সুখী বিবাহের মৌলিক বিষয়

-

  • শাহিনা সিদ্দিকী
  • ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:০৬

বিবাহ মানবজীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানবসভ্যতার প্রাণকেন্দ্র যে পরিবার, তার ভিত্তি হচ্ছে বিয়ে বা বিবাহ। মানবজাতির ধারাবাহিক অস্তিত্ব এই বিবাহ প্রথার ওপর নির্ভরশীল। তবে বাস্তবতা হলো, অনেকেই বিয়ের ক্ষেত্রে সুখী হতে পারেন না। তাঁদের সমস্যাকীর্ণ দাম্পত্য সম্পর্ক পুরো জীবনকেই ব্যর্থ করে দেয়। বৈবাহিক ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে। এ শর্তগুলোর প্রতিটিই সম্পর্কের ক্ষেত্রেই অবশ্যই করণীয়।
ক্ষমাশীল হওয়া : যখন হজরত মুহাম্মদ সা: তাঁর সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিন, এটা কি তোমরা কামনা করো?’ তারা বললেন, হে আল্লাহর নবী সা:, অবশ্যই। তিনি বললেন, তাহলে একে অপরকে ক্ষমা করে দাও।
সুখী বিয়ের একটি মূল বিষয় হলো, ‘স্বামী-স্ত্রী একে অন্যকে ক্ষমা করে দিতে সক্ষম। আর তাদের একের অপরের প্রতি ক্ষোভ নেই। একে অন্যকে পাওয়া দুর্ভাগ্য বলে মনে করেন না।’ এটা প্রত্যাশিত যে, আমরা যখন কারো সাথে বাস করি, এমন পরিস্থিতি হতে পারে যাতে আমাদের কথা বা কাজে আমাদের স্বামী বা স্ত্রীর মনে আঘাত লাগে। এ মনোভাব বজায় রাখা কিংবা অভিযোগ আনা চ্যালেঞ্জ নয়। চ্যালেঞ্জ হলো, এসব পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া। যদি আমরা বেশি অহঙ্কারী না হই, তাহলেই ক্ষমা চাইতে পারি। আমরা ইচ্ছা করলেই ক্ষমা করতে পারি। কেবল তা হলেই আমরা এসব অতিক্রম করতে পারব। যদি আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা আশা করি, তাহলে অবশ্যই আমরা অন্যকে ক্ষমা করে দিতে শিখব।
ভুলে যেতে ইচ্ছুক হওয়া : সারাক্ষণ যদি আমরা আমাদের স্বামী বা স্ত্রীকে মনে করিয়ে দিই যে, সে আমাকে হতাশ করেছে বা আঘাত দিয়েছে, তার অর্থ হচ্ছে, আমরা আসলে ক্ষমা করিনি। অতীতে যা ঘটেছে, তাকে অবশ্যই সেখানে ফেলে আসতে হবে এবং সেটাকে নতুন নতুন পরিস্থিতিতে ‘তাজা হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা কিছুতেই উচিত হবে না। যেসব দম্পতি এই ‘কৌশল’ অবলম্বন করে, তারা নিজেদের ক্ষুদ্রতার শিকার হয় এবং এর থেকে মুক্ত হওয়ার সামর্থ্য তাদের থাকে না।
নমনীয় হওয়া : অনেক দম্পতিই অহেতুক নিজেদের দুরবস্থায় ফেলেন। কারণ, তারা সামান্যও নমনীয় হতে রাজি নন। আমাদের স্বামী বা স্ত্রী আমাদের ‘সম্প্রসারিত অংশ’ হবে, এমন আশা করা ঠিক হবে না। কারণ, তাদের নিজস্ব সত্তা আছে। আরো আছে নিজেদের ব্যক্তিত্ব, পছন্দ-অপছন্দ। যে পর্যন্ত না ইসলামি জীবনব্যবস্থার লঙ্ঘন ঘটে, সে পর্যন্ত আমরা অবশ্যই তাদের এই স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার অধিকারকে মর্যাদা দেবো। অনমনীয় হওয়া এবং ব্যক্তিগত পার্থক্যের সাথে খাপ খাইয়ে না চলার দরুন পরিবারের মধ্যে খুবই উত্তেজনাকর ও চাপপূর্ণ পরিবেশ জন্ম নেয়।
বিশ্বস্ত হওয়া : আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন আমাদের স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত হতে। ইসলামে ব্যভিচার একটি অপরাধ, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। যা হোক, কিছু মুসলমানের মধ্যে নানা ধরনের অবিশ্বস্ত আচরণ লক্ষ করা যায়। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যেটা পরিলক্ষিত হয়, তা হলো ইসলামের সীমার বাইরে গিয়ে বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করা। ইন্টারনেটের মাধ্যমে সম্পর্কের সর্বশেষ প্রবণতা ইসলামি আদব-কায়দার পরিপন্থী এবং এটা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করছে। একবার যদি এ দু’জনের কেউ মনে করেন, অন্যজন বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন, তাহলে উভয়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কঠিন। অন্যান্য ব্যাপারেও পারস্পরিক আস্থা নষ্ট করা হলে জন্ম নেয় অবিশ্বস্ততা। দাম্পত্য জীবনটা আস্থার বিষয়। এর অন্যথা হলে বিবাহের প্রাণকেন্দ্রেরই অবক্ষয় ঘটে।
ন্যায়ানুগ হওয়া : সাধারণত যখন আমরা রেগে যাই কিংবা অসন্তুষ্ট হই, তখন আমরা আর ন্যায়সঙ্গত আচরণ করি না। এ অবস্থায় আমরা নিজেকে প্রবোধ দিতে চেষ্টা করি যে, আমার প্রতি যেহেতু অন্যায় করা হয়েছে অতএব আচরণে ও কথায় পাল্টা অন্যায় করলে ঠিকই হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা আল কুরআনে বলছেন, ‘কোনো অবস্থাতেই অন্যায় আচরণ কোরো না- এমনকি তোমার শত্রুর প্রতিও।’ আর এখানে তো আমরা বলছি আমাদের জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী এবং আমাদের সন্তানদের মাতা-পিতা সম্পর্কে। স্বামী বা স্ত্রীর আচরণ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ‘কখনো না’ এবং ‘সব সময়ে’র মতো শব্দ ব্যবহার করা অসঙ্গত। তা করা হলে স্বামী বা স্ত্রীকে আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিতে বাধ্য করা হয়।
আমোদপ্রিয় হওয়া : বিবাহিত জীবনে রোমান্স বজায় রাখার একটি নিশ্চিত উপায় হলো, নিজ স্বামী বা স্ত্রীর সাথে হাসি-তামাশা করা। পরস্পরকে বিশেষ নামে সম্বোধন এবং যোগাযোগের গোপন স্টাইলের মাধ্যমে অনেক দম্পতি তারুণ্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন। এভাবে তাদের বৈবাহিক জীবন হয়ে উঠেছে সফল। আপনার স্বামী/স্ত্রী সর্বদা অনুভব করবেন, আপনার কাছে তিনি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও আকাক্সিক্ষত- এমন হওয়া আবশ্যক।
দিলদরিয়া হওয়া : দম্পতির একে অন্যের প্রতি সৎ না হলে ভুল বোঝাবুঝি দেখা দেয়। দাম্পত্য সম্পর্কের আওতায়, অন্যজনের অনুভূতি বিবেচনা করে মনের কথা খুলে বলা এবং একই সাথে নিজের মতের প্রশ্নে আপস না করার ব্যাপারে অবশ্যই নিজেকে নিরাপদ বোধ করতে হবে। যখন পারস্পরিক যোগাযোগ খোলামেলা হয় না, তখন একে অন্যের ঘনিষ্ঠ হওয়া যায় না এবং পরস্পরকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায় না ।
সহায়তাকারী হওয়া : রাসূল সা: উপদেশ দিয়েছেন, ‘জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী হিসেবে একজন ধর্মভীরু মুসলমানকে খোঁজ করবে।’ আমাদের অবশ্যই এই উপদেশ মেনে চলতে হবে। এর কারণ হলো, তাদের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান লক্ষ্য আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি। আল্লাহর প্রতি এই অঙ্গীকার তাদেরকে দাম্পত্য শরিকের আধ্যাত্মিক উন্নয়নের চমৎকার সহযোগীতে পরিণত করে। মোট কথা, এমন দম্পতি আল্লাহ ও তাঁর দীনের প্রতি তাদের পরিবারের ওয়াদা পূরণে সহায়ক।
প্রশংসাকারী হওয়া : সদুদ্দেশ্যে প্রশংসা করা হলো আপনার স্বামী বা স্ত্রীর মন জয় করার খুবই সস্তা একটি উপায়। সবাই চান প্রশংসা পেতে আর সুনজরে পড়তে। সুতরাং অন্যের প্রশংসার বেলায় কার্পণ্য মানে নিজেকে প্রশংসা পাওয়া থেকে বঞ্চিত করা।
ভুলের স্বীকৃতিদাতা হওয়া : প্রায় সময়ই দেখা যায়, আমাদের প্রত্যাশা এত বেশি যে, আমরা একটি বাস্তবতাকে ভুলে যাই। তা হলো, ‘আমরা কেউ ভুলের ঊর্ধ্বে নই’। যখন দম্পতি একে অন্যের দোষ খোঁজেন উকুন বাছার মতো এবং অসম্ভব কিছু দাবি করে বসেন, তখন তাদের মনে রাখতে হবে, শুধু আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাই সর্ববিধ ত্রুটি থেকে মুক্ত।
অনুভূতির ব্যাপারে সতর্ক হওয়া : নবী করীম সা: বলেছেন, ‘আমরা যদি তওবা করি, আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করে দেবেন। তবে যেসব গোনাহ করা হয়েছে একে অন্যের বিরুদ্ধে- যেমন অপরের অনুভূতিতে আঘাত দেয়া- তা মাফ করা হবে না; যে পর্যন্ত না ওই ব্যক্তি আগে মাফ করে দেয়।’ স্বামী-স্ত্রী কোনো কোনো সময় একে অপরের অনুভূতির দিকে খেয়াল করেন না মোটেও। তারা মনে করেন, তারাও ঠিক করছেন এবং তারা যা বোঝাতে চান, সেটা অন্যজন জানেন। এটা বিস্ময়কর যে, মানুষ নিজের প্রিয়জনের প্রতি যতটুকু অনুভূতিশীল ও সৌজন্য দেখায়, তার চেয়ে বেশি অনুভূতিপরায়ণ ও সৌজন্যপ্রবণ অচেনা লোকের প্রতি। দাম্পত্য সঙ্গী বা সঙ্গিনীর অনুভূতিতে যাতে আঘাত না লাগে, সে ব্যাপারে সব সময়ই সতর্ক ও মনোযোগী থাকা জরুরি। আর আঘাত দিলে যত শিগগির সম্ভব মাফ চেয়ে নেয়া উচিত। কেউ জানেন না তার প্রিয়জন কখন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবেন। তাই সুযোগ পাওয়া মাত্রই ভুল সংশোধন করা কি উত্তম নয়?
আকৃষ্ট হওয়া : অনেক সময়ই দম্পতির একজন অন্যজনের প্রতি আকর্ষণ বাড়ানোর চেষ্টা করেন না। পরস্পরের বন্ধু হিসেবে একে অন্যকে না দেখাই এর কারণ। মিলেমিশে কাজ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দু’জনের মাঝে আকর্ষণ ও ভালোবাসা বাড়বে। হ

ভাষান্তর : মোহাম্মদ আবু জাফর
লেখিকা : ইসলামিক সোশ্যাল সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশন (যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা)-এর বোর্ড সদস্য। কানাডার ইসলামিক সেন্টার অব ম্যানিটোবার সমাজসেবা কার্যক্রমে জড়িত।


  • শাহিনা সিদ্দিকী
  • ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:০৬