যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তুরস্ক যেভাবে গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে

কুর্দি এক রাজনৈতিক নেতার শেষকৃত্য অনু্ষ্ঠান - দলিল সোলাইমান, গেটি ইমেজ

  • আহমাদ আব্দুল্লাহ
  • ২৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০৮:৩৪

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তুরস্ক- এ তিনটি দেশই ইরাক ও সিরিয়ার ভূখন্ডে প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরকে বিমান থেকে হামলা চালিয়ে হত্যা করার কৌশল বাস্তবায়ন করছে। এক্ষেত্রে এ তিনটি দেশ বিমান ও ড্রোন -উভয় ধরনের সমরাস্ত্রই ব্যবহার করছে। বিগত কয়েক বছরে এ ধরনের বহু ঘটনা ঘটেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিমান দিয়ে প্রতিপক্ষকে হত্যা করার প্রবণতা বেশ আলোচিত হয়েছে। এ বছরের একেবারে শুরুর দিকে ইরানী জেনারেল কাসেম সোলাইমানী এবং ইরাকের মিলিশিয়া নেতা আবু মাহদি আল মুহানদিসকে হত্যা করা হয়। মার্কিন ড্রোন থেকে সুনির্দিষ্ট টার্গেট করে বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের বাইরে একটি গাড়িতে হামলা চালিয়ে এদেরকে হত্যা করা হয়।

কাসেম সোলাইমানী ছিলেন ইরানের ইসলামিক রিভোলিউশনারী গার্ডের কুদস ফোর্সের কমান্ডার। এ বাহিনীটিই ইরান ছাড়া বিশ্বের নানা দেশে ইরানের গুরুত্বপূর্ন সব কৌশল ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে থাকে। অন্যদিকে, মুহানদিস ছিলেন ইরাকের কাতাইব আল হিজবুল্লাহ নামক একটি মিলিশিয়া দলের নেতা। এ দলটিকে ইরানপন্থী হিসেবে মনে করা হয়।

সোলাইমানী ছিলেন ইরানের দ্বিতীয় শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতার পালাবদলে এবং ইরানের বৈদেশিক নীতিমালা ও কৌশল নির্ধারনে সোলাইমানীর প্রবল প্রভাব ছিল। তাই সোলাইমানীকে হত্যা ছিলো বড়ো ধরনের ঘটনা। সোলাইমানীর জীবনী লিখেছেন আরাশ আজিজি। তিনি সোলাইমানী হত্যা প্রসঙ্গে বলেন, ১৯৪৩ সালে মার্কিনীরা জাপানের ইম্পেরিয়াল নেভির মার্শাল এডমিরাল ইসোরোকু ইয়ামামোতুকে বহনকারী বিমানকে ভ‚পাতিত করে তাকে হত্যা করে। এরপর থেকে সোলাইমানী পর্যন্ত এত বড়ো মাপের সামরিক কোনো ব্যক্তিত্বকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করতে পারেনি।

মার্কিন সেনাবাহিনী সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলে এবং ইরাকে শুধুমাত্র আইএস বিদ্রোহীদের হত্যা করার জন্যই বিমান হামলা চালাচ্ছে, বিষয় এমন নয়। তারা নিয়মিতভাবে আল কায়েদার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মিলিশিয়া দলগুলোর শীর্ষ ব্যক্তিদেরকেও হত্যা করছে। সিরিয়ার উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ইদলিবে মার্কিনীরা বিশেষ ধরনের আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপনযোগ্য হেলফায়ার মিসাইল, এজিএম ওয়ান ওয়ান ফোর আর নাইন এক্স জাতীয় মিসাইলও ব্যবহার করছে।

এ ধরনের মিসাইলগুলোতে ব্লেডেও লাগানো থাকে, ফলে এ ধারালো অস্ত্র দিয়ে টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে রীতিমতো টুকরো টুকরো করে ফেলা সম্ভব। এই মিসাইলগুলোর ওজন এবং এর দ্রুতগতি- দুটো বিষয় একসাথে যুক্ত হলে তা সহজেই যেকোনো যানবাহনে, এমনকী দালানের দেয়াল ভেদ করেও ঢুকে যেতে পারে এবং ভেতরে অবস্থানরত ব্যক্তিকে পিষে ফেলতে অথবা তাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে। দ্রুতগতি এবং অল্প সময়ের মধ্যে হত্যাকান্ড ঘটানোর কারনে মিসাইলগুলোকে নিনজা বোমা বা ফ্লাইং জিনসু হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়।

মার্কিন সেনাবাহিনী বলছে, এ মিসাইলগুলোতে ধ্বংসাত্মক ওয়ারহেড বা বিস্ফোরক না থাকায় এটি শুধুমাত্র টার্গেটকৃত ব্যক্তিদেরকেই আঘাত করে। টার্গেটের আশপাশে অন্য কোনো বেসামরিক ব্যক্তির কোনো ক্ষতি হয় না। হেলফায়ারের এ সংস্করণটি তৈরি করা হয় বারাক ওবামার সময়। সে সময়ে মার্কিনীরা যেসব জায়গায় বিমান বা ড্রোন হামলা করতো, তাতে অনেক বেসামরিক নাগরিক নিহত হতো। ফলে মার্কিন সামরিক হামলাগুলো তখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। এরপর এই মিসাইলটির ব্যবহার শুরু হয়।

এতকিছুর পরও এসব মিসাইলের হামলায় বেসামরিক লোকদের হতাহতের ঝুঁকি নেই এমনটাও বলা যাবে না। যেমন গত অক্টোবরে আর নাইন এক্স মিসাইল দিয়ে ইদলিবে দুজন আল কায়েদা কর্মকর্তার ওপর হামলা চালানো হয়। অথচ সেবারও হামলাতে পাশে থাকা বেসামরিক পথিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়।

পরিসংখ্যান বলছে, হেলফায়ারের এ মডেলটি আসার পর বেসামরিক লোকদের ক্ষয়ক্ষতি আসলেই অনেকটা কমে এসেছে। নতুন এ মিসাইলটি তৈরি করার পর ২০১৭ সালেই ইদলিবে আল কায়েদার সিনিয়র নেতা আবু খায়ের আল মাসরিকে হত্যা করে এর কার্যকারিতার প্রমাণ দেয়া হয়।

গত জুনে আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। যাতে দেখা যায় আল কায়েদার সাথে সম্পৃক্ত সংস্থা হুরাস আল দ্বীনের একজন জর্ডানিয়ান এবং একজন ইয়েমেনি বংশোদ্ভুত সদস্য একটি গাড়ির ভেতর থাকা অবস্থায় সেখানে আর নাইন এক্স মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে।

সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম বছর থেকেই ইসরাইলের পক্ষ থেকে অসংখ্য বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। যখনই ইরান তার দেশের উত্তরাঞ্চলীয় সীমানায় সিরিয়ায় ভূখন্ডে কোনো সামরিক ঘাটি তৈরি করতে চেয়েছে সেখানে ইসরাইল হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি হিজবুল্লাহ যেন প্রক্সি যুদ্ধ চালাতে পারে সেজন্য তেহরান যতবারই তাদেরকে উন্নত অস্ত্র দিতে চেয়েছে, ততবারই ইসরাইল বিমান হামলার মাধ্যমে তা নস্যাৎ করে দিয়েছে।

গত নভেম্বরে ইরানের রিভোলিউশনারী গার্ডের কমান্ডার মুসলিম শাহদা যখন ইরাক থেকে সিরিয়ায় গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন, তখনও ইসরাইলীরা ড্রোন হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করে। এ ঘটনার কয়েকদিন আগে তেহরানের কাছে একটি গুপ্তহত্যার মাধ্যমে ইরানের প্রধান পরমানু বিজ্ঞানী মোহসিন ফাখরিজাদেহকে হত্যা করা হয়।

গত জুনে একটি অজ্ঞাতনামা বিমান সিরিয়া-ইরাক সীমান্তবর্তী শহর আল বুকামালে হামলা চালায়। তাদের টার্গেট সম্ভবত ছিল কুদস ফোর্সের বর্তমান প্রধান ও সোলাইমানীর উত্তরসরী ইসমাইল ঘানি। এ হামলার মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে ইসমাইল ঘানি এই এলাকা সফরে গিয়েছিলেন। ইসরাইল ক্রমান্বয়ে ইরানের রিভোলিউশনারী গার্ড এবং ইরান সমর্থিত ইরাকি শিয়া মিলিশিয়া সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদেরকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে। এক্ষেত্রে আল বুকামাল শহর আর কুদস ফোর্সকে টার্গেট করার কারণ হলো এ এলাকা দিয়েই ইরাক থেকে সিরিয়ায় অস্ত্র পাঠানো হয়। এ পর্যন্ত আল বুকামাল শহরের বহু স্থানে ইসরাইলীরা বিমান হামলা চালিয়েছে।

এর আগেও ইসরাইল রিভোলিউশনারী গার্ড এবং হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব পর্যায়ের লোকদেরকে সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারীতে সিরিয়ার সীমান্তবর্তী ও গোলান হাইটসের পাশ্ববর্তী কুনেইতরা গ্রামে একটি গাড়িবহরে ড্রোন হামলা চালানো হয়।এতে ইসলামিক রিভোলিউশনারী গার্ডের জেনারেল মোহাম্মাদ আলহাদাদি এবং হিজবুল্লাহ নেতা জিহা মুঘনিয়েহ নিহত হন। ইসরাইলীরা পরবর্তীতে প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছিল, এ বহরে এত বড়ো মাপের মানুষ ছিল তারা তা জানতো না।

বিশ্বজুড়ে প্রচন্ড সমালোচনার মুখে পড়লেও ইসরাইলীরা ইরানের ইসলামিক রিভোলিউশনারী গার্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিমান হামলা করে হত্যা করার মিশন অব্যহত রেখেছে। পাশাপাশি, সিরিয়ায় ইসরাইলের সম্ভাব্য উপস্থিতির ক্ষেত্রে যেসব ইরানপন্থী মিলিশিয়া গোষ্টীকে হুমকি মনে করবে, তাদের হত্যার কোনো সুযোগও ইসরাইল বাদ দিবে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে, তুরস্ক অতি সম্প্রতি আকাশ থেকে প্রতিপক্ষকে গুপ্তহত্যার মিশনে নিজেদের নাম লিখিয়েছে।

২০১৮ সালের আগষ্ট মাসে তুরস্ক ইরাকী ভূখন্ডে বিমান হামলা চালিয়ে কুর্দিস্তান ওয়ার্কাস পার্টি বা পিকেকের সিনিয়র নেতা জাকি শিংগালি ওরফে ইসমাইল ওজদেনকে হত্যা করে। পিকেকে একটি স্বাধীনতাকামী সংগঠন যারা তুরস্ক, ইরাক ও সিরিয়ার কুর্দি প্রধান এলাকা নিয়ে স্বাধীন দেশ গড়ার জন্য সংগ্রাম করছে। তুরস্ক এ সংগঠনটি সন্ত্রাসী সংগঠন এবং নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি বলেই মনে করে।

এ হামলায় তুরস্কের এফ-সিক্সটিন যুদ্ধবিমান এবং সশস্ত্র ড্রোন ব্যবহার করা হয়। যার শিংগালির গোটা বহরকে ধ্বংস করে দেয়। এ বহরে দুটো পিকআপ ট্রাক ছিল। পিকআপগুলোতে উন্নত মানের অস্ত্র ছিল বলেও পরবর্তীতে তুরস্ক দাবি করে।

এরপর থেকে তুরস্ক আরো বেশ কয়েকটি বিমান হামলা চালিয়ে পিকেকে নেতাদের হত্যাকান্ড অব্যহত রাখে। তুরস্ক এক্ষেত্রে খুবই উন্নতমানের নিজ দেশে প্রস্তুত সশস্ত্র ড্রোনগুলোকে কাজে লাগাচ্ছে। যেগুলো দীর্ঘ সময় আকাশে উড়তে পারে এবং খুব নির্ভুলভাবে টার্গেটে আঘাত করতে পারে। এ ড্রোন আবিস্কারের পর তুরস্ক তার প্রতিপক্ষকে মোকাবেলায় অনেকটা এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে, পিকেকে গেরিলাদের দমনে তুরস্ক এখন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতা অর্জন করেছে।

তুরস্ক এখন আরো কার্যকর ও উন্নত ড্রোন তৈরি করার চেষ্টা করছে। এ ড্রোনগুলোকে বলা হচ্ছে সুইসাইড বা কামিকেইজ ড্রোন। এ ড্রোনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পরিচালিত হবে এবং তারা গুচ্ছ মারনাস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালাতে পারবে। নতুন এ ড্রোনগুলোতে মুখ সনাক্তকরণ প্রযুক্তিও সংযোজন করা হচ্ছে। অর্থাৎ এ ড্রোনগুলো টার্গেট এলাকায় অসংখ্য মানুষের মুখ স্ক্যান করে তার কাংখিত টার্গেট ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে শুধুমাত্র তার ওপরই হামলা চালাতে পারবে। এ ড্রোন যদি তুরস্ক আসলেই নির্মান করতে পারে তাহলে প্রথাগত যুদ্ধ কৌশল অনেকটাই বদলে যাবে। ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান পরিচালনা না করে বরং আকাশ থেকে বিমান বা ড্রোন হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রক ব্যক্তিদেরকে হত্যা করার পথই বেছে নেবে।

বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে