আল-কুরআন পরিবেশের বিষয়ে সচেতন

-

  • ড. ইউসুফ আল কারযাবি
  • ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৪৪

আল-কুরআন ও সুন্নাহ যে, পরিবেশের বিষয়টিকে কত বেশি গুরুত্ব দেয়, তা যথার্থ গবেষকদের মনোযোগ বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কুরআন শরীফে বলা হয়েছে, ‘তারা কি দেখে না উট কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে।’ (৮৮:১৭)
এখানে কুরআন অন্যান্য প্রাণীর উল্লেখ না করে উটের কথা বলেছে। এর কারণ হলো এই অসাধারণ প্রাণীটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং এর গঠন কাঠামো, গুণাগুণ, বৈশিষ্ট্য ও উপকারিতা সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণার জন্য মানুষকে আহ্বান জানানো। আল-কুরআন বেদুইনদেরকে সরাসরি সম্বোধন করেছে। আর তারা যত গৃহপালিত পশু মাঠে চড়িয়ে বেড়ায়, সেগুলোর মধ্যে উট হচ্ছে তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। এ জন্যই এখানে উটের কথা এসেছে।
অন্যান্য এলাকায় থাকতে পারে, এমন সব পশুর কথা না বলে কুরআন বারবার বলেছে (আরবের) তৃণভোজী বিভিন্ন পশুর (যেমন- উট, ভেড়া, গরু, ছাগল প্রভৃতি) কথা। এর কারণ হচ্ছে, যাদেরকে কুরআনে সম্বোধন করা হচ্ছে, তাদের চারপাশে যেসব পশু রয়েছে সেগুলোর দিকে ওই লোকদের মনোযোগ আকর্ষণ করা। আর এটা করা হচ্ছে যাতে তারা এসব পশুর সদ্ব্যবহার করতে পারে, আল্লাহতায়ালার দান করা বস্তুর জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে এবং পশুগুলোর গোশত খায় ও দুধ পান করে।
‘বিশুদ্ধ দুগ্ধ পানকারীদের জন্য সুস্বাদু’ (১৬:৬৬)।
যখন গবাদিপশুকে সকালে মাঠে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সন্ধ্যায় আনা হয় ফিরিয়ে, তখনকার দৃশ্যও উপভোগ্য।
‘আর যাতে আছে তোমাদের জন্য সৌন্দর্য, যখন তোমরা সেগুলোকে সাঁঝের বেলায় ঘরে ফিরিয়ে আনো এবং সকালে যখন তোমরা সেগুলোকে নিয়ে যাও গোচারণ ভূমিতে (১৬:৬)।
একই কথা আল-কুরআনে বলা হয়েছে মৌমাছি সম্পর্কে। ‘আল নাহল’ (মৌমাছি) শীর্ষক সূরায় এর বাসা ও বিভিন্ন প্রকার এবং পুষ্টি ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই পতঙ্গের গুরুত্বের উল্লেখ রয়েছে।
একইভাবে, আল-কুরআন বলেছে খেজুর, আঙুর, বিভিন্ন খাদ্যশস্য, জলপাই ও ডালিম সম্পর্কে।
এখানে কুরআন জোর দিয়েছে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে : (১) সৌন্দর্য উপভোগ : যখন সেগুলোতে ফল ধরে, সেদিকে লক্ষ কর এবং তাকাও পাকা ফলের প্রতি (৬:৯৯); (২) এসব ফলের মধ্যে যে বস্তু আছে, তার যথাযথ ব্যবহার। তবে আল্লাহর নির্দেশমাফিক প্রাপ্য যাকাত আদায় করতে হবে।
‘তাদের যখন ফল ধরে, সে ফল খাও। তবে ফল আহরণের দিন তা থেকে দেনা (আল্লাহ নির্দেশিত যাকাত) পরিশোধ করে দাও। অপচয়ী হয়ো না’ (৬:১৪১)।
আল-কুরআনে বারবার বলা হয়েছে : মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ পৃথিবীকে একের পর এক মানব প্রজন্মের জন্য উপযোগী ও সুসজ্জিত করে সৃষ্টি করেছেন। তাই এখানে অপচয় করা নিষিদ্ধ। কুরআন ঘোষণা করেছে, আল্লাহতায়ালা অপচয় করা পছন্দ করেন না। কিংবা অপচয়কারীরাও নয় তার পছন্দনীয়। এই অপচয়ের মধ্যে প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করা, এর দূষণ এবং পরিবেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে প্রকৃতিকে সৃষ্টি করেছেন, তা থেকে বিচ্যুতি ঘটার মতো পরিবেশের অপব্যবহার কোনোমতেই করা যাবে না। তা করার অর্থ আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এতে তাঁর ক্রোধের কারণ ঘটতে পারে। এটা সংশ্লিষ্ট দোষী ব্যক্তিদের জন্য একটি হুঁশিয়ারি। অতীতে আদ ও সামুদ জাতি এবং তাদের পরবর্তীকালের লোকজনের ওপর যেভাবে কঠোর শাস্তি নেমে এসেছিল, সেভাবে আবারো নেমে আসতে পারে।
‘যারা জমিনে সীমা লঙ্ঘন করেছিল (আল্লাহর অবাধ্যতার ক্ষেত্রে) এবং অনেক অপরাধ করেছে। অতএব, তোমার প্রভু তাদের ওপর আপতিত করলেন নানা ধরনের মারাত্মক দুর্ভোগ। নিশ্চয়ই, তোমার প্রভু সর্বদাই নজরদারি করছেন’। (৮৯:১১-১৪) এটা সাবা জনগোষ্ঠীর ওপর নিপতিত শাস্তির মতো। আল্লাহ তাদেরকে সম্পদ-সমৃদ্ধি দিয়েছিলেন। তারা এর প্রশংসা করেনি। আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছিলেন উর্বর ভূমি, বিশুদ্ধ তাজা পানি, সুগন্ধি ফুলের বাগান। ওরা আগ্রহ দেখায়নি, ভূমিকে করেছে অবহেলা, আর তাদের সমৃদ্ধির উৎসকে করেছে বিনষ্ট।
মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালা বলছেন, ‘প্রকৃতপক্ষে সাবা জনগোষ্ঠীর জন্য নিদর্শন ছিল তাদের বসতি স্থানে। দু’টি বাগান ডানে ও বামে (এবং তাদেরকে বলা হয়েছিল) : তোমাদের প্রভু যা দিয়েছেন, তা থেকে খাও আর তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হও, একটি সুন্দর ভূমি এবং একজন সদা ক্ষমাশীল উপাস্য। কিন্তু ওরা আল্লাহর আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। তাই আমরা তাদের বিরুদ্ধে পাঠালাম সাইল আল-আরিম (বাঁধভাঙা বন্যা) এবং ওই দু’টি বাগানকে পর্যবসিত করলাম এমন উদ্যানে, যেখানে উৎপন্ন হতো বিস্বাদ ফল ও ঝাউগাছ আর অল্প ক’টি ফুল গাছ। তাদের জন্য এটাই প্রযোজ্য; কারণ তারা ছিল অকৃতজ্ঞ, অবিশ্বাসী এবং যারা কৃতজ্ঞ নয় ও বিশ্বাস করে না তাদের ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে আমরা এমন আচরণের প্রয়োজন বোধ করি না।’ (৩৪:১৫-১৭)

ভাষান্তর : মীযানুল করীম


  • ড. ইউসুফ আল কারযাবি
  • ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৪৪