ইসরাইলের ভবিষ্যৎ

নিউইয়র্ক টাইমসে এই কার্টুনটি প্রকাশের পর ব্যাপক বিতর্ক হয়েছিলো - আউটলুক

ইসরাইলকে অনেকে বলেন ''মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া'', অনেকে বলেন ''অবৈধ রাষ্ট্র''। তা বিষফোঁড়া হোক কিংবা অবৈধ, কঠিন বাস্তবতা হলো, এক কোটিরও কম জনসংখ্যার এই ছোট দেশটিই সেই ১৯৪৮ সাল থেকে প্রবল প্রতাপে টিকে আছে। তারা জাতিসংঘ, বিশ্বজনমত কিছুরই তোয়াক্কা না-করে একের পর এক বিতর্কিত নিয়ে চলেছে। আর এ অপকর্মে তাদের প্রধান মদদদাতা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিভাবে ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিয়ে একটি আগ্রাসী দেশে পরিণত করছে তার কিছু দিক আমরা তুলে ধরবো

যুক্তরাষ্ট্র আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ''ইসরাইলি ভূখন্ড'' হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রাইডম্যান। আর এতে আহ্লাদে ফেটে পড়ে পশ্চিম তীরে আরো হাজার হাজার অবৈধ ইহুদি বসতি নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছেন ইসরাইলের যুদ্ধমন্ত্রী নাফতালি বেনেট। পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে নতুন এই বসতি নির্মাণ করা হবে। এজন্য ২৭৫ একর বা ১.১১ বর্গকিলোমিটার এলাকা অধিগ্রহণ করা হবে। সেখানে সাত হাজার নতুন ইউনিট নির্মাণ করা হবে।

এগুলো তো ইসরাইলের শক্তিমত্তার প্রকাশ। না, কথা আছে। ইসরাইলের নানা সঙ্কটের কথা উঠে এসেছে। সে-কথা উঠছে ইসরাইলের ভেতর থেকেই। বলা হচ্ছে, ইসরাইলের ভবিষ্যৎ কী? জবাব আসছে, খারাপ অথবা খুব খারাপ। যে-সে নয়, নিজ দেশের বিপজ্জনক ভবিষ্যতের এই উদ্বেগটি প্রকাশ করেছেন ইসরাইলের সাবেক এক গোয়েন্দা- প্রধান। তাঁর নাম কারমি গিলন। তিনি ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেইতের সাবেক প্রধান।

সাবেক এ গোয়েন্দা- প্রধানের উদ্বেগ মূলত জুইশ আন্ডারগ্রাউন্ড নামের একটি কট্টর ইহুদিবাদী গোপন সংগঠন নিয়ে। ইসরাইলের ডানপন্থী দলগুলোর মদদপুষ্ট জুইশ আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনটি চায়, তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় আদর্শ হবে ইহুদী ধর্মীয় আইন। তাঁর বিশ্বাস, সরকারিভাবে 'সন্ত্রাসী সংগঠন' ঘোষিত এ গোপন দলটির ব্যাপ্তি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এবং এদের উত্থানে ইসরাইলের আগামী দিনগুলো হতে পারে 'খারাপ' অথবা 'খুব খারাপ'।

১৯৮০র দশকে জুইশ আন্ডারগ্রাইন্ড সংগঠনটি জেরুসালেমের পবিত্র আল আকসা মসজিদ বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করে। তবে বাস্তবায়নের আগেই পরিকল্পনাটি ফাঁস হয়ে যায় এবং মুখ রক্ষার্থে ইসরাইল সরকার অনেককে গ্রেফতার করে। ওই ষড়যন্ত্র ছাড়াও ওরা প্রায়ই প্যালেস্টাইনী ছাত্রদের অপর হামলা চালাত। এমনকি একবার এক প্যালেস্টাইনী মেয়রের ওপর বোমাহামলাও চালায় ওরা।

সাবেক গোয়েন্দা প্রধান গিলন স¤প্রতি ইসরাইলী সংবাদপত্র 'হারেৎজ'কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, ওই সময় ইসরাইলে বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা ছিল ১২ হাজার, আর এখন তা পৌছেছে পাঁচ লাখে। বসতি স্থাপনকারী ও কট্টর ইহুদিবাদিদের মধ্যে এ দলটি বিকশিত হচ্ছে সুস্পষ্ট আদর্শিকভাবে। ওরা এখন আর ফ্যালনা নয়। কিভাবে ইসরাইলের ভেতরে এরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে আসুন জেনে নেই তার কিছু দিক

ডানপন্থী দলগুলোর ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে জুইশ আন্ডারগ্রাউন্ড গোষ্ঠীটি ইসরাইলের রাজনৈতিক অঙ্গনেও নানা রকম ঝামেলা তৈরি করছে। স¤প্রতি জানা গেছে, ইসরাইলের শান্তিবাদী প্রধানমন্ত্রী ইৎযাক রবিনের হত্যাকান্ডেও এরা জড়িত ছিল, যে প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৫ সালে প্যালেস্টানী নেতাদের সাথে অসলো শান্তি চুক্তি করেছিলেন।

জাতিসংঘের রেজুলেশনকে তোয়াক্কা করে না ইসরাইল। কার্টনটি করেছেন কারলোস ল্যাতোফ
জাতিসংঘের রেজুলেশনকে তোয়াক্কা করে না ইসরাইল। কার্টনটি করেছেন কারলোস ল্যাতোফ

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী এখন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কট্টরপন্থী এ মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের ক্ষমতায় আছেন। তিনি তার দেশে অবৈধ ইহুদি বসতি গড়ার এবং পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের অঙ্গীভূত করার পক্ষে। এসবই মিলে যায় জুইশ আন্ডারগ্রাউন্ড গোষ্ঠীটির সাথে। ফলে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনামলে ওরা বাধাহীনভাবে বেড়ে উঠছে আর চাচ্ছে ইসরাইলকে 'ইহুদি রাষ্ট্রে' পরিণত করতে। সাবেক গোয়েন্দা প্রধান গিলন মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং দেশের অন্যান্য রাজনীতিবিদ কৌশলে জুইশ আন্ডারগ্রাউন্ডকে বাড়তে দিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, জুইশ আন্ডারগ্রাউন্ড তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যই পূরণ করছে।
সাবেক গোয়েন্দা প্রধান গিলন শুধু সাক্ষাতকারেই নয়, তাঁর এক বইয়েও নিজ দেশের বিপদ নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর লেখা বইটির নাম ''ভিশাস মেসিয়াহ''। এটি একটি পলিটিক্যাল ফিকশন বা রাজনৈতিক কল্পগল্প। এতে তিনি প্যালেস্টাইনে খ্রিস্টান ও মুসলিমদের বিভিন্ন পবিত্র স্থানের ওপর জুইশ আন্ডারগ্রাউন্ড গোষ্ঠীর নতুন হামলার পরিকল্পনার ছবি এঁকেছেন।

বইতে তিনি আরো দেখিয়েছেন, ওই গোষ্ঠীটি শুধু খ্রিস্টান ও মুসলিমদের ওপর হামলা করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তারা ধর্মীয় আইন চালুর বিরোধিতাকারী সংস্কারবাদী বিভিন্ন ইহুদি গোষ্ঠীর সদস্য এবং নেসেট বা পার্লামেন্ট মেম্বরদের ওপরও হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে।

কারমি গিলনের বইটি যদিও কেবলই একটি পলিটিক্যাল ফিকশন বা রাজনৈতিক কল্পগল্প, তারপরও লেখক বিশ্বাস করেন, যদি কোনো পরিস্থিতিতে পশ্চিম তীর থেকে ইসরাইল সরে আসে অথবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিতর্কিত ''ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি'' বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এসব হামলার সবগুলোই ঘটা সম্ভব। কেননা, জুইশ আন্ডারগ্রাউন্ড এবং অন্যান্য ধর্মান্ধ গোষ্ঠী পশ্চিম তীর থেকে ইসরাইলের সরে আসার ঘোর বিরোধী। তাদের কট্টর বিশ্বাস, এটা তাদের জন্য ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমি।

গিলনের মতে, ইসরাইলের উপর্যুপরি বেশ কয়েকটি সরকার ধর্মীয় উগ্রবাদীদের প্রশয় দিয়ে আসছে। তিনি বলেন, আমার যদ্দুর মনে পড়ে, পত্রপত্রিকার খবর ও ছবিতে দেখেছি, সেবাস্তিয়ার বসতি স্থাপনকারী এবং তাদের নেতা রাব্বি লেভিঙ্গারের প্রতি বেশ সদয় ছিলেন তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিমন পেরেস। সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়, প্রতিটি ইসরাইলি সরকারই রাব্বী বা ইহুদি উগ্রপন্থী, জায়নবাদী আন্দোলন এবং কট্টরপন্থী সংসদ-সদস্যদের মন যুগিয়েই চলতে চেয়েছে। কারণ, তারা চেয়েছে যেভাবেই হোক, যত বেশিদিন পারা যায় ক্ষমতায় থাকতে। এর মাঝে কিছুটা ব্যতিক্রম হলেন সাবেক দু' প্রধানমন্ত্রী - বামপন্থী এহুদ বারাক এবং ডানপন্থী আরিয়েল শ্যারন। গিলনের মতে, শেষের জন ডানপন্থী হলেও তার মধ্যে কিছু রাজনৈতিক বেপরোয়া মনোভাব ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইলের রাজনৈতিক সম্ভাবনা কী - জানতে চাওয়া হলে কারমি গিলন বলেন, একটি হলো 'খারাপ', অন্যটি 'খুব খারাপ'। এ পর্যায়ে তিনি স্মরণ করেন ১৯৯৫ সালের নভেম্বর মাসের কথা। তখন তিনি গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেইতের প্রধান। এ সময় ইগল আমির নামে এক ধর্মোন্মাদ হত্যা করে প্রধানমন্ত্রী ইৎযাক রবিনকে। গোয়েন্দা প্রধান চরম বিস্ময়ের সাথে দেখলেন, ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়ে কোনো রকম তদন্ত চালানোর অনুমতি দিচ্ছে না ইসরাইলের আইন মন্ত্রণালয়।

তিনি বলেন, র‌্যাডিক্যাল রাব্বিদের ঘোষণাপত্রে যে আসন্ন বিপদের আভাস ফুটে উঠেছে তা নিয়ে এবং তাদের অনুগত ছাত্রসংগঠনগুলো নিয়ে তদন্তের অনুমতি দেয়া হলো না কোনো অ্যাটর্নি জেনারেলকেই। আর কী করা, সবাই ব্যাপারটি ভুলেই থাকলো।

অনেকেই মনে করেন, জুইশ আন্ডারগ্রাউন্ড ১৯৮০ ও ১৯৯০এর দশকে যেসব হামলা চালিয়েছে, তার প্রত্যেকটির পেছনে ছিল র‌্যাডিক্যাল রাব্বিদের ইন্ধন। তাদের ইন্ধনে দলটি আরো বেশি শক্তি সঞ্চয় করছে।

ইসরাইলের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ-এর সাবেক প্রধান এফরাইম হালেভি মনে করেন র‌্যাডিকাল রাব্বীরা এ সবের সাথে ঘনিষ্টভাবে জড়িত। ১৯৯০এর শেষ দিক থেকে ২০০০এর শুরুর দিক পর্যন্ত মোসাদের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী হালেভি বলেন, প্রধানমন্ত্রী রবিনকে হত্যায় ঘাতক ইগল আমিরের পেছনে সরকারি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ হালাখিচ ছিল, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমি সবসময় ভাবি, কারো সমর্থন ছাড়া একা সে কিভাবে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করতে পারলো?

গিলনের মতে রবিন-হত্যার চাইতেও জঘণ্য ঘটনা ঘটছে এখন ইসরাইলে। ঘাতক ইগলের স্ত্রী একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছে, যার একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে ইগলের কারামুক্তি। অ্যাটর্নি জেনারেল এ দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতিও দিয়েছেন, যে অ্যাটর্নি জেনারেল জুইশ আন্ডারগ্রাউন্ড এবং অন্য ধর্মোন্মাদ দলগুলোর ব্যাপারে কোনো তদন্ত করছেন না। তাছাড়া নতুন দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি জানিয়েছিল ইসরাইলের অন্যতম প্রধান দল লেবার পার্টি। অ্যাটর্নি জেনারেল তাতেও কর্ণপাত করেননি।

সাবেক মোসাদ- প্রধান এফরাইম হালেভি ২০১৬ সালেই বলেছিলেন, ইগল আমির যদি জেল থেকে ছাড়া পায় তাহলে আমি আর এদেশে থাকতে চাই না। তবে আমি এ-ও জানি, সে একদিন-না-একদিন জেল থেকে বেরিয়ে আসবেই। আসলে ইসরাইল এখন আরো বেশি উগ্রপন্থীদের হাতে গেছে। যাতে দেশটির ভেতরে বিভাজন আরো তীব্র হচ্ছে।

প্রতিবেদনটির ভিডিও দেখুন

বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে