শেখ মুজিবুর রহমান : আমার দেখা নয়া চীন

আমার দেখা নয়া চীন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা - সংগৃহীত


২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘আমার দেখা নয়া চীন’ নামে একটা বই। ক’দিন আগে বইটা পড়লাম। এর আগে পড়েছি শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটা। বইটা পড়ে আমার খুব ভাল লেগেছিল। মনে হয়েছিল, বইটিকে গণ্য করতে হবে পাকিস্তান আন্দোলনের একটা মূল্যবান দলিল হিসাবে। বাংলাভাষী মুসলমান পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেছিলো বলেই হতে পেরেছিল সাবেক পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯১৯ সালে যে ইন্ডিয়া অ্যাক্ট হয়, তার ভিত্তিতে বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের (Legislative Council) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে দ্বিতীয়বার মন্ত্রিসভায় আবুল কাসেম ফজলুল হক হন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি শিক্ষামন্ত্রী হয়ে কলকাতায় স্থাপন করেন ইসলামিয়া কলেজ। এই ইসলামিয়া কলেজ হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র।

শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র। তিনি একজন ছাত্রনেতা হিসাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গ্রহণ করেন বিশেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। এসব কথা আমার আমরা বিশেষভাবে অবগত হতে পারি তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ব্রিটিশ আমলের বাংলা প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী (মুখ্যমন্ত্রী কথাটা তখনও চালু হয়নি) থাকাকালীন সময় ১৯৪০ সালে আবুল কাশেম ফজলুল হক মুসলিম লীগের অধিবেশনে লাহোরে উত্থাপন করেন, যাকে এখন বলা হয়, পাকিস্তান প্রস্তাব। পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপিত হয় দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বলেছেন, দ্বি-জাতিতত্ত্ব ছিল সঠিক। এর ভিত্তি ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদ। মুসলিম ধর্ম বিশ্বাস নয়। এই জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হতে পেরেছিল ব্রিটিশ শাসনামলে, ব্রিটিশ ভারতের বিশেষ রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে। এটাকে কোনো ধর্মবিশ্বাস ভিত্তিক রাজনীতি বলে মনে করা মোটেও সঙ্গত নয়। এর উদ্ভব হতে পেরেছিল পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিমদের মধ্যে। দেওবন্দী মাওলানাদের মধ্যে নয়। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বিখ্যাত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বলেছেন, চীনের নয়া গণতন্ত্র কোন গণতন্ত্র নয়। আসলে তা হলো একদলীয় শাসন। চীনে কমিউনিস্ট দলই নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে সে দেশের সবকিছু। তিনি (শেখ মুজিব) সমাজতন্ত্রী। কিন্তু তা বলে তিনি কম্যুনিস্ট নন। অর্থাৎ মতবাদের দিক থেকে তিনি ছিলেন, যাকে বলে সামাজিক গণতন্ত্রী।


শেখ মুজিবুর রহমান দুইবার চীনে যান। প্রথমবার যান ১৯৫২ সালে। আর দ্বিতীয়বার যান ১৯৫৭ সালে। তিনি প্রথমবার চীনে যান আওয়ামী লীগের একজন নেতা হিসেবে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে যোগ দিতে যান তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টি আহূত শান্তি সম্মেলনে। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর লেখা ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইতে বলেছেন, অন্য কোন দেশ থেকে যদি শান্তি সম্মেলনের ডাক আসত, তা হলেও তিনি সাড়া দিতেন। কারণ তিনি শান্তিকামী। আর যুদ্ধবিরোধী। তিনি লিখেছেন, চীনের শান্তি সম্মেলনে তিনি কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের দাবি উত্থাপন করেন। বলেন, কাশ্মীর নিয়ে আবার যুদ্ধ আরম্ভ হলে তা নিতে পারে একটা বিশ্বযুদ্ধের রূপ। তাই এই সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান হওয়া দরকার। তিনি কখনোই ভাবেননি কাশ্মীর হলো কেবল ভারতের ঘরোয়া সমস্যা। যেমন এখন ভাবতে চাচ্ছেন আওয়ামী লীগের একাংশ। অবশ্য আমরা এখন জানি, কাশ্মীর নিয়ে ১৯৬৫ সালে হয়েছিল পাক-ভারত যুদ্ধ। কিন্তু এ যুদ্ধ পরিগ্রহ করেনি কোন বিশ্বযুদ্ধের রূপ। কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়ন গ্রহণ করে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি স্থাপনের উদ্যোগ। ১৯৬৬ সালে এর ফলে হতে পারে তাসখন্দ চুক্তি। কিন্তু এর আগে ১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্ত সংঘাত হয়। চীন কাশ্মীরের লাদাখ জেলার ১২,০০০ বর্গমাইল এলাকা দখল করে নেয়। যা তার এখনও আছে দখলেই। এখন কাশ্মীরে কোন যুদ্ধ বাধলে তা গ্রহণ করতে পারে বিশ্বযুদ্ধের রূপ। কারণ চীন এতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৭ সালে চীনে যান সরকারি সফরে, পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হয়ে। ১৯৫৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান এর প্রধানমন্ত্রী হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকেন ১৯৫৭ সালের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত। এইসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেনারেল আইজেন হাওয়ার। এই সময়টায় ঠান্ডা লড়াই (cold war) উঠেছিল প্রবল। বিশ্ব রাজনীতির এই পরিস্থিতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারী সফরে। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয়েছিল পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি। পাকিস্তান পেশোয়ারের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি গড়তে দেয়। প্রতিদানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তদানিন্তন পাকিস্তান এর ৪০ হাজার সৈন্যের ব্যয়ভার বহন করতে এবং তাকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করতে ও সমর কৌশলে প্রশিক্ষিতি করতে রাজি হয়। সোহরাওয়ার্দী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান পাকিস্তান এর নিরাপত্তা বিষয়ে আরও সাহায্য লাভের লক্ষ্যে। সেখানে এ সম্পর্কে তাঁর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে এক প্রকাশিত যুক্ত ইশতেহারে বলা হয়: স্বাধীন বিশ্বের জন্য আন্তর্জাতিক কমিউনিজম এক বিরাট হুমকি হিসাবে বিরাজ করছে। স্বাধীন বিশ্বকে এর বিপক্ষে থাকতে হবে ঐক্যবদ্ধ।

শেখ মুজিবুর রহমান এক্ষেত্রে সোহরাওয়ার্দীকে পুরাপুরি সমর্থন করেন। সোহরাওয়ার্দীকে পুরাপুরি সমর্থন করেন আওয়ামী লীগের অধিকাংশ সদস্য। ভাসানী ছিলেন মার্কিন বিরোধী। তিনি বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন আওয়ামী লীগ থেকে। তিনি গড়েন নতুন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। ১৯৫৭ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে চীনে পাঠানো হয়, চীন সরকারকে একথা বোঝাতে যে পাকিস্তান চীন বিরোধী নয়। সে চায় চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে। সে আন্তর্জাতিক কমিউনিজম বলতে মূলত বুঝিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নকে। চীনের কমিউনিস্টদের নয়। শেখ মুজিবুর রহমান, মনে হয় পাকিস্তান সরকারের এই মনোভাবকে চীন সরকারের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন। ভারত তাসখন্দ চুক্তি মেনে চলেনি। ১৯৭১ সালে সে চায় পাকিস্তানকে বিলুপ্ত করতে। চীনের এসময়ের প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন-লাই ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল ঘোষণা করেন “বহিরাক্রমণ থেকে পাকিস্তান এর অখন্ডতা রক্ষার জন্য গণচীন প্রতিশ্রুত।” ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে যাবার নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে চীন লাদাখ সীমান্তে ঘটায় বাড়তি সৈন্য সমাবেশ। যার ফলে ভারত রাজি হয় বাংলাদেশ থেকে তার সৈন্য সরিয়ে নিতে। আমরা জানি, এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কাশ্মীর সমস্যা আগের চাইতে অনেক জটিল করে তুলেছেন। আজ কাশ্মীর নিয়ে কোন যুদ্ধ বাধলে তা নিতে পারে একটা বিশ্বযুদ্ধের রূপ। ১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যেমন আশঙ্কা করেছিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইতে বলেছেন, “কাশ্মীর প্রস্তাব আমরা উত্থাপন করতে চাইলাম, কারণ ভারত জোর করে কাশ্মীর দখল করে রেখেছে। কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ হলে বিশ্বযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। গণভোট হলে কাশ্মীরের জনগণ নিশ্চয় পাকিস্তানে যোগদান করবে। ভারতীয় ডেলিগেটদের মধ্যে একদল কাশ্মীর সম্বন্ধে আলোচনা করতে প্রথমে রাজি হলো না, তার পর অন্যান্য দেশের চাপে পড়ে রাজি হলো। ড. সাইফুদ্দীন কিচলু, যিনি ভারতবর্ষের ডেলিগেটদের নেতা, তিনিও চেষ্টা করলেন। আমরা দু’দেশের ডেলিগেটরা এক জায়গায় হয়ে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে একটা প্রস্তাব নিলাম। তার সারাংশ, কাশ্মীরে গণভোট দ্বারা স্থির হবে তারা কোন দেশে যোগদান করবে।” (দ্রষ্টব্য, পৃ. ৪০) এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, পাকিস্তান নয়, ভারত সরকারই পাকিস্তান সমস্যাকে নিয়ে যায় জাতিসংঘে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পারিষদ বলে, কাশ্মীর ভারতে না পাকিস্তানে যোগ দেবে, সেটা ঠিক হতে হবে কাশ্মীরে গণ অভিমত গ্রহণ করে। যা অনুষ্ঠিত হতে হবে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে। চীনের শান্তি কমিটি প্রস্তাব পাশ করতে খুবই সাহায্য করেছিল। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council) ভারতকে পাঁচবার গণ অভিমত গ্রহণের কথা বলেছে। কিন্তু ভারত এতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে ভারত ভেবেছিল সে গায়ের জোরে লাদাখ থেকে চীনকে সরিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু ১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীনের কাছে সে পরাজিত হয় অতি করুণভাবে। লাদাখ এর যে অংশ চীন দখল করে নিয়েছে, সেখানকার অধিবাসীরা দেখতে তিব্বতীদের মতো। তারা তিব্বতী ভাষায় কথা বলে। তারা তিব্বতীদের মতই অনুসরণ করে লামা-বৌদ্ধ ধর্ম। এরা হিন্দু নন।

শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর লেখা ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইটির উপসংহারে বলেছেন, “নয়া চীনের উন্নতি দেখে সত্যিই আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। কিন্তু নয়া চীন সরকার কম্যুনিস্ট মতবাদ ছাড়া অন্য কোন মতবাদের লোককে রাজনীতি করতে দেয় না। একমাত্র নয়া চীন নেতা মাও সে তুং এর ‘নয়া গণতন্ত্র’র নীতি যারা বিশ্বাস করেন, তাদেরই রাজনীতি করার অধিকার আছে। অন্য কোন নতুন আদর্শের দল সৃষ্টি করবার অধিকার কারও নাই। যদিও নয়া চীন সরকারের বড় পদগুলিতে কম্যুনিস্ট ছাড়া দু’চারজন নন কম্যুনিস্ট আছেন, তবে ধরে নিতে হবে তারা কম্যুনিস্ট ভাবাপন্ন এবং কম্যুনিস্টরা যা বলে তাই বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়। ... ... ... আমার মতে, ভাত-কাপড় পাবার ও তা আদায় করে নেবার অধিকার মানুষের থাকবে, সাথে সাথে নিজের মতবাদ প্রচার করার অধিকার মানুষের থাকা চাই। তা না হলে মানুষের জীবন বোধহয় পাথরের মতো শুষ্ক হয়ে যায়।” (দ্রষ্টব্য, পৃ. ১৮ থেকে ১৯) ভাবতে অবাক লাগে, এমন মত সম্পন্ন মানুষ হয়ে ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব বাংলাদেশে কম্যুনিস্টদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গড়তে পেরেছিলেন বাকশাল। আর তাঁর তনয়ার পক্ষে এখনো ভাবা সম্ভব হতে পারছে যে তিনি ছাড়া আর কেউ দেশের মানুষের কল্যাণ করতে পারে না অথবা রাখে না যোগ্যতা!