রাম্পের পুনরায় নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি শক্তি হয়ে উঠতে পারে এ বিষয়ে জোরালো কার্যক্রম শুরু করেছে ডানপন্থী খৃস্টান সংস্থা ইউআইপি। ইভানজেলিকাল নেতাদের সাথে ট্রাম্পকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে মূল ভূমিকা পালন করে ইউআইপি। আর এ বছরও তারা ট্রাম্পের পুনরায় নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালনকারদের অন্যতম একটিতে পরিণত হতে চায়।
ইউআইপির বোর্ড সদস্য ইতিহাসবিদ ডেভিড বার্টন মনে করেন, আমেরিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে একটি গোড়া খৃস্টান জাতি হিসেবে। যেখানে চার্চ এবং রাষ্ট্র আলাদা থাকবে না। ইউআইপি এবারও উদ্যোগ নিয়েছে ইভানজেলিকাল নেতাদের সাথে ট্রাম্পকে যুক্ত করার জন্য। ২০২০ সালের নির্বাচনী পরিকল্পনার তারা নাম দিয়েছে জিকলাগ। জিকলাগ হলো বাইবেলে বর্ণিত একটি শহর। এ পরিকল্পনার আওতায় তারা ইভানজেলিক নেতাদের সাথে ট্রাম্পকে যুক্ত করবেন, ধর্মীয় বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে সংখ্যালঘু এবং চার্চের বাইরের ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাবে।
এ লক্ষ্যে তারা লাখ লাখ নতুন ভোটারদের সনাক্তকরনের কাজ করবে। এ জন্য তারা ব্যবহার করবে ফেসবুক প্রচারণা। কালোদের মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থন কম। এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইউআইপি জোর দেবে ডরম্যান্ট ইভানজেলিক্যাল এবং কনজারভেটিভ ক্যাথলিক ভোটারদের কিভাবে কাছে টানা যায় সে বিষয়ে।
ইউআইপির পরিকল্পনা হচ্ছে ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণা অনুসরন করা। এবার তারা বেশি মনোযোগ দেবে সংখ্যালঘু বিচ্ছিন্ন ভোটারদের প্রতি। ইউআইপির ব্রায়ান বার্চ বলেন, বিচ্ছিন্ন সংখ্যালঘু এবং ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন ভোটারদের সমর্থন আদায়ের জন্য বিভিন্ন রাজ্যের অংশীদারদের মাঝে ইতোমধ্যে অনেক অনুদান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
বুশের পক্ষে কাজ করা ইভানজেলিক নেতা রাফ রিড ২০১৬ সালের নির্বাচনের ফল পর্যালোচনা করে বলেছেন, রাস বেল্ট রাজ্যে আফ্রিকান আমেরিকান ভোটারের উপস্থিতি ছিল কম । যা এই রাজ্যে রিপাবলিকানদের জয়ে মূল ভূমিকা পালন করেছে। ভোটারদের বোঝানো হয়েছিল, হিলারি হেরে যাবে। কারন বারাক ওবামাকে সংখ্যালঘু কালোরা যেভাবে ভোট দিয়েছিল সেভাবে তার এবার হিলারিকে ভোট দেবে না। অপর দিকে শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের বোঝানো হয়েছিল ট্রাম্প হলেন ইভানজেলিক্যাল এবং জীবন যাপনের ক্ষেত্রে ক্যাথলিকপন্থী।
ইউনাইটেড ইন পারপাস সংস্থার সাথে আরো বিভিন্ন সংস্থার যোগ আছে। কট্টর রক্ষনশীল পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষায় কাজ করছে টনি পারকিন প্রতিষ্ঠিত থিংক ট্যাঙ্ক ফ্যামিলি রিসার্স কাউন্সিল। ফ্যামিলি রিসার্স কাউন্সিলের সাথে ঘণিষ্ঠভাবে কাজ করে ইউআইপি। খৃস্টান আরেকটি রক্ষণশীল সংস্থার নাম হলো কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল পলিসি। এ সংস্থার সক্রিয় সদস্য হলো সাবেক রিপাবলিকান বব ম্যাক ইউন। বব ম্যাক ইউনকে ইউআইপির বোর্ড সদস্যা করা হয়েছে। ট্যাক্সের রেকর্ডে দেখা যায় ওয়েল স্প্রিং কমিটির কাছ থেকে ইউআইপি ৭৫ হাজার ডলার গ্রহণ করেছে। ওয়েল স্প্রিং কমিটি হলো আরেকটি রহস্যজনক অলাভজনক সংস্থা।
২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন লাভের পর ইউআইপি ট্রাম্পের সাথে একটি হাই-প্রোফাইল বৈঠকের আয়োজন করে। এখানে প্রায় এক হাজার ইভানজেলিক নেতাদের সাথে সাক্ষাত হয় ট্রাম্পের। এ বৈঠকে ট্রাম্প চার্চের ওপর থেকে রাষ্ট্রীয় বিধি নিষেধ তুলে নেয়া এবং ধর্মীয় সম্পৃক্ত লোকদের বিচারক হিসেবে নিয়োগদানের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেন।
ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হবার পর থেকে ইউআইপি দেশজুড়ে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। নামকরা ধর্মীয় নেতা এবং ডোনারদের তাদের পক্ষে আনার জন্য কাজ করছে। ২০১৭ সালে ইউআইপি জাকজমকপূর্ণ একটি অ্যওয়ার্ড অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে। ইউআইপির সাথে এ অনুষ্ঠানের অপর আয়োজক ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ক্লারেন্স থমাসের স্ত্রী গিনি থমাস। ২০১৮ সালে ইউআইপির ডিনার অনুষ্ঠানে যোগদান করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স।
রিপাবলিকান দলের অন্যতম একজন ডোনার জলেন জর্জ সি। তিনি বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আন্নাডেল ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী। জর্জ সি ইউআইপির জিকলাগ কর্মসূচীর অনেক বৈঠক আয়োজনের ব্যবস্থা করেছেন।
সুসান বি এন্থনি লিস্ট হলো গর্ভপাত বিরোধী একটি গ্রুপ। এ গ্রুপের নেতা মারজোরি ডানেনফেলচার সম্প্রতি যোগ দিয়েছেন ইউআইপির সাথে। ট্রাম্পের অবস্থান গর্ভপাত বিরোধী। এ সংস্থা গর্ভপাত ইস্যুকে রিপালিকান, ডেমোক্রেট এবং স্বাধীন ভোটারদের মধ্যে তুলে ধরছে এবং এর পক্ষে ভালো ফল পেয়েছে।
গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প শুরু করেছেন ‘ইভানজেলিক্যালস ফর ট্রাম্প’ নামে প্রচারণা। এটি তিনি উদ্বোধন করেছেন মিয়ামির ল্যাটিনো মেগাচার্চে । এ চার্চের নেতৃত্বে রয়েছেন ইভানজেলিক্যাল নেতা গ্যালিরমো মালডোনাডো। ধর্মে বিশ্বাসী ভোটারদের খুঁজে বের করার জন্য ইউআইপি ব্যবহার করছে ডেটা মাইনিং টুলস। যেসব এলাকায় তুমুল লড়াই হবে সেসব এলাকার ২ কোটি ৬০ লাখ ভোটার চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের তিন ভাগের দুই ভাগ ফেসবুক ব্যবহার করে। টেলিভিশন প্রচারণায় যে খরচ তার নগন্য অংশ খরচ করে ফেসবুকের মাধ্যমে এসব ভোটারদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাদের কাছে আমরা পৌছানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
সাবেক মডেল বিল ডালাস প্রতিষ্ঠা করেন ইউনাইটেড ইন পারপাস বা ইউআইপি। তিনি সানফ্রান্সিসকো রিয়েল স্টেট বিনিয়োগকারী এবং একজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। এছাড়া চার্চের কার্যক্রম প্রচারের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন চার্চ কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক, অনলাইন নেটওয়ার্ক। ধর্মীয় ভোটারদের খুজে বের করার জন্য বর্তমানে তিনি পরিচালনা করছেন পাইওনিয়ার সলুশনস নামে একটি ডেটা মাইনিং অপারেশন।
পাইওনিয়ার সলুশনের কাছে ভোটারদের ডেমোগ্রাফিক তথ্য দেখে বিস্মিত হবেন অনেক তথ্য প্রযুক্তি গবেষক। ভোটারদের বন্দুক থাকা থেকে শুরু করে বাইবেল অনুযায়ী কে কতটা জীবন যাপন করে তার সব তথ্যই রয়েছে তাদের কাছে। তাদের এ ডেটা ব্যাংক ফাঁস হয়েছে এবং তাতে দেখা যায় তাদের কাছে ১৯ কোটিরও বেশি মার্কিন নাগরিকের তথ্য রয়েছে।
ই্উআইপি চেষ্টা করে চার্চের গণজমায়েতে যোগদানকারীদের রিপাবলিকানদের পক্ষে আনার জন্য। এজন্য তারা গ্রহণ করেছে জিওফেন্সিং কৌশল। ২০১৮ সালে এ সংস্থা ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বচনে জয়ের ব্যাপারে ভূমিকা পালন করে।
ইউআইপির একজন অফিস কর্মকর্তার নাম কেলি কুলবার্গ। এ মহিলার রয়েছে ২৪টি ফেসবুক একাউন্ট এবং ১৪ লাখ অনুসারী। ফেসবুকে তিনি তার অনুসারীদের মধ্যে পরিচালনা করেন দলীয় বিভক্তির কার্যক্রম এবং এজন্য সরবরাহ করে থাকেন নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য। বøার্কস ফর ট্রাম্প, ইভানজেলিক্যালস ফর বিবলিক্যাল ইমিগ্রেশন, ভেটারানাস ফর ট্রাম্প, নার্সেস এন্ড ডক্টরস ফর আমেরিাক প্রভৃতি গ্রুপ খুলে তিনি প্রতি নিয়ত মিথ্যা এবং ঘৃণা সৃষ্টির তথ্য প্রচার করে চলছেন।
কেলিবাগের ফেসবুক নেটওয়ার্কে শেয়ার হওয়া বিভিন্ন পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রে শরনার্থী এবং মুসলিমবিরোধী নানা ধরনের প্রচারণা রয়েছে। এ ধরনের একটি পোস্টে লেখা হয়েছে মুসলমানরা আমেরিকান সমজের সাথে মিশে যেতে পারবে না কারন তারা শরিয়া আইনের প্রতি অনুগত। আর শরনার্থী কর্মসূচীর কারনে আমেরিকার সংস্কৃতি বিপন্ন হবে এবং তারা হয়ে পড়বে শরণার্থীদের অধীন।
বিশেষজ্ঞদের মতে করোনা ভাইরাসের কারণে ইউআইপির মত কট্টর ট্রাম্পপন্থীরা আগের মতো সুবিধা করতে পারবে না। কারণ তারা যেসব ইস্যুতে কাজ করে করোনা ভাইরাসের কারণে সেসব ইস্যু আর মানুষের কাছে তেমন গুরুত্ব নাও পেতে পারে। আমেরকিনারদের কাছে এখন জরুরি বিষয় হলো চাকরি, জীবিকা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক উন্নতি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা। তবে এসব সত্ত্বেও অনেকে মনে করেন ইউআইপি এখনো ডেমোক্রেটদের জন্য বড় ধরনের হুমকি।
বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে