অভ্যুত্থানের চার বছর পর কেমন আছে তুরস্ক

এরদোয়ানের ডাকে সাড়া দিয়ে লাখ লাখ মানুষ তখন ইস্তাম্বুল আর আংকারার রাস্তায় নেমে এসেছে - আনাদুলো

  • ইলিয়াস হোসেন
  • ১৮ জুলাই ২০২০, ২০:০১

তুরস্কে চার বছর আগে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে বিস্ময়করভাবে টিকে যান প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। এরপর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে তুরস্কের অভূতপূর্ব উত্থান ঘটেছে। তবে পাশ্চাত্য আর তাদের মিত্র সৌদি জোটের নানা নিষেধাজ্ঞায় তুরস্ক অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা নাজুক সময় পার করছে। মূল্যস্ফীতির ফলে জনজীবনে দুর্ভোগ বেড়েছে। অভ্যুত্থানের পর এরদোয়ানের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায়ও দৃশ্যত লাগাম পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও।

অভ্যুত্থানের চার বছর পর এখন কোথায় দাঁড়িয়ে তুরস্কের তার নেতা এরদোয়ান, আজকের আলোচনা সেসব নিয়ে।

সেনাঅভ্যুত্থান আর তুরস্ক, একে অপরের প্রতিচ্ছবি। গত পাঁচ দশকে চারবার ক্ষমতা দখল করেছে তুরস্কের সেনাবাহিনী। প্রতিবারই মিলেছে পশ্চিমাদের জোরালো সমর্থন। তবে ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই সেনাবাহিনীর ‘গুলেন মুভমেন্ট’ সদস্যদের অভ্যুত্থান ঠেকিয়ে দিয়েছিল জনতা। সে এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক ঘটনা।

সেই রাতে যখন প্রথম অভ্যুত্থানের খবর ছড়িয়ে পড়ে, তারপর কয়েক ঘণ্টা দেশটির নিয়ন্ত্রণ ছিল বিদ্রোহী সেনাদের হাতে।

রাজধানী আংকারা আর সবচেয়ে বড় নগরী ইস্তাম্বুলের প্রধান স্থাপনাগুলোতে ছিল সেনাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো দখল করে নেয় সেনাবাহিনী এবং তাদের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এতো ঘটনার মধ্যে কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের। তিনি এক অবকাশ কেন্দ্রের যে হোটেলে ছিলেন সেখানে বোমা হামলা চালানো হয়। কিন্তু ততক্ষণে তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে যান। ফলে সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান।

কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তাকে দেখা গেল সিএনএন এর তুর্কী ভাষার নিউজ চ্যানেলে। মোবাইল ফোনে ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি জনগণকে রাস্তায় নেমে অভ্যুত্থান প্রতিহত করার ডাক দিলেন।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যখন ইস্তাম্বুলের কামাল আতাতুর্ক বিমানবন্দরে এসে নামেন, হাওয়া তখন পুরো তার অনুকূলে। ততক্ষণে পরিস্কার হয়ে গেল যে, অভ্যুত্থানকারীরা ব্যর্থ হয়েছে, সিনিয়র সেনা অধিনায়করা সরকারের পক্ষেই আছে।

এরদোয়ানের ডাকে সাড়া দিয়ে লাখ লাখ মানুষ তখন ইস্তাম্বুল আর আংকারার রাস্তায় নেমে এসেছে। বিমানবন্দরে যে সেনারা অবস্থান নিয়েছিল, তাদের ঘেরাও করে জনতা পুরো বিমানবন্দর দখল করে নেয়।

অভ্যুত্থানকারীরা রাস্তায় অনেক ট্যাংক নামিয়েছিল। তারা ইস্তাম্বুলের বসফোরাস প্রণালীর ওপরের ব্রিজ বন্ধ করে দেয়।

কিন্তু সেনাপ্রধান জেনারেল গুল হুলুসি আকার এই অভ্যুত্থানের সঙ্গে ছিলেন না। সবচেয়ে বড় নগরী ইস্তাম্বুলে ছিল যে সেনা ডিভিশন, তার অধিনায়কও এই অভ্যুত্থান সমর্থন করেননি। নৌবাহিনী প্রধান এবং বিশেষ বাহিনীর প্রধানও অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করেন। এফ-সিক্সটিন জঙ্গী বিমান থেকে অভ্যুত্থানকারীদের অবস্থানে বিমান হামলাও চালানো হয়।

তুরস্কে ব্যর্থ অভ্যুত্থানে ২৪ কুচক্রীসহ ২৪৮ জন নিহত হন। এর পর গ্রেফতার করা হয় ৮০ হাজার লোককে। সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ চাকরি হারান দেড় লাখ লোক। তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মামলা হয় এ অভ্যুত্থানের ঘটনায়।

সেই কালো রাতে নিহতদের স্মরণে ইস্তাম্বুলে তৈরি করা হয়েছে শহীদ স্মৃতি জাদুঘর। গতবছর এরদোয়ান সেটি উদ্বোধন করেছেন।

সেই সময় গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা ইউরোপ এবং আমেরিকা অভ্যুত্থানকারীদের নিন্দা জানাতে কালক্ষেপণ করেছে। তাদের অনেক রাজনীতিক ও গণমাধ্যম বরং এরদোয়ানের সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। যদিও তিনি অবাধ নির্বাচনে বিজয়ী এবং আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা।

এখনো অনেক দেশ, রাজনীতিক, বৃদ্ধিজীবী ও সংস্থা অভ্যুত্থান পরবর্তী তুরস্কের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এরদোয়ানের কড়া সমালোচনা করে থাকেন। কিন্তু তারা বলছেন যে অভ্যুত্থান সফল হলে তুরস্ক আজ কোথায় নিক্ষিপ্ত হতো। কী পরিণতি হতো গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ও তার দলের নেতাকর্মীদের। সামরিক শাসনে মানবাধিকার পরিস্থিতির কী অবস্থা দাঁড়াতো।

এক্ষেত্রে মিশরের কথা স্মরণ করা যায়। স্বৈরশাসক আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির শাসনে কী পরিণতি হয়েছে দেশটির? দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি বিনা অপরাধে কারাগারে মারা গেলেও পশ্চিমারা কার্যত মুখে কুলুপে এঁটে রয়েছেন।

অভ্যুত্থানের পর তুরস্কে কী কী পরিবর্তন এসেছে এবার তার কিছুটা জেনে নেয়া যাক।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকেই তুরস্কের সেনাবাহিনী একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছিল। আর্থিক থেকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষাসহ সব ক্ষেত্রেই। তবে ২০১৬ সালের ব্যর্থ সেনা–অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর সেই মর্যাদা রদ করে একে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা হয়। যারা গণতান্ত্রিক পন্থায় দেশকে এগিয়ে নিতে চান, তাদের চোখে এই বেসামরিকীকরণ গত একশ বছরের মধ্যে তুর্কি সেনাবাহিনীর কাঠামোগত বৈপ্লবিক পরিবর্তন। একই সঙ্গে এই বেসামরিকীকরণ সেনাবাহিনী-সিভিল সোসাইটি সম্পর্ককে গণতান্ত্রিকও করতে পারে।

২০১৬ সালের ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে তুরস্কের বিমানবাহিনীর অধীন স্কুলসমূহ বন্ধ করে নতুন জাতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটা সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের ‘এস্টাবলিশমেন্টের’ ক্ষমতাকে সীমিত করেছে। বিমানবাহিনীর অধীন স্কুলসমূহ বন্ধ করে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করেছে ক্ষমতাসীন একেপি এবং এরদোয়ান। প্রথমত, কট্টর আতাতুর্কপন্থীদের দখল থেকে বিমানবাহিনীর অধীন স্কুলসমূহকে মুক্ত করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা। ফলে সব শ্রেণির নাগরিক সেনাবাহিনীতে কাজ করার সুযোগ পাবেন। সেনাবাহিনীতে সৃষ্টি হবে ভারসাম্য। ঠেকানো যাবে ভবিষ্যৎ সেনা অভ্যুত্থান।

গত ১০০ বছর ধরেই এই স্কুলসমূহ এলিট তুর্কিদের দখলে। যে এলিটরা বারবার আতাতুর্কের আদর্শ রক্ষার নামে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেছে। সৃষ্টি করেছে অরাজকতা। দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনী থেকে গুলেন মুভমেন্টকে উৎখাত।

সেনাবাহিনীর মতোই সেনা স্কুলগুলো স্বায়ত্তশাসিত ছিল। স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ নিয়ে আশির দশক থেকে গুলেন মুভমেন্ট সেনাবাহিনীর অধীন স্কুলসমূহে তৎপরতা বৃদ্ধি করে। সেনাবাহিনী থেকে বামপন্থীদের খেদানোর নামে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে গুলেন মুভমেন্টের অনুসারীরা। গুলেন মুভমেন্টের এই অনুসারীরা বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে নিজস্ব লোকদের সেনাবাহিনীর উচ্চপদে আসীন করে। আর এরাই ছিল ২০১৬ সালের ব্যর্থ সেনা–অভ্যুত্থানে সামনের কাতারে।

তা সত্ত্বেও এরদোয়ান অভ্যন্তরীণভাবে কিছুটা চপে পড়েছেন। এরদোয়ানের একক ক্ষমতাকে ডিঙিয়ে দুই দশক পর স্থানীয় নির্বাচনে আঙ্কারা, ইস্তাম্বুলে বিজয়ী করেছে বিরোধীদের। একেপিকেতেও ভাঙন দেখা যাচ্ছে।

অনেকের অভিযোগ, তুরস্কে গণতন্ত্র আর আইনের শাসনের অবনতি হয়েছে। এরদোয়ান তুরস্ককে ইসলামীকরণের পথে নিয়ে যাচ্ছেন। ঐতিহাসিক আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর এর সর্বশেষ উদাহরণ।

বৈশ্বিক রাজনীতিতে সিরিয়ার যুদ্ধের শুরুর পর থেকেই তুরস্ক ধীরে ধীরে পশ্চিমা ও ন্যাটো বলয় থেকে দূরে সরে গিয়েছে। চীন ও রাশিয়ার নিকটবর্তী হয়ে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সদস্যপদের চেষ্টা করছে। এরদোয়ান এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সদস্যপদ পেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের জন্য না লড়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। এই ঘোষণা ছিল আঙ্কারার পশ্চিমা বলয় থেকে বেরিয়ে নতুন রাজনৈতিক বলয়ে যুক্ত হওয়ার চিন্তা। এই সংকটজনক অবস্থার মধ্যেই আবার আঙ্কারার রাশিয়ার তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা এস৪০০ কেনার ঘোষণা পশ্চিমাদের সার্বিকভাবে একেপি ও এরদোয়ানের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেয়।

অভ্যুত্থানকারীরা রাস্তায় অনেক ট্যাংক নামিয়েছিল। তারা ইস্তাম্বুলের বসফোরাস প্রণালীর ওপরের ব্রিজ বন্ধ করে দেয়। ছবি : বিবিসি
অভ্যুত্থানকারীরা রাস্তায় অনেক ট্যাংক নামিয়েছিল। তারা ইস্তাম্বুলের বসফোরাস প্রণালীর ওপরের ব্রিজ বন্ধ করে দেয়। ছবি : বিবিসি

 

তবে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এখনো তুরস্কে বিপুলভাবে জনপ্রিয়। তার বিরুদ্ধে যত অভিযোগই সমালোচকরা করুক না কেন, দেশটির অর্ধেক মানুষ এখনো তার সমর্থক।

তবে তুরস্কে ইইউ-এর সাবেক রাষ্ট্রদূত মার্ক পেরিনি বলছেন, দেশটি এখন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এবং ধর্মীয় রক্ষণশীলদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

অবশ্য তুরস্কে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জিম জেফরি বলেন, সমস্যা হচ্ছে ইউরোপিয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রএ অভ্যুত্থানের নিন্দা করতে অনেক দেরি করেছিল। যদিও চূড়ান্ত বিচারে এটি ছিল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে একটি গোষ্ঠীর অভ্যুত্থান।

তবে সাবেক আমেরিকান রাষ্ট্রদূত জিম জেফরি মনে করেন তুরস্ককে সম্পূর্ণ ইসলামিকরণের চেষ্টা কখনোই সফল হবে না।

তিনি বলেন, মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের সময় থেকেই শাসকরা তুরস্ককে জোর করে অ-ইসলামিকীকরণ করতে চেয়েছিল, যা সফল হয়নি। এখন আবার এরদোয়ান পুনরায় মানুষের মনে ধর্মীয় ভাবধারা জোরালো করার চেষ্টা করছেন । কিন্তু তুরস্ক একটি বিভক্ত দেশ এবং দেশটির সব লোককে কোনো একটি দিকে পুরোপুরি নিয়ে যাওয়া যাবে না।

গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তুরস্কের দাপট ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এরদোয়ানের কুশলী চালের কাছে সৌদি ও আমিরাত জোট এখন কোণঠাসা।

এরদোয়ান সরকার কাতারে সৌদি ও আরব আমিরাত জোটের অবৈধ অবরোধ ব্যর্থ করে দিয়েছে। কাতার এখন আরও বেশি শক্তিশালী। ইস্তাম্বুলে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশুগজিকে হত্যার পর সৌদির মূল ক্ষমতাধর যুবরাজ সালমানকে বিশ্বব্যাপী খুনি হিসেবে প্রতিষ্ঠায় এরদোগান নজিরবিহীন সাফল্য দেখিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে এখন আর আমেরিকা একচ্ছত্র অধিপতি নয়। তুরস্কও এখন বড় খেলোয়াড়। সিরিয়ায় আমেরিকা ও রাশিয়ার পরিকল্পনা ব্যর্র্থ করে দিয়েছেন এরদোয়ান। লিবিয়ার ঐতিহাসিক সাফল্য পেতে যাচ্ছে তুরস্ক যারা সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে।

ভূমধ্যসাগর ও ইউরোপের পূর্বাংশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তুরস্কের। ভূমধ্যসাগরে ফ্রান্স ও গ্রিসের মত শক্তি তুরস্কের ভয়ে পিছু হটছে। বিশ্বের আটটি দেশে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে তুরস্ক। মুসলিম বিশ্বের নানা সংকটে সৌদি আরব নীবর থাকলেও তুরস্ক সোচ্চার কণ্ঠে কথা বলছে।

বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে