আইসেজের রায় : কতটা চাপে পড়বে মিয়ানমার

দ্য হেগের আদালতে সূ চি - সংগৃহীত


মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্টীর ওপর জাতিগত নির্মুল অভিযান চালানোর অভিযোগে আর্ন্তজাতিক আদালতে মামলা করেছিলো গাম্বিয়া। এই মামলার অন্তবর্তীকালীন আদেশ দেয়া হয়েছে। মিয়ানমার এই আদেশের ব্যাপারে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটে এই রায় কি ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে আজ আমরা আলোচনা করবো। রাখাইনে এখন যে রোহিঙ্গারা আছেন, তাদেরকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য মিয়ানমারকে সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দিয়েছে নেদারল্যাডন্সের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত। অন্তবর্তীকালীন রায়ে মিয়ানমারের প্রতি চারটি নির্দেশনা দেয় আইসিজে। এগুলো হচ্ছে


১. রাখাইনে বসবাসরত সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের সুরক্ষা দেবার জন্য মিয়ানমার সরকারকে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।
২. মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর লাগাম টেনে ধরতে হবে। আদালত বলেছে, সেনাবাহিনী কিংবা অন্য যে কোন ধরণের নিরাপত্তা বাহিনী যাতে গণহত্যা না চালায় কিংবা উস্কানি না দেয় সেজন্য সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
৩. রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ এসেছে, সে সংক্রান্ত তথ্য- প্রমান সংরক্ষণ করতে হবে
৪. রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেবার জন্য মিয়ানমার কী ধরণের ব্যবস্থা নিয়েছে সে সংক্রান্ত প্রতিবেদন আগামী চার মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের কাছে জমা দিতে হবে। এরপর প্রতি ছয় মাসে একটি করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এসব প্রতিবেদন গাম্বিয়ার কাছে তুলে ধরা হবে।


আর্ন্তজাতিক আদালতে এই রায় প্রকাশের পর মিয়ানমার তা প্রত্যাখান করে। অপরদিকে রায় ঘোষণার দিন লন্ডনের দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকায় মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অংসান সূচির একটি লেখা প্রকাশ হয়। যেখানে আর্ন্তজাতিক আদালতের বিচার নিয়ে দেশটির মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। আসুন জেনে নেই মিয়ানমার বিষয়টিকে কিভাবে দেখছে।


মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রায় প্রকাশের পর বলছে, এ আদেশ পরিস্থিতির বিকৃত চিত্র উপস্থাপন করেছে। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে মিয়ানমার সরকার যে ইনডিপেনডেন্ট কমিশন অব ইনকোয়ারি গঠন করেছে তারা রাখাইনে গণহত্যার কোনো আলামত খুঁজে পায়নি। তবে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে স্বীকার করেছে মিয়ানমারের সরকার ঘনিষ্ঠ এ তথাকথিত ‘স্বাধীন কমিশন’।


মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর ও নোবেল জয়ী নেত্রী অং সান সু চির মতে সংঘাত কবলিত রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধাপরাধের ঘটনায় ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য মিয়ানমারের আরও সময় প্রয়োজন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে লেখা এক নিবন্ধে এই দাবি করেছেন তিনি। ফিনান্সিয়াল টাইমসে সু চি লিখেছেন, মিয়ানমারের বিচার ব্যবস্থাকে নিজস্ব গতিতে পরিচালিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দিলেই কেবল রাখাইনের অপরাধের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তিনি মিয়ানমারের বিচার ব্যবস্থাকে শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে সেনা অভিযানে সরকারি সেনাদের যুদ্ধাপরাধের বিচার মিয়ানমারের সামরিক বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে করা হবে।


তবে শান্তিতে নোবেল জয়ী সু চি স্বীকার করেছেন, বিশ্বের যে কোনও সেনাবাহিনীর মতো মিয়ানমার সেনাবাহিনীও ‘নিজেদের সেনা সদস্যদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করায় তাদের আগ্রহ’ পাওয়া কঠিন।মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ অভিযোগ বাংলাদেশে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বলে অভিযোগ করেন সু চি। যা সরকারের গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিশনের মতে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। মিয়ানমার সরকারের এই কমিশন তাদের প্রতিবেদনে রাখাইনে ২০১৭ সালের সেনা অভিযানে যুদ্ধাপরাধের প্রমান পাওয়া গেছে। তবে সেখানে গণহত্যার উদ্দেশ্যের কোনও আলামত নেই।


আর্ন্তজাতিক আদালতে এই রায় রোহিঙ্গা জনগোষ্টীকে কতটা সুরক্ষা দেবে? কিংবা যারা বাংলাদেশে এসেছে তাদের ফিরে যাওয়ার পথ কী তৈরি করবে? কতটা চাপে পড়তে পারে মিয়ানমার? এসব প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ন। আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতের এই আদেশ মানতে মিয়ানমার বাধ্য। তবে আদালত এজন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারবে না। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই রায় উপেক্ষা করা মিয়ানমারের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। এর আগে রোহিঙ্গা মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর যথেচ্ছ গ্রেপ্তার, নির্যাতন, ধর্ষণ, হেফাজতে মৃত্যুসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি নিন্দা প্রস্তাব গ্রহন করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ।
রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উত্তেজনা প্রশমনে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহবান জানানো হয় প্রস্তাবটিতে । মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনা নিন্দা প্রস্তাবে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় ১৩৪টি দেশ আর বিপক্ষে ভোট পড়ে ৯টি । ভোটদানে বিরত ছিল ২৮টি দেশ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাশ হওয়া কোন প্রস্তাব দেশটি মানতে বাধ্য না হলেও, বিশ্ব মতামতের ক্ষেত্রে এ ধরণের প্রস্তাব প্রভাব ফেলে থাকে।


আর্ন্তজাতিক অপরাধ আদালত ও জাতিসংঘে প্রস্তাব পাসের কারনে মিয়ানমারের ওপর আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের যে কোনো ধরনের শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কয়েকটি দেশ মিয়ানমারের কয়েকজন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এই রায়ের মধ্যদিয়ে মিয়ানমারের নৈতিক ভিত্তি অনেক দূর্বল হয়ে পড়েছে। আর্ন্তজাতিক অপরাধ আদালতে গনহত্যার অভিযোগ প্রমানিত হলে দেশটির সেনা কর্মকর্তা এমনকি বেসামরিক নেতৃতত্বকে বিচারের মুখোমুখি দাড় করানো সম্ভব হবে।


আর্ন্তজাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের সময় শুনানিতে মিয়ানমারের নোবলে জয়ী নেত্রী অংসান সূচি অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি গনহত্যার বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। শুনানির সময় মিসেস সু চি আইসিজের এই মামলাকে "অসম্পূর্ণ ও ভুল" হিসাবে আখ্যা দিয়ে মামলাটি বাতিল করে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু আর্ন্তজাতিক অপরাধ আদালতে গনহত্যার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।


আর্ন্তজাতিক অপরাধ আদালতের রায়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর হত্যা রোধ করা, তাদের যেন গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি না হয়। এবং ইতোমধ্যে সংগঠিত সম্ভাব্য গণহত্যার প্রমাণ সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কিংবা অন্য যেকোন নিরাপত্তা বাহিনী যেন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কোন গণহত্যায় না জড়ায়, উষ্কানি না দেয়, কিংবা নির্যাতনের মুসলমানদের চেষ্টা না করে সেজন্য ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমারকে নির্দেশ দেয়া হয়।


আর্ন্তজাতিক আদালতের অর্ন্তবতী আদেশের পর গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবু বকর মারি তামবাদু বলেছেন, এই আদেশ রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ নিপীড়ন ও বঞ্চণার অবসানের পথে একটি ছোট পদক্ষেপ। আমরা জানি এই আদেশ একদিনে রোহিঙ্গাদের জীবন বদলে দেবে না। তবে একটি প্রক্রিয়ার সূচনা। যার মাধ্যমে আমরা আশা করছি একদিন তারা নিরাপদে মর্যাদার সাথে রাখাইনে ফিরে যেতে পারবেন।


মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ প্রশ্নে তাম্বাদু বিবিসিকে বলছেন, '''রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী এবং বেসামরিক বাসিন্দারা সংগঠিত হামলা চালাচ্ছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে, মায়ের কোল থেকে শিশুদের ছিনিয়ে নিয়ে জ্বলন্ত আগুনে ছুঁড়ে মারছে, পুরুষদের ধরে ধরে মেরে ফেলছে, মেয়েদের ধর্ষণ করছে এবং সবরকমের যৌন নির্যাতন করছে।'' একে ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডা গণহত্যার সঙ্গে তুলনা দিয়ে তিনি বলেন, রুয়ান্ডায় টুটসিদের ওপর যেরকম অপরাধ করা হয়েছিল, এটা সেরকমই মনে হচ্ছিল। এখানে সেই একই রকম গণহত্যার সব বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে চিরতরে ধ্বংস করার জন্য এটা মিয়ানমারের সরকারের একটা চেষ্টা।''


মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলা করার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্যাতন হচ্ছে, সে ব্যাপারে বিশ্বব্যাপীকে কিছু করার জন্য তাগিদ দেয়াা। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মিয়ানমার কাউকে ফেরত নেয়নি। এই রায় আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।