মধ্যপ্রাচ্য বদলে দিতে চান দুই যুবক

জ্যারেড কুশনার এবং মোহাম্মদ বিন সালমান-সংগৃহীত -

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে আরব বিশ্ব সব সময় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। শুধু এ অঞ্চলের জ্বালানিসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নয়, ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এর প্রধান কারণ। ফিলিস্তিনি ভূখন্ড দখল করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে পারমাণবিক শক্তি অর্জন পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর ইসরাইল প্রশ্নে মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে যে নুন্যতম ভারসাম্য ছিলো তাও আর নেই। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা ও কথিত শান্তি পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত রুপ পেলো।

ইসরাইলকে ইহুদিবাদী ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে বর্তমান পরিস্থিতির মতো সুসময় মনে হয় আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আসবে না। অপর দিকে, ইসরাইলও এমন সময়ের জন্যই অপেক্ষা করছিল। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, আরব দেশগুলোতে ইসরাইল এমন কিছু বন্ধু পেয়েছে, যা ইসরাইলের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। ইসরাইলের এ দুই পরম বন্ধু হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিনিয়র উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। চল্লিশের কম বয়সী এ দুই তরুণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি বদলে দিতে চাইছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিনিয়র উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণের পর জ্যারেড কুশনার গোপনে ও প্রকাশ্য একাধিকাবর সৌদি আরব সফর করেছেন। এসব সফরে তার সাথে থাকতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ডিনা পাওয়েল ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত জেসন গ্রিনব্লাট। এসব সফরে মুল আলোচ্য বিষয় ছিলো জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
ইসরাইলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে জ্যারেড কুশনারের পরিবারের আগে থেকেই ঘনিষ্ঠতা ছিল। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা এবং মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়ার ঘোষণার পর মুসলিম বিশ্ব যখন উত্তাল হয়ে উঠে তখন সৌদি আরব ছিলো অনেকটাই নীরব। এখন ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা উপস্থাপনের পর সৌদি আরব তাকে স্বাগত জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরাইলের আলোচনার পথ সুগম হবে বলে আশা বরা হয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের ২০১৯ সালের মে মাসের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ বিন সালমান ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের কাছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ব্যাপারে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে দখলকৃত পূর্ব জেরুসালেমের কাছে আবুদিস গ্রামকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে মেনে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণে আংশিক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে এই রাজধানী বানানোর প্রস্তাব দেয়া হয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে শান্তি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন তা নিয়ে সৌদিআরব , ইসরাইল ও আরব আমিরাত আগেই ঐক্যমতে পৌছেছে। ২০১৯ সালের জুনমাসে বাহরাইনে এক সম্মেলনে জ্যারেড কুশনার উপস্থাপন করেন। যেখানে ফিলিস্তিনিদের জেরুসালেমে দাবি ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।


ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি আবর্তিত হচ্ছে কুশনারকে কেন্দ্র করে। যেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর তেমন ভূমিকা নেই বললেই চলে। জ্যারেড কুশনার অন্যান্য ইহুদির মতো ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটকে দেখছেন। ৩৫ বছর বয়সী জ্যারেড কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত একটি ইহুদি পরিবারের সন্তান। লেখাপড়া করেছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। কুশনারের সাথে বিয়ের আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের কন্যা ইভাঙ্কা ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেন। স্বামী-স্ত্রী দুই ধর্মবিশ্বাসী হওয়ার মতো সেকুলার জ্যারেড কুশনার নন। তিনি কিভাবে ইসরাইলকে দেখেন তা নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস ২০১৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এই রিপোর্টে ইসরাইলের সাথে জ্যারেড কুশনারের পরিবারের সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। কুশনার যখন হাইস্কুলের ছাত্র, তখন নেতানিয়াহু তাদের বাড়িতে আসেন এবং কুশনারের ঘরে রাত কাটান। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইহুদি ধর্মযাজক হিরশি জারখি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, কুশনারের কাছে ইসরাইল নিছক রাজনীতির বিষয় নয়। ইসরাইল তার পরিবার, জীবন ও জনগণ। ইসরাইলের সাথে কুশনারের রয়েছে ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় সম্পর্কের বন্ধন।

জ্যারেড কুশনারের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের ধনী পরিবারগুলোর একটি। কুশনারের নাম যুক্তরাষ্ট্রের রিয়েল এস্টেট জগতেও সুপরিচিত। রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করে তিনি পরিবারের বিপুল ভাগ্য গড়ায় সাহায্য করেছেন। কুশনার যখন নিউ ইয়র্ক ভার্সিটিতে এমবিএ-আইন কোর্সের শিক্ষার্থী, তখন তিনি তাদের পারিবারিক রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। ২০০৬ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সেই কুশনার ১০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে নিউ ইয়র্ক অবজারভার পত্রিকা কিনে নেন। তখন তার বাবা একটি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে জেলে যান। বাবা জেল থেকে বের হওয়ার বছর ২০০৭ সালে কুশনার নিউ ইয়র্কের ফিফথ অ্যাভিনিউয়ে ৪১তম অফিস বিল্ডিং কেনেন ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে। তখন পর্যন্ত এটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ে অফিস ভবন কেনার রেকর্ড। পরের বছর তিনি হয়ে গেলেন বাবার কোম্পানির প্রধান নির্বাহী।

পারিবারিক প্রতিষ্ঠান দি সেরিল অ্যান্ড চার্লস ‘কুশনার ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন’ নামে বিভিন্ন মানবসেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে থাকে কুশনার পরিবার। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে বছরে সমাজসেবামূলক কাজে ব্যয় করা হয় দুই মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং এর বিরাট অংশই ইহুদিদের জন্য ব্যয় করা হয়। নিউ জার্সিতে গোঁড়া ইহুদিদের একটি প্রাথমিক ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কুশনার পরিবারের নাম বহন করছেÑ জোসেফ কুশনার হিব্রু অ্যাকাডেমি এবং রি কুশনার ইয়েশিভা হাইস্কুল। দুটোই লিভিংস্টোনে অবস্থিত। স্কুল দুটোর নাম রাখা হয়েছে জ্যারেডের দাদা-দাদীর স্মরণে, যারা নাৎসি হত্যাযজ্ঞের কবল থেকে বেঁচে যান। পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনে তাদের পরিবার বিভিন্ন সময় অর্থসহায়তা দিয়েছে।


পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুপ্রেরণা যে জ্যারেড কুশনারকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে আগ্রহী করে তুলছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ধর্মীয় দৃষ্টিতে ইসরাইলকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা কুশনারের হয়তো অন্যতম লক্ষ্য ছিল। এ ক্ষেত্রে তিনি তার মতো একজন তরুণ মিত্র পেয়ে গেছেন। সৌদি আরবে ২০১৪ সালে বাদশাহ সালমান সিংহাসনে আরোহণের পর থেকে তার কনিষ্ঠ স্ত্রীর জ্যেষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ হয়ে উঠেছেন সৌদি আরবের সবচেয়ে ক্ষমতাধর লোক। তার এ ক্ষমতার প্রতাপ সৌদি সীমানা ছাড়িয়ে অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি দেশটির ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তার রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ ২০০৭ সালে। এ বছর তাকে মন্ত্রিপরিষদের উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়। ২০০৯ সালে তিনি তার বাবা বাদশাহ সালমানের উপদেষ্টা হন। এ সময় তিনি রিয়াদের গভর্নর ছিলেন। ২০১৫ সালের ২৩ জুন তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাসের মাথায় তিনি ইয়েমেনে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। চলতি বছরের জুন মাসে তাকে ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করা হয়। তিনি সৌদি আরবের অর্থনীতি ও উন্নয়নবিষয়ক কাউন্সিলের প্রধান। ২০১৬ সালের এপ্রিলে তিনি ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করেছেন, যেখানে তিনি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তরুণদের নিয়ে ‘মধ্যপন্থী’ সৌদি আরব গড়ার নীতি ঘোষণা করেন। একই সাথে তিনি সৌদি আরবের প্রধান প্রতিপক্ষ ইরানবিরোধী জোরালো পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন।

কুশনার ও বিন সালমানের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সঙ্ঘাতের সূচনা করতে যাচ্ছে। যার প্রকাশ ঘটেছে ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য কথিত শান্তি পরিকল্পনার মধ্যদিয়ে। আরব বসন্তের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, তাতে কুশনার-সালমান-নেতানিয়াহু আরো নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা করছেন। সৌদি আরব, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে এক নম্বর শত্রু হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সৌদি-মার্কিন ভুলনীতি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে আরো বেশি শক্তিশালী করছে।  ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ফিলিস্তিনি সব সংগঠন আবারো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। অনেকে বিশ্লেষক মনে করছেন ফিলিস্তিনে আরেকটি ইন্তিফাদা শুরু হতে যাচ্ছে। যাতে আরো বহু মানুষের প্রানহানি ঘটবে না। এর প্রভাব হতে পারে আরো বেশি ব্যাপক ও বিস্তুত। যাতে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে পড়বে ইরান।