আমিরাত ও সৌদির সাথে তুরস্কের দ্বন্দ্বের পেছনে


আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটা কথা চালু আছে যে পশ্চিমাজগতের নাকি সবসময় একজন শত্রূ লাগেই। শত্রূ না-থাকলে তারা একজন শত্রূ বানিয়ে হলেও নেবে। যুদ্ধ করবে ছায়ার সাথে, গদা ঘোরাবে হাওয়ায়। বেশ ক'বছর হলো এ রোগ সংক্রমিত হয়েছে মুসলিম বিশ্বেও। এমনিতে মুসলিম বিশ্বের অনৈক্যের কথা সারা দুনিয়ায় সুবিদিত। তার ওপর ক' বছর ধরে তারা জড়িয়ে পড়েছে সরাসরি যুদ্ধে। এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তারা নিজেদের মধ্যে কূটনৈতিক লড়াইও করে চলেছে।

এবার এ রকম লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছে তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউএই-র মধ্যে। বিষয়, লিবিয়া সঙ্কট। কিছু'দিন আগে ইউএই-র পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে অভিযোগ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, সৈন্য ও অস্ত্র দিয়ে লিবিয়া সঙ্কটে হস্তক্ষেপ করছে তুরস্ক। বিবৃতিতে লিবিয়ার দলত্যাগী সামরিক কম্যান্ডার খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা এনএলএ-র প্রশংসা এবং জাতিসংঘ-স্বীকৃত লিবিয়া সরকারের পক্ষে তুরস্কের সামরিক হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করা হয়।

ইউএই-র এ বিবৃতির জবাব দিতে দেরি করে না তুরস্ক। পাল্টা এক বিবৃতিতে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করে, সংযুক্ত আরব আমীরাত বা ইউএই ওই অঞ্চলে ''ধ্বংসাত্মক'' ও ''দুমুখো'' নীতি অবলম্বন করছে। বিবৃতিতে তুরস্কের ব্যাপারে ''শত্রূতামূলক মনোভাব'' পরিহার করতে আমীরাতের প্রতি আহ্বানও জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, খলিফা হাফতারের লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা এনএলএ-কে অস্ত্রশস্ত্র ও ভাড়াটে যোদ্ধা দিয়ে লিবিয়ায় ''ফ্যাসিস্টদের'' মদদ দিচ্ছে আমীরাত। বিবৃতিতে ইয়েমেন, সিরিয়া ও আফ্রিকার শৃঙ্গের মতো স্থানগুলোতে ''আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাবিরোধী বাহিনীগুলোকে'' অর্থ যোগান বন্ধ করতেও আমীরাতের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

লিবিয়ায় তুরস্ক সমর্থন করে ত্রিপলীতে অবস্থিত গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকর্ড বা জিএনএ সরকারকে। এ সরকার জাতিসংঘেরও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। এ সরকারকে উৎখাত করতে গত বছর থেকে সামরিক অভিযান শুরু করে লিবিয়ার দলত্যাগী সামরিক কম্যান্ডার খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা এনএলএ। এদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ত্রিপলী সরকারকে সহায়তা করতে তাদের সাথে সামরিক চুক্তি করেছে তুরস্ক। পক্ষান্তরে খলিফা হাফতারের দলবলকে মদদ দিচ্ছে আমীরাত ও সউদি আরব। জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হাফতারের দল অবশ্য এ পর্যন্ত তেমন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।

কেবল লিবিয়া ইস্যুতে নয়, মধ্যপ্রাচ্যের আরো নানা সঙ্কটে, যেমন সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, মিশরে সামরিক অভ্যুত্থান, সাংবাদিক জামাল খাসোগী-হত্যা ইত্যাদি ইস্যুতে তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমীরাত - এ দু' মুসলিম দেশ পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু কেন আসুন জেনে নেই সে সর্ম্পকে কিছু তথ্য

আমিরাতের বিরুদ্ধে তুরস্কের অভিযোগ হলো, দেশটি ইয়েমেনে বেসামরিক লোকজন হত্যা এবং মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষের কাজকর্মে হস্তক্ষেপ করে চলেছে এবং তুরস্কে ২০১৬ সালের সরকারবিরোধী ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে অর্থ-সহায়তা দিয়েছে।

তুরস্কের প্রতি আমীরাত ও সউদি আরবের ক্ষোভের কারণ খুঁজতে হলে আমাদের পেছনে ফিরে যেতে হয়। আমরা ফিরে যাই ২০১১ সালে। সে বছর আরব দুনিয়ায় শুরু হয় বিদ্রোহ, পশ্চিমা মিডিয়া যার নাম দেয় 'আরব বসন্ত । তুরস্ক 'আরব বসন্ত ও এর নায়কদের ব্যাপক সমর্থন দেয়। তুরস্কের এ ভূমিকা মেনে নিতে পারেনি আমীরাত ও সউদি আরব। তাদের মতে, এ বিদ্রোহ তাদের জাতীয় স্থিতিশীলতার প্রতি হুমকিস্বরূপ। একই ঘটনা ঘটে মিশর নিয়েও।

তুরস্কের সমর্থন ছিল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি-র প্রতি। সিরিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং পরে সে-দেশের আসাদ সরকারকে উৎখাতে সশস্ত্র বিদ্রোহেও সমর্থন রয়েছে তুরস্কের। পক্ষান্তরে আমীরাত ও সউদি আরব সমর্থন করে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদ এবং মিশরের আব্দেল ফাত্তাহ এল-সিসিকে। ২০১৪ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান এল-সিসি এক সামরিক অভ্যুত্থানে জনগণের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে উৎখাত করে মিশরের ক্ষমতা দখল করেন। তখন থেকেই আমীরাত ও সউদি আরব এ দু' একনায়ককে সমর্থন দিয়ে আসছে।

তবে তুরস্কের সাথে এ দু' দেশের বিরোধের মূল উৎস হলো, 'আরব বসন্ত' ও মুসলিম ব্রাদাররহুডের প্রতি তুরস্কের সমর্থন। মুসলিম ব্রাদারহুড আন্দোলনকে আমীরাত ও সউদি আরব উভয় দেশই হুমকি মনে করে থাকে। তবে এ দু' দেশের সাথে তুরস্কের বৈরিতা সেখানেই থেমে থাকেনি, বরং নানা ইস্যুতে পারস্পরিক মতবিরোধের মধ্য দিয়ে তা পল্লবিত হয়েছে। সময় যতই গড়িয়েছে, মতবিরোধের বিষয় ততোই বেড়েছে আর তুরস্ক ও আমীরাত পরস্পর জড়িয়ে পড়েছে আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াইয়ে। তারা একে দেখছে ''জিরো সাম গেম'' হিসেবে, যে গেম বা খেলায় কোনো পক্ষ একদিকে জয়ী হলে অন্যদিকে হেরে যায়।

এর সাথে জড়িয়ে আছে কাতার সঙ্কটের নানা দিক। আমীরাত ও তুরস্কের সম্পর্কের টানাপোড়েনের একটি অন্যতম বড় কারণ হলো কাতার সঙ্কট। এ সঙ্কটের সূত্রপাত ২০১৭ সালের জুন মাসে। সে-সময় সউদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিশর - এ চারটি আরব দেশ কাতারের সাথে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। তারা কাতারের বিরুদ্ধে স্থল, আকাশ ও সমুদ্র অবরোধও আরোপ করে। এ চার দেশের অভিযোগ হলো, কাতার ওই অঞ্চলে ''সন্ত্রাসবাদকে'' মদদ দিচ্ছে। অভিযোগটি এসব দেশ আগেও করেছে এবং কাতার তা বরাবরই অস্বীকার করেছে।

এ সময় কাতারের পাশে এসে দাঁড়ায় তুরস্ক। কাতারের সাথে জোরদার করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক। অবরোধ আরোপের ফলে সউদি আরবের সাথে কাতারের একমাত্র স্থল সীমান্তপথটি বন্ধ হয়ে যায়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাতারে খাদ্যপণ্যবোঝাই কয়েকটি উড়োজাহাজ পাঠায় তুরস্ক, যাতে কাতারকে খাদ্যসংকটে পড়তে না-হয়। কেননা কাতারকে আমদানি করা খাদ্যের ওপরই নির্ভর করতে হয়। পাশাপাশি কাতারে একটি সামরিক ঘাঁটিও স্থাপন করে তুরস্ক, সেখানে মোতায়েন করে কয়েক হাজার সৈন্য। সবই করা হয় কাতারের নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজনে।

একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, এসব করতে গিয়ে সউদি-আমিরাত শিবির ও কাতারের মধ্যে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার কথা ভাবেনি তুরস্ক। চেষ্টা করেনি এমনভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে, যাতে করে সউদি আরব ও আমীরাতের সাথেও সম্পর্ক অক্ষুন্ন থাকে। বরং তারা সঠিকভাবে সবটুকু সমর্থন দিয়েছে কাতারের প্রতি। তুরস্কে ২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানটিও আমিরাত-তুরস্ক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পথের কাঁটা হয়ে আছে। তুরস্কের অভিযোগ, আমীরাতের মদদ নিয়ে ওই অভ্যুত্থানে সরাসরি জড়িত ছিলেন প্যালেস্টাইনের ফাতাহ পার্টির সাবেক নেতা মোহাম্মদ দাহলান। এ কারণে তাকে গ্রেফতারে সহায়ক তথ্য দেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে তুরস্ক। গত বছর তাকে ''মোস্ট ওয়ান্টেড'' তালিকাভুক্ত করা হয়। সেই দাহলান এখন আমীরাতের আশ্রয়ে আছেন। তুরস্ক বলে, এই দাহলানের সাহায্যে ২০১১ সালে প্যালেস্টাইনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে উৎখাত করতে চেয়েছিল ইসরাইল। এ কারণে ফাতাহ পার্টি থেকে তাকে বহিস্কার করা হয়। দাহলান ইসরাইলের এজেন্ট। এ কারণেই আমিরাত তাকে পুষছে। এতেই বোঝা যায়, আমীরাতই সন্ত্রাসের প্রশয়দাতা, কাতার নয়। এর জবাবে আমিরাত সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে তুরস্কের সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ তুলে খোঁটা দেয়, এর মাধ্যমে সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে তুরস্ক।

আমিরাতের এ অভিযোগ অস্বীকার করে তুরস্ক বলে, আমরা গত ক' বছরে ওই এলাকায় তিনটি অভিযান চালিয়েছি, যাতে করে এলাকাটি ''সন্ত্রাসীমুক্ত'' এবং সিরিয়ার ৩০ লাখেরও বেশি শরণার্থীকে নিরাপদে স্থানান্তরের উপযোগী হয়। আমরা ওয়াদা করছি, সিরিয়াসঙ্কটের অবসান হলেই আমরা ওই এলাকা ছেড়ে চলে আসবো।

আমিরাত ও তুরস্কের মধ্যে এমন দ্বন্দ্বের মধ্যে নতুন এক খবর প্রকাশ হয়েছে। রাশিয়ার মধ্যস্থতায় সিরিয়া ও তুরস্কের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে তা ভঙ্গ করতে আমীরাত নানাভাবে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে প্ররোচিত করছে আমিরাত। খবরে বলা হয়, চুক্তিভঙ্গের পুরস্কারস্বরূপ সিরিয়াকে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার দিতে চেয়েছে আমীরাত।

সউদি-আমিরাত শিবিরের এসব তৎপরতার মুখে নিস্ক্রিয় বসে নেই তুরস্কও। গত মাসে সউদি আরব সে-দেশে তুরস্কের টিআরটি নেটওয়ার্ক ও আনাদুলো বার্তা সংস্থাকে বøক করে। জবাবে পরদিনই সউদি আরব ও আমীরাতের সব ওয়েবসাইট ব্লক করে তুরস্ক।

এর আগে গত মার্চ মাসে সাংবাদিক জামাল খাসোগী হত্যামামলার রায় দেয় তুরস্কের একটি আদালত। এতে হত্যাকান্ডের জন্য ১৮ জন সউদি নাগরিককে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সউদি যুবরাজের নির্বাসিত সমালোচকরা সরাসরিই বলেন, যুবরাজই এ হত্যার জন্য দায়ী। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও মনে করেন, সউদি সরকারের ''সর্বোচ্চ পর্যায়'' থেকেই খাসোগীকে হত্যার নির্দেশটি এসেছিল।

এমন সম্পর্কের মধ্যেও আমিরাতের সাথে তুরস্কের প্রকাশভঙ্গী যে রকম, সউদি আরবের সাথে তার চাইতে আলাদা বলেই মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। এ রকম এক বিশেষজ্ঞ বলেন, সউদি আরবের সাথে তুরস্কের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের বন্ধন আমিরাতের চাইতে অনেক গভীর। তাই খাসোগী-হত্যার পরও রিয়াদ-আংকারা সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। একই প্রকাশভঙ্গী লক্ষ্য করা যায় সউদি আরবের বেলায়ও। তারা তুরস্কের ব্যাপারে আমিরাতের চাইতে বেশি সতর্ক।

প্রতিবেদনটির ভিডিও দেখুন

বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে