তুরস্কের সামরিক শিল্পনগরী

অস্ত্র শিল্পে তুরস্কের রয়েছে সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্যের সন্ধান পেতে হলে আমাদের যেতে হবে ওই দেশের কিরিক্কাল প্রদেশে - ডেইলি সাবাহ

যুদ্ধ-সংঘাত-সংঘর্ষ এসব বুঝি মানবজাতির রক্তেই মিশে আছে। সেই আদিম কালে মানুষ লড়েছে বিরূপ প্রকৃতির সাথে, হিংস্র জীবজানোয়ারের সাথে। আর যতই উন্নত হয়েছে ততোই মানুষ নিজেকেই নিজের শত্রূ বানিয়ে নিয়েছে। ফলে বেড়েছে অস্ত্র প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আছে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর পাশ্চাত্যের দেশগুলো। এসব দেশ শুধু অস্ত্র নিয়ে গবেষণা, অস্ত্র উন্নয়ন ও নির্মাণই করে না, তারা অস্ত্র বাণিজ্যও করে। অস্ত্র নিয়ে গবেষণা, অস্ত্র উন্নয়ন ও নির্মাণকারীদের মধ্যে মুসলিম বিশ্বের বেশ-কিছু দেশও রয়েছে। তেমন একটি দেশ তুরস্ক।

সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, গত এক দশকে তুরস্কের সামরিক খাতের ব্যয় ৮৬ শতাংশ বেড়ে ২০১৯ সাল নাগাদ প্রায় আড়াই হাজার কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। অস্ত্র শিল্পে তুরস্কের রয়েছে সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্যের সন্ধান পেতে হলে আমাদের যেতে হবে ওই দেশের কিরিক্কাল প্রদেশে ।
কিরিক্কাল প্রদেশটির অবস্থান তুরস্কের মধ্যাঞ্চলে; রাজধানী আংকারার কাছেই। একসময় দেশীয় ব্র্যান্ডের এক ধরনের পিস্তল তৈরির জন্য এ প্রদেশটি বিখ্যাত ছিল। সেই পথ ধরে কালক্রমে আজ সেখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দেশীয় অস্ত্র কারখানা। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগের ফলে কিরিক্কাল প্রদেশ আজ ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি হাব বা সামরিক শিল্পের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়েছে। এখানে আছে মেকানিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন বা এমকেইকে। এ কর্পোরেশন বেশ-ক'টি অস্ত্র কারখানা পরিচালনা করে। এ নগরীতেই ২০১৪ সালে প্রতিষ্টিত হয় তুরস্কের প্রথম বিশেষায়িত বাণিজ্যিক এলাকা ওআইজেড, যেখানে কেবল অস্ত্র কারখানাই থাকবে। এখানকার একটি কারখানাতেই প্রথম বারের মতো সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তির ইনফ্যান্ট্রি রাইফেল উৎপাদন শুরু হয়।

কিরিক্কাল নগরীর প্রতিরক্ষা শিল্পের ইতিহাস শুরু একটি কার্টিজ তৈরির কারখানা দিয়ে। একই সাথে ওটা ছিল কিরিক্কাল প্রদেশের প্রথম শিল্প প্রতিষ্ঠানও। কারখানাটি কিছুকাল মিলিটারি রেডিফ ওয়্যারহাউস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরে এটিকে কার্টিজ তৈরির কারখানায় রুপান্তরিত করা হয়। ১৯২১ সাল থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত তুরস্কের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে এটিকে আবার কাজে লাগানো হয়।

কিরিক্কাল প্রদেশে মেকানিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন বা এমকেইকে বেশ-ক'টি অস্ত্র কারখানা পরিচালনা করে। এটি প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫০ সালের ৮ মার্চ। এর পুরো তহবিল যোগান দেয় রাষ্ট্র আর সাজসরঞ্জাম আসে বিভিন্ন মিলিটারি ফ্যাক্টরি থেকে। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্টিত দ্য আর্টিলারি অ্যান্ড অ্যামুনিশন, ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দ্য ইলেক্ট্রিক মেশিনারি ফ্যাক্টরি, ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দ্য অ্যামুনিশন ফ্যাক্টরি, ১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ইস্পাত কারখানা এবং ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কিছু গানপাউডার, রাইফেল ও বন্দুক কারখানার সমন্বয়ে গঠিত হয় এমকেইকে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত দ্য আর্টিলারি অ্যান্ড অ্যামুনিশন কারখানাটি কিরিক্কালে নগরায়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

কারখানাটি কিছুকাল মিলিটারি রেডিফ ওয়্যারহাউস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরে এটিকে কার্টিজ তৈরির কারখানায় রুপান্তরিত করা হয়। ছবিটি এসএভি তুর্ক থেকে নেওয়া
কারখানাটি কিছুকাল মিলিটারি রেডিফ ওয়্যারহাউস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরে এটিকে কার্টিজ তৈরির কারখানায় রুপান্তরিত করা হয়। ছবিটি এসএভি তুর্ক থেকে নেওয়া

এমকেইকে প্রতিষ্টার লক্ষ্য ছিল সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণকারী ফ্যাক্টরিগুলোকে আরো কার্যকর করা এবং তাদেরকে এমন কাঠামো দেয়া, যাতে তারা দেশেই উচ্চ প্রযুক্তির সমরাস্ত্র ও সাঁজোয়া যান তৈরির মাধ্যমে দ্রূত ও নিরাপদে তুর্কী সশস্ত্র বাহিনীর চাহিদা মেটাতে পারে। পাশাপাশি এমন কিছু সরঞ্জাম উৎপাদন করা, যা তাদের অবকাঠামো সৃষ্টি করবে।

কিরিক্কাল নগরে দ্রূতই বিস্তৃতি লাভ করেছে এমকেইকে এবং এ কারণেই নগরীর একটি কারখানায় উৎপাদিত সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ পিস্তলের নাম এ শহরের নামে হয়েছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ এবং ক্যাপিটাল পারটিসিপেশনের মাধ্যমে তুরস্কের অর্থনীতিতে এমকেইকে রেখেছে বিশাল অবদান, বিশেষ করে ১৯৬০ সালের পর। কর্পোরেশনটি এ ক্ষেত্রে দেশের অগ্রপথিক হিসেবে নিজ ভূমিকা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে একদিকে নতুন-নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নির্মাণ করেছে অনেক অস্ত্র ও সরঞ্জাম, অপরদিকে এর মাধ্যমে সাশ্রয় করেছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা।

এমকেইকে-র কারখানায় নির্মিত এ রকম একটি অস্ত্র হলো একটি ইনফ্যান্ট্রি সার্ভিস রাইফেল, যাকে ডাকা হয় এমপিটি-৭৬ নামে। এটিই তাদের প্রথম প্রকল্প, যা শতভাগ দেশীয় এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া তুর্কী ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে পরিচালিত।

এমপিটি-৭৬ হচ্ছে বিশ্বের একমাত্র অস্ত্র, যা ৫০টিরও বেশি পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে। ২০১৪ সালে এসব পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তুরস্কের এই ''জাতীয় রাইফেল''টির পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদন শুরু হয় ২০১৪ সালে। এ পর্যন্ত ফাইভ পয়েন্ট ফাইভ সিক্স এম এম ক্যালিবার রাইফেলটির ৬৫ হাজার পিস সরবরাহ দেয়া হয়েছে।

এমকেইকে-র বিভিন্ন কারখানায় আর বিভিন্ন ধরনের স্নাইপার রাইফেল নির্মিত হচ্ছে। এমকেইকে বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যারা এক ছাদের তলায় সব ক্যালিবারের অস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরি করছে। তাদের নির্মিত বিভিন্ন ক্যালিবারের অস্ত্রশস্ত্র, যেমন হাউইতজার, ট্যাঙ্ক, মর্টার ও আর্টিলারি রকেট প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে দেশটির সামরিক বাহিনীর। এছাড়া জি-৩, এমজি-৩এর মতো বিভিন্ন ধরনের ইনফ্যান্ট্রি ও মেশিনগান তৈরির সক্ষমতাও রয়েছে এমকেইকে-র।

কিরাক্কেল নগরীতে এমকেইকে ছাড়াও কয়েক বছর আগে, ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে অ্যামুনিশন রিক্লেমেশন, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওভারহৌল সেন্টার। এর অধীনে সাতটা কম্পানি বিশেষায়িত অস্ত্র ও সরঞ্জাম তৈরি করবে। তাদেরকে শিল্পাঞ্চলে জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, শুধু সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণ নয়, কর্মসংস্থানেও এসব কারখানা অবদান রাখবে।

এসব কারখানায় উৎপাদিত হবে সব রকম অস্ত্রপাতি, অ্যান্টি-এয়ারক্র্যাফট গান, সব রকম ডায়ামিটার ও মডেলের গান, লং অ্যান্ড শর্ট ব্যারেল গান, প্রতিরক্ষা খাতের জন্য উচ্চ প্রযুক্তির ডিজিটাল পণ্য, বাইনোকুলার, নাইট ভিশন ক্যামেরা সিস্টেম এবং প্রতিরক্ষা খাতের জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারসহ সব সরঞ্জাম।

এ-ই হলো তুরস্কের সমরশিল্পের হাল হকিকত। এবার দেখা যাক দেশটি সামরিক ব্যয়বহর কেমন। গত এক দশকে তুরস্কের সামরিক খাতের ব্যয় ৮৬ শতাংশ বেড়ে ২০১৯ সাল নাগাদ প্রায় আড়াই হাজার কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

দ্য স্টকহোম পীস রিসার্চ ইন্সটিটিউট বা সিপ্রি-র জরিপে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। জরিপের ফলাফলে বলা হয়, ২০১৮ সালে তুরস্কের সামরিক ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০১৯ সালে এ বৃদ্ধির হার অবশ্য ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। একই বছর তুরস্কসহ ন্যাটো জোটের ২৯টি সদস্য দেশের মোট সামরিক ব্যয় ছিল এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এবার দেখি, বিশ্বের অন্যান্য দেশ কেমন ব্যয় করছে সামরিক খাতে। সিপ্রি-র জরিপের ফলাফলে বলা হয়, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, ডলারের হিসেবে যা দাঁড়ায় এক দশমিক নয় ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল দুই দশমিক দুই শতাংশ, ডলারের হিসাবে যার মাথাপিছু পরিমাণ ২৪৯ ডলারের মতো।

২০১৯ সালে সামরিক খাতে সবচাইতে বেশি ব্যয়কারী দেশ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সে-বছর তারা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়ে মোট ব্যয় করে ৭৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সিপ্রি-র একজন গবেষক বলেন, বড়-বড় দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাই এ ব্যয় বৃদ্ধির কারণ।

২০১৯ সালে সামরিক খাতে বেশি ব্যয়কারী দ্বিতীয় ও তৃতীয় দেশ হচ্ছে যথাক্রমে চীন ও ভারত। সে-বছর চীন এ খাতে ব্যয় করে ২৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক এক শতাংশ বেশি। একই বছর ভারত তার ব্যয় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়িয়ে ব্যয় করে ৭১ দশমিক এক বিলিয়ন ডলার।
সিপ্রির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২৫ বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে চীন ক্রমাগত তাদের সামরিক ব্যয়ও একটানা বাড়িয়েই চলেছে।

এ কাজে বিশ্বে চতুর্থ স্থানে আছে রাশিয়া। ২০১৯ সালে দেশটি ব্যয় করেছে ৬৫ দশমিক এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার, আগের বছরের তুলনায় যা ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। সিপ্রি-র একজন গবেষক বলেন, রাশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৯ শতাংশ, সেখানে এ খাতে ইউরোপে সবচাইতে বেশি ব্যয় করাটা দেশটির জন্য একটা বিরাট বোঝা।

সামরিক ব্যয়ের বেলায় রাশিয়ার ঠিক পেছনেই আছে সউদি আরব। ২০১৯ সালে এ খাতে দেশটির ব্যয় বরাদ্দ ছিল ৬১ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি এবং মধ্যপ্রচ্যে সর্বোচ্চ। সে-বছর সামরিক খাতে দেশটির ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ জিডিপি-র ৮ শতাংশ।
সিপ্রির প্রতিবেদনে বলা হয়, সউদি আরব জড়িয়ে গেছে ইয়েমেন যুদ্ধে আর ইরানের সাথে চলছে উত্তেজনা। এমন অবস্থায় তারা সামরিক খাতে ব্যয় কমাবে, এমনটা আশাই করা যায় না। সামরিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইউরোপে শীর্ষে আছে জার্মানি। ২০১৯ সালে দেশটি এ খাতে ব্যয় করেছে ৪৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, আগের বছরের তুলনায় যা ১০ শতাংশ বেশি। সিপ্রি-র একজন গবেষক বলেন, রাশিয়া এবং ন্যাটো-র কয়েকটি সদস্য দেশের দিক থেকে আসা ক্রমবর্ধমান হুমকিই জার্মানির সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির জন্য অংশত দায়ী।

প্রতিবেদনটির ভিডিও দেখুন

বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখাগুলোর স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে।