মধ্যএশিয়ায় বাড়ছে তুরস্কের প্রভাব

তুরস্ক-আজারবাইজান সামরিক মহড়া - সংগৃহীত

গত বেশ কয়েকটি বছর ধরে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি আবর্তিত হচ্ছিল সিরিয়ার যুদ্ধ, রাশিয়ার সাথে টানাপোড়েন এবং পাশ্চাত্যের সাথে ক্রমবর্ধমান বিভেদকে কেন্দ্র করে। এরই মাঝে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে একটি নীরব অথচ প্রয়োজনীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে তুরস্ক। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এ. কে. পার্টি শাসিত তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে ইউরেশিয়া তার প্রাধান্য হারিয়ে ফেললেও একেবারে গুরুত্বহীন হয়ে যায়নি। ইউরো-আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য ওই অঞ্চলের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব রয়েছে। এসব কারণেই মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে তুরস্ক। তাদের এ আগ্রহের মূল ভিত্তি হচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনা। পাশাপাশি তারা অর্থনৈতিক গতিশীলতা এবং নিজ দেশে শান্তি বজায় রাখাকেও বিবেচনায় রেখেছে।

গত দুই দশকে তুরস্কের মধ্য এশিয়া নীতিতে উল্লেখযোগ্য বাঁকবদল দেখা গেছে। প্রথমত, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ-কে মধ্য এশিয়ায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে না। পশ্চিমারা একসময় তুরস্কের মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রকে ওই অঞ্চলের মডেল হিসেবে দেখতো। কিন্তু সেদিন এখন আর নেই। একটি সমন্বিত মধ্য এশিয়া নীতি গ্রহণে পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যর্থতা তুরস্ককে হতাশ করে এবং এ-কারণেই তারা নতুন মিত্রের সন্ধানে বের হয়।


দ্বিতীয়ত, ১৯৬০এর দশক থেকে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে যে ধরনের অস্বস্তিকর সম্পর্ক ছিল, তা এখন আর নেই। নতুন শতাব্দীতে এসে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক সহজ করে ফেলেছে তুরস্ক। দেশটি স্থির করেছে, মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার সাথেই কাজ করবে তারা। দু'দেশের সম্পর্ক জোড়া লাগানোর সূত্রপাত হয় ২০১৫ সালের নভেম্বরে সংঘটিত একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। ওই মাসে তুরস্ক একটি রাশিয়ান এসইউ-২৪ জঙ্গি জেট বিমানকে গুলী করে ভূপাতিত করলে দু'দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। এক পর্যায়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এ ঘটনার জন্যে দুঃখ প্রকাশ করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে একটি চিঠি লিখেন। কাজখস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নাজারবায়েভ ২০১৬ সালের জুন মাসে তাসখন্দে শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে চিঠিটি প্রেসিডেন্ট পুতিনের হাতে তুলে দেন। এর মধ্য দিয়ে দু'দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। 


তৃতীয়ত, নতুন অর্থনৈতিক শক্তিরূপে চীনের উত্থানকে স্বাগত জানায় তুরস্ক। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ ইউরেশিয়ায় তুরস্কের একই রকম একটি উদ্যোগকে অনুপ্রাণিত করবে বলে আশা করে তুরস্ক। তুরস্কের উদ্যোগটি হলো দ্য মিডল করিডোর। এ করিডর প্রতিষ্ঠার পেছনে তুরস্কের পরিকল্পনা হলো জর্জিয়া, আজারবাইজান ও কাস্পিয়ান সাগরকে যুক্ত করা। করিডোরটি  চীনের সিল্ক রোড ইকনমিক বেল্টের পরিপূরক হবে বলে মনে করে তুরস্ক। চীন বর্তমানে ইউরোপ থেকে যেসব পণ্য আমদানি করে তার ৯৬ শতাংশই আসে উড়োজাহাজ কিংবা সামুদ্রিক জাহাজে করে। তুরস্কের পরিকল্পিত মিডল করিডোর দিয়ে এসব পণ্য আনা হলে চীনের সময় বাঁচবে ১৫ দিন। এ লক্ষ্যে বাকু-তিবলিসি-কারস বা বিটিকে রেলওয়েকে কাসপিয়ান সাগর হয়ে কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের সাথে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে  তুরস্ক। এখানে বলে রাখা ভালো যে, কাস্পিয়ান সাগরে তুর্কমেনিস্তানের তুর্কমেনবাশি আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণ করছে তুরস্কেরই একটি কম্পানি। ওই কম্পানির সাথে তুরস্ক সরকারের সম্পর্ক খুবই ভালো।


যাহোক, ২০১৫ সালের নভেম্বরে তুরস্কের আনাতোলিয়ায় জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে চীন ও তুরস্ক সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এতে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং তুরস্কের মিডল করিডোরকে সমন্বিত করার কথা বলা হয়। অবশ্য ওই পর্যন্তই, তার পর থেকে চীন আর ওই বিষয়টি নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। 


পাশাপাশি ইউরেশিয়ার তুর্কিভাষী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার কাজও করে চলেছে তুরস্ক। গত দশকে এ কাজে অনেক দূর অগ্রসর হয় দেশটি। ২০১০ সালে তুরস্ক, আজারবাইজান, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তান - এ চার দেশকে নিয়ে গঠিত হয় টার্কিক কাউন্সিল। গত সেপ্টেম্বরে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, উজবেকিস্তান কাউন্সিলের সদস্যপদ পেতে আবেদন করেছে, আর পর্যবেক্ষক হওয়ার জন্য আবেদন জানানোর কথা ভাবছে তুর্কমেনিস্তান।


এরই মধ্যে টার্কিক কাউন্সিলের ছয়টি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষটি হয় ২০১৮ সালে; কিরগিজিস্তানের চল্পন আতা-য়। সবগুলো শীর্ষ সম্মেলনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পায়। যেমন, ব্যবসাবাণিজ্য, পরিবহন, কাস্টমস, শিক্ষা, পর্যটন প্রভৃতি। গত আগস্টে সদস্য দেশগুলো তুরস্কের ইস্তাম্বুলে টার্কিক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা করে। টার্কিক কাউন্সিল ছাড়াও উচ্চ পর্যায়ের স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেশন কাউন্সিলগুলোর মাধ্যমে কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং সম্প্রতি উজবেকিস্তানের সাথে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ রক্ষা করে তুরস্ক। এসব কাউন্সিল সরকারপ্রধান, মন্ত্রীবর্গ এবং উচ্চপদস্থ আমলাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ঘটিয়ে থাকে।


তুরস্কের এসব তৎপরতার পেছনে তাদের ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি একেবারে অস্পষ্ট নয়। দেশটির অভ্যন্তরীণ টালমাটাল পরিস্থিতির ছাপ পড়েছে তদের মধ্য এশিয়া নীতির ওপরও। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে তুরস্ক, বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে ওসব দেশ যেন গুলেনবাদীদের পরিচালিত স্কুল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয় এবং উচ্চ পর্যায়ের গুলেনবাদী নেতাদের তুরস্কের হাতে তুলে দেয়। অবশ্য এর আগেই  ১৯৯০এর দশকের শেষ দিকে উজবেকিস্তান এসব স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে আর তুর্কমেনিস্তান ২০১১ সালে করেছে জাতীয়করণ। তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামের বিস্তার ঠেকাতে এবং তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তুরস্কের হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় দেশ দু'টি এ ব্যবস্থা নেয় বলে মনে করা হয়। কাজাখস্তান ও কিরগিজিস্তানে এসব স্কুলের ভাগ্য এখনও অনিশ্চিত। এ নিয়ে এ দু' দেশের সাথে তুরস্কের মনোমালিন্য চলছে। 


মজার ব্যাপার হলো, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে তুরস্কের সম্পর্ক ক্রমেই জোরদার হতে থাকলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক কিন্তু তেমন আগায়নি। ২০১৮ সালে মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশের সাথে তুরস্কের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ছয় বিলিয়ন ডলার, যা তুরস্কের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র দেড় শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, তুরস্কের  সরকারি উন্নয়ন সহায়তা নীতিতেও গুরুত্ব হারিয়েছে মধ্য এশিয়া। টার্কিশ কো-অপারেশন অ্যান্ড কো-অরডিনেশন এজেন্সি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এ নীতির ভিত্তিতে যে, তারা তুর্কিভাষী দেশগুলোর আর্থসামাজিক উন্নয়নে সহায়তা দেবে। কিন্তু দেশটি এখন এর বিপরীতে গিয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সিরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাকে।


ওই পুরো অঞ্চলজুড়ে তুরস্কের প্রধান বিনিয়োগ মূলত নির্মাণ খাতে। গত তিন দশকে তুর্কি ঠিকাদাররা ওই অঞ্চলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। তুরস্ক 'এনার্জি হাব' হতে চায় - এ কারণেও ওই অঞ্চলটি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে তুরস্ক আশা করছে, নিকট ভবিষ্যতে বাকু-তিবলিসি-চেইহান পাইপলাইন দিয়ে আরো বেশি করে কাজাখ তেল আসবে। একইভাবে তাদের আশা, সদ্যসমাপ্ত ট্রান্স-অ্যানাতোলিয়ান ন্যাচারাল গ্যস পাইপলাইন দিয়ে সাউদারন গ্যাস করিডোরে যুক্ত হবে তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস। তবে ট্রান্স-কাস্পিয়ান পাইপলাইন স্থাপনের সম্ভাবনা কতটুকু, তা এখনো অজানা। এ পাইপলাইন দিয়ে তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস আজারবাইজানে যাওয়ার কথা ছিল। তুর্কমেনিস্তানকে চীনের ওপর নির্ভরশীল রেখে নিকট ভবিষ্যতে ওই ফ্রন্টে বিশাল পরিবর্তনের আশা করাটা অবাস্তব।


এদিকে উজবেকিস্তান সম্প্রতি তার অর্থনীতির দরজা উন্মুক্ত করেছে। এটা তুরস্কের সরকার ও বিনিয়োগকারীদের জন্য আনন্দের বিষয় হতে পারে। উজবেকিস্তান দীর্ঘ দিন যাবত তুরস্কের মধ্য এশিয়া নীতির প্রবল প্রতিবন্ধক হয়ে ছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইসলাম করিমভের নেতৃত্বে দেশটি ওই অঞ্চলে তুর্কি নেতৃত্বাধীন যে কোনো উদ্যোগ থেকে দূরে সরে থাকতো। ২০১৬ সালে শাভকাত মিরজিয়োয়েভ উজবেকিস্তানের ক্ষমতায় এলে তুরস্ক স্বাভাবিকভাবেই তাকে স্বাগত জানায়। ২০১৮ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের তাসখন্দ সফরকালে দু'দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ২৪টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উজবেকিস্তান সত্যিই টার্কিক কাউন্সিলে যোগ দিলে সংস্থাটি শক্তিশালী হবে। উজবেকিস্তানের রয়েছে তিন কোটি জনগোষ্ঠীর এক বিশাল বাজার। এটাও তুর্কি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা। তাছাড়া তুরস্কের রয়েছে একটি সক্রিয় বেসরকারি খাত। উজবেকিস্তানের অর্থনৈতিক  সংস্কার প্রক্রিয়ায় এটি একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে।


যাহোক, গত দশকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠানিকীকরণের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের জোরদার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত রচিত হয়। তুরস্কও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। স্বল্প মেয়াদে তুরস্কের আঞ্চলিক স্ট্র্যাটেজি হবে কানেক্টিভিটি বাড়ানো এবং জ্বালানি প্রকল্পগুলো ও টার্কিক কাউন্সিলকে এগিয়ে নেয়া। নিকট ভবিষ্যতে তাদের জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে উজবেকিস্তানের আর্থ-রাজনৈতিক সংস্কারের দিকে নজর রাখা, সাউদার্ণ গ্যাস করিডরে তুর্কমেনিস্তানের সম্ভাব্য যোগদান এবং এ অঞ্চলে, বিশেষ করে কাজাখস্তানে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রজেক্ট।