ইরান ও তুরস্ক বন্ধুত্বের রসায়ন

ইরান-তুরস্কের পতাকা- সংগৃহীত

রাজনীতির পথ বড়ই বিচিত্র ও সর্পিল। এখানে কোন ঘটনা থেকে কখন যে কে উপকৃত হয় আর কে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বুঝতে পারা বড় মুশকিল। এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে টানাপোড়েন চলছে তা তুরস্ককে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে একই সাথে বিপদ ও সম্ভাবনার সামনে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সর্ম্পকের  টানাপোড়েন শুধু ইরানকেই উদ্বেগের মধ্যে রাখেনি, ইরানের প্রতিবেশীদের মাঝেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। তীব্র অস্বস্তি নিয়ে ঘটনা প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে তুরস্ক। ইরানি জেনারেল সুলেইমানিকে হত্যা করেছিল আমেরিকা। তার প্রতিশোধ নিতে গত ৮ জানুয়ারি ইরাকে মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এ নিয়ে সেই সময় দুই দেশের উত্তেজনা তুঙ্গে উঠলেও শেষ পর্যন্ত ব্যাপক সংঘাত এড়াতে সক্ষম হয় তারা। এতে তুরস্কসহ ইরানের সব প্রতিবেশীর মধ্যে সাময়িক স্বস্তি নেমে আসে। কারণ, তারা কেউই ওই অঞ্চলে আরেকটি যুদ্ধ দেখতে চাইছিল না।

ইরান-তুরস্ক সম্পর্ক আগে থেকেই মোটামুটি ভালো। তার ওপর ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আগ্রাসনের পর যে ভু-রাজনৈতিক রেষারেষির সূচনা হয়, তখন থেকে দু' দেশ দৃঢ় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে। এমন অবস্থায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এ অঞ্চলে তুরস্কের স্বার্থকে একদিকে যেমন হুমকিতে ফেলে দেয়, অন্যদিকে এনে দেয় তাদের কিছু অবস্থানকে জোরদার করার সুযোগ।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে তুরস্কের বিপদ ও সুযোগগুলো কোথায়, তা বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে ইরান-তুরস্ক সম্পর্কের ঐতিহাসিক বাঁকগুলো। গত কয়েক শতাব্দী ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র বার বার রূপ পাল্টালেও ইরান ও তুরস্ক - এ দু' দেশের সীমান্ত কিন্তু গত ৪০০ বছর ধরে অপরিবর্তিতই আছে। দু' দেশের শত্রুতা কিছু যেমন ছিল, তেমনি ছিল ১৬৩৯ সালের ক্বাসর-ই-শিরিন চুক্তির প্রতি আনুগত্য। এ চুক্তির মাঝ দিয়েই ওসমানীয় ও পারস্য সাম্রাজ্যের সংঘাতের অবসান ঘটে, যে সংঘাত থেমে থেমে দেড় শ' বছর ধরে চলছিল।

গত ২০ বছর ধরে নানা আঞ্চলিক ইস্যুতে ইরান-তুরস্ক সম্পর্কটি ওঠানামা করেছে, কিন্তু কখনোই তারা পুরোপুরি বন্ধু বা শত্রূ হয়ে যায়নি। পুরো ১৯৯০এর দশকজুড়ে ইরানে যে 'রাজনৈতিক ইসলামের' উত্থান ঘটে, তুরস্কের তৎকালীন ধর্মনিরপেক্ষ সরকার বরাবরই ভেবেছে, ইরান তার এ মতবাদ তুরস্কে 'রফতানি' করবে। আবার তুর্কী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকে তেহরান সমর্থন দিচ্ছে বলেও সন্দেহ করে থাকে আঙ্কারা। কিন্তু সর্ম্পক চলছে একই গতিতে।

২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তুরস্ক এ আগ্রাসনের তীব্র বিরোধিতা করে। তারা সাফ জানিয়ে দেয়, এ আগ্রাসেনে যুক্তরাষ্ট্রকে তুরস্কের ভূখন্ড ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। পক্ষান্তরে মার্কিন অভিযানকে সোল্লাসে স্বাগত জানায় ইরান। এ অবস্থা ইরান-তুরস্ক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন জটিলতা তৈরি করে। ইরাকে সাদ্দামের পতনের ফলে তুরস্ক হারায় প্রতিবেশি দেশটির এমন এক বন্ধুসুলভ সরকারকে, যে সরকার তাদেরকে নিজ ভূখন্ডে ঢুকেও পিকেকে-র বিরুদ্ধে অভিযান চালানো মেনে নিত। অন্যদিকে একটি গুলিও খরচ না-করে চিরশত্রূ সাদ্দামের বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে অর্থাৎ সাদ্দামের পতনে খুশি ইরান।

সাদ্দামের পতনের পর ইরাকের উত্তরাঞ্চলে একটি কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে তুরস্ক। ইরাকি সুন্নিদের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে, ভেবেও দুর্ভাবনায় পড়ে তারা। এদিকে সাদ্দামের পতনে বাগদাদের ক্ষমতাকেন্দ্রে যে শূণ্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণে এগিয়ে আসে ইরান। তারা শিয়াদের বিভিন্ন গ্রূপের মাঝে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে, যার মাধ্যমে দেশটির ক্ষমতাবলয়ে শিয়াদের প্রবেশের পথ সুগম হয়।

এ বিপরীতমুখী অবস্থান সত্ত্বেও উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। এর ফল হয় এই যে, ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের মাত্র সাত বছরের মাথায় দু' দেশের সম্পর্ক সর্বোচ্চ মাত্রায় গিয়ে পৌঁছে। এরই প্রকাশ দেখা যায় ২০১০ সালে দু' দেশের এক পরমাণু চুক্তিতে। চুক্তি অনুসারে তুরস্ককে স্বল্প-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেবে ইরান আর বিনিময়ে ইরান তাদের একটি গবেষণা চুল্লির জন্য তুরস্কের কাছ থেকে পাবে নিউক্লিয়ার ফুয়েল রড। তবে এ চুক্তির ফল ইরানের জন্য ভালো হয়নি। এমনিতে দেশটির ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তো ছিলই, তার ওপর আমেরিকার ওবামা প্রশাসন আরো নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়।

ওই বছর আরো দু'টি ঘটনা ইরান-তুরস্ক সম্পর্ককে ঝাঁকুনি দেয়। এর একটি হলো, তেহরান-ওয়াশিংটনের আশীর্বাদ নিয়ে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী পদে দ্বিতীয় বারের মতো নূরী আল-মালিকীর মনোনয়ন পাওয়া এবং আরব বসন্ত।

ইরানের সমর্থনপুষ্ট প্রধানমন্ত্রী নূরী আল-মালিকী তার প্রথম মেয়াদে একের পর এক শিয়াদের পক্ষে পদক্ষেপ নিতে থাকেন, যা সুন্নীদের মধ্যে প্রথমে ক্ষোভ এবং পরে বিদ্রোহের জন্ম দেয়। শুধু তা-ই নয়, তিনি তার দেশে তুরস্কের বন্ধুদের পেছনেও লাগেন। যেমন, ভাইস প্রেসিডেন্ট তারিক আল-হাশিমীকে অনুপস্থিতিতে এক বিচারে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। তুরস্কের মতে, এটা রাজনৈতিক বিচার, ন্য্যায়বিচার নয়। এ রকম অবস্থায় মালিকীকে ইরানের সমর্থন তুরস্ক মেনে নিতে পারে না।

আরব বসন্ত  নিয়ে ইরান ও তুরস্ক বিপরীত অবস্থান নেয় । তুরস্ক পক্ষে, ইরান বিপক্ষে। তুরস্ক মনে করে, এ বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ এনে দেবে। পক্ষান্তরে ইরান ভাবে, এতে তার প্রভাববলয় খর্ব হবে, বিশেষ করে ইরাক, সিরিয়া ও প্যালেস্টাইনে। দু'দেশের এ বিপরীতমুখী অবস্থান বজায় আছে ইরাকে এবং সিরিয়ার গৃহযুদ্ধেও।

অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, দু'দেশের এ বিপরীতমুখী অবস্থানের প্রভাব বলতে গেলে পড়েইনি তাদের কূটনৈতিক ক্ষেত্রে। তাই দেখা যায়, তুরস্ক ও ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যখন একে অন্যের বিরুদ্ধে মাঠে লড়াই করছে, তখন একটি সমাধানের আশায় উভয় দেশের নেতারা কখনো নূরসুলতানে, কখনো তেহরানে বা ইস্তাম্বুলে বৈঠকে বসছেন।

এ অবস্থায় গত ৩ জানুয়ারি ইরাকে আমেরিকান ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানি জেনারেল কাশেম সুলাইমানী হত্যা তুরস্কের সামনে একটি নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। বলা হচ্ছে, এ অঞ্চলের প্রক্্ির যুদ্ধের পরিকল্পনা করতেন জেনারেল সুলাইমানি। এখন তিনি নেই। তার অবর্তমানে ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে দীর্ঘ কাল ধরে চলে আসা প্রক্সি যুদ্ধের ভাগ্য পরিবর্তন হতে পারে। জেনারেল সুলাইমানির অনুপস্থিতি এসব যুদ্ধে ইরানকে দুর্বল করে ফেলবে আর এতে সীমান্তের বাইরে নিজ প্রভাব খাটানোর ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলবে দেশটি।

তুরস্ক মনে করে, সিরিয়া ও ইরাকে স্থিতিশীলতা তার নিজের নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের চাবিকাঠি। এই উভয় দেশেই ইরানকে 'অস্থিতিশীলতার কারণ' বলেই মনে করে তুরস্ক। কাজেই ইরানের প্রক্সি যুদ্ধক্ষমতা দুর্বল হওয়াটা তুরস্কের জন্য সুসংবাদই। আর এ কারণেই সিরিয়ায় ইরানের কর্মকান্ড ক্রমেই কম সহ্য করছে তুরস্ক।

একইভাবে ইরাকেও ইরান যতই গুরুত্ব হারাবে, তুরস্কের সম্ভাবনা ততই উজ্জ্বল হবে। বর্তমানে সেখানে তুরস্কের সাথে জোরদার সম্পর্ক চায় - এমন একাধিক রাজনৈতিক দল থাকলেও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বিবেচনায় তুরস্ক সরকার তা করতে পারছে না। দেশটির চলমান উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাবধারা তাদের পররাষ্ট্রনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইরানের প্রতিবেশীদের মধ্যে তুরস্কই একমাত্র শক্তিশালী ও স্থিতিশীল দেশ। তারা ন্যাটোরও সদস্য। ইরান যদি পাশ্চাত্যের সাথে উত্তেজনা প্রশমন এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে তুরস্ক রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে এ জন্য ইরানকেও তার ইরাক ও সিরিয়া নীতি পুনর্বিন্যাস এবং প্রক্্ির কৌশল বদলাতে হবে।

আর যদি ইরান-মার্কিন উত্তেজনা ফের তুঙ্গে ওঠে, তবে তুরস্কের ভূমিকা হবে পরিষ্কার। ২০০৩ সালে দেশটি যেমন আমেরিকার ইরাক আগ্রাসনকে সমর্থন দেয়নি, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানকেও তারা সমর্থন করবে না।

তারপরও আমেরিকা কোনোভাবে ইরানের বিরুদ্ধে এগিয়ে এলে তা তুর্কী স্বার্থের জন্যও মঙ্গলজনক হবে না। সাদ্দামের পতনের পর থেকে ইরাকে যে গোলমেলে অবস্থা চলছে, তাতে তুরস্কসহ গোটা অঞ্চলই বিপুল ক্ষতির শিকার। এখন ইরাক যদি আবার ইরান ও আমেরিকার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়, তাহলে এ অঞ্চলকে আবার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভোগান্তিতে পড়তে হবে।

তুরস্ক চায়, ইরান ও আমেরিকা আলোচনার টেবিলে বসুক এবং শুধু পরমাণু ইস্যু নয়, বরং ইরাক ও সিরিয়া সঙ্কটেরও সমাধান করে ফেলুক। আর তেহরান ও ওয়াশিংটনে ঠান্ডা মাথার নেতা আসুক কি না-ই আসুক, তুরস্ক সবসময় ভালো কিছুই আশা করে আর খারাপ কিছু মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকে।