ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কেন এমন হলো

ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা- সংগৃহীত

ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিক্ত সম্পর্ক দীর্ঘ ৬৭ বছরের। এই সর্ম্পক কখনো কখনো রুপ নিয়েছে পরোক্ষ যুদ্ধে। এ জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে ইরান-ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশকে। দুই দেশের এই সর্ম্পকের অন্যতম কারন হল ইরান-ইরাক আট বছরের যূদ্ধ। এখন আবার উভয় দেশের মধ্যে তিক্ত সম্পর্ক নতুন রুপ নিয়েছে এবং গোটা বিশ্ব একটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাড়িয়েছে।

১৯৫১ সালে ইরানে গণতান্ত্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচতি হন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক। তিনি ইরানের তেলখনি জাতীয়করনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ইরানের পার্লামেন্টের অধিকাংশ সদস্যও তখন এর পক্ষে ছিলেন। ইরানের তেলখনি জাতীয়করন সিদ্ধান্তের কারনে ১৯৫৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃটেনের গোয়েন্দা সংস্থা মিলে ষড়যন্ত্র আর অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে উৎখাত করে। সেই থেকে শুরু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শত্রুতার।


গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ইরানের প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেককে সরিয়ে ক্ষমতায় বসানো হয় রাজতন্ত্রী এবং মার্কিন অনুগত রেজা শাহ পাহলবীকে। রেজা শাহের বিরুদ্ধে ইরানের ধর্ম নিরপেক্ষ ও ধর্মীয় সম্প্রদায় এক হয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। শেষ পর্যন্ত তারা শাহের উৎখাত করে।আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট রেজা শাহ পাহলবি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এ ঘটনার দুই সপ্তাপহ পরে নির্বাসন থেকে দেশে ফেরেন ইরানের কিংবদন্তী নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনী। তিনি ১ এপ্রিল ঘোষণা করেন ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান আর সে বিপ¦বের ধারাবাকিতা আজো বজায় রয়েছে ইরানে।
ইরানের বিক্ষোভকারীরা ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে অবরোধ করে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস। দূতাবাসে অবস্থিত কর্মকর্তাদের তারা এক বছর ২ মাস ১৯ দিন জিম্মি করে রাখে। ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে ৫২ জিম্মিকে মুক্তি দেয়। এদিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আরোহন করেন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। তেহরানে মার্কিন দূতাবাসের জিম্মি ঘটনা শুধু ইরান -যুক্তরাষ্ট্র আর মধ্যপ্রাচ্য নয় বরং গোটা বিশ্বজুড়ে সুদুর প্রসারী প্রভাব ফেলে। এ ঘটনার ধারাবাহিকতায় ইরান-ইরাক আট বছরব্যাপী যুদ্ধ চলে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের শোচনীয় পরাজয় ঘটে নির্বাচনে। ক্ষমতায় আসেন রোনাল্ড রিগ্যান। ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ আরোপের সূচনাও জিম্মি ঘটনার পর থেকে। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিল্পবের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের অভিযোগ ইসলামি বিপ্লবকে ভন্ডুল করার ষড়যন্ত্র করেছিল দেশটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখনো উৎখাত হওয়া রেজা শাহকে সমর্থন করেছিল। রেজা শাহ উৎখাত হওয়ার পর পালিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রে। ইরান তাকে বিচারের জন্য ফেরত চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করে।


রেজা শাহকে আশ্রয় দেয়ায় ইরান মার্কিন প্রশাসনকেও তার অপরাধের দোসর হিসেবে সাব্যস্ত করে। বিশেষ করে শাহের গোপন পুলিশ বাহিনী সাভাক জনগণের ওপর যে নির্যাতন করেছিলো তার অপরাধের জন্য শাহের বিচার করতে চেয়েছিল ইরান। এ ধরনের আরো অনেক অভিযোগে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর প্রতি অনুগত তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অবরোধ করে মার্কিন দূতাবাস। ইমাম খোমেনি ঘোষণা দেন তেহরানের মার্কিন দূতাবাস ইরান বিরোধী ষড়যন্ত্রের ঘাটি হিসেবে কাজ করছে।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস অবরোধকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন পেসিডেন্ট জিমি কার্টার আদেশ দেন সামরিক অভিযানের। জিম্মি উদ্ধার অভিযানের সময় হেলিকপ্টার বিদ্ধস্ত হয়ে সাত মার্কিনী নিহত হলে ব্যর্থ হয় এ অভিযানও। পদত্যাগ করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
অবরোধের সময় ছাত্ররা মার্কিন দূতাবাস থেকে এমন কিছু কাগজপত্র উদ্ধার করে। যাতে প্রমান পাওয়া যায় ১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে উৎখাতের জন্য মার্কিন এ দূতাবাস ষড়যন্ত্রের ঘাটি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে রেজা শাহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আশ্রয় নেয় মিশরে।
১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে ইরকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন অভিযান চালায় ইরানে। শুরু হয় ইরান-ইরাক আট বছরব্যাপী যুদ্ধ। ইরাক -ইরান যুদ্ধে সাদ্দামের পেছনে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বুটেন, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ। বেশিরভাগ আরব দেশ ছিলো সাদ্দামের সাথে। পশ্চিমা শক্তি এবং অনেক আরব দেশ তখনও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাদ্দামকে রাজনৈতিক ও অন্যান্য সহযোগিতা যুগিয়েছে। এ যুদ্ধ শুরুর এক পর্যায়ে ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জিম্মি ঘটনার অবসান ঘটনায় আলজেরিয়ার মধ্যস্থতায়।


ক্ষমতার দ্বিতীয় মেয়াদে রিগ্যান প্রশাসন গোপানে ইরানে অস্ত্র বিক্রি করে। লেবাননে হিজবুল্লাহ মিলিশিয়ারা মার্কিন জিম্মি উদ্ধারে ইরানের সহায়তার বিনিময়ে এ অস্ত্র পাঠান বলে অভিযোগ রয়েছে। ইরানে গোপনে অস্ত্র বিক্রির লাভের টাকা পাঠানো হয় নিকারাগুয়ায় সমাজতান্ত্রিক সরকার বিরোধী ডানপন্থী বিভিন্ন গ্রুপের কাছে। যারা কন্ট্রা নামে পরিচিত। প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের জন্য এটি একটি সঙ্কট তৈরি করে।
১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই উসাগরীয় এলাকায় মার্কিন একটি যুদ্ধ জাহাজ থেকে গুলি করে ভূপাতিত করা হয় ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমান। এতে প্রাণ হারায় ২৯০ যাত্রীর সকলে। যাত্রীদের অধিকাংশ ছিল সৌদীগামী হজ যাত্রী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানায় ভুলক্রমে এ ঘটনা ঘটেছে। ২০০২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ইরাক এবং উত্তর কোরিয়ার সাথে ইরানকে এক্সিস অব ইভল বা অশুভ চক্র হিসেবে আখ্যায়িত করে। বুশের এ বক্তব্য উভয় দেশের বৈরিতা তীব্র পর্যায়ে নিয়ে যায়।
এ বছর ইরান বিরোধী গোষ্ঠী অভিযোগ করে যে, ইরান পারমানবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে। এ জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্লান্টও স্থাপন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে ইরান গোপনে পারমানবিক বোমা তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে। এ নিয়ে দীর্ঘ এক দশক পর্যন্ত চলে কূটনৈতিক তৎপরতা। এক পর্যায়ে ইরান যুক্ত হয় জাতিসংঘের পারমানবিক পর্যবেক্ষক সংস্থার সাথে।
ইরান পারমানবিক কেন্দ্র পর্যবেক্ষনের জন্য আন্তর্জাতিক পরিদর্শক টিমের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। কিন্তু তারপরও জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন কয়েক দফায় ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ করে। তখন ইরানে ক্ষমতায় ছিল রক্ষনশীল প্রেসিডেন্ট আহমেদি নেজাদ। এ অবরোধের ফলে দুই বছরের মধ্যে ইরানী মুদ্রার মান ৭০ ভাগ পর্যন্ত হ্রাস পায়।


২০১৩ সালের ইরানে ক্ষমতায় আসেন মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানী। ক্ষমতায় আসার এক মাস পরে ওই বছর সেপ্টেম্বরে হাসান রুহানির সাথে টেলিফোনে কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ৩০ বছরের মধ্যে এটিই ছিল ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা বা কথাবার্তা।
দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতার পর ২০১৫ সালে ইরান পারমানবিক কার্যক্রম বিষয়ে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর সাথে দীর্ঘ মেয়াদী চুক্তি করতে রাজি হয়। এদেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া ফ্রান্স এবং জার্মানি। একত্রে এ দেশগুলো পি- ৫ প্লাস ওয়ান গ্রুপ নাম দেয়া হয় তখন। এ গ্রুপের সাথে ইরানের পারমানবিক চুক্তি অনুসারে ইরান তার অতি সংবেদনশীল পারমানবিক কর্মসূচী সীমিত করতে রাজি হয়। একই সাথে আন্তর্জাতিক পরিদর্শন দলকে ইরান পরিদর্শন দলকে ইরান পরিদর্শনের অনুমিত দেয়। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয়া হয়।


২০১৮ সালের মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ চুক্তি থেকে বের হয়ে আসেন। এরপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করে ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরান থেকে যে দেশ বা সংস্থা তেল ক্রয় করবে তাদের ওপরও একই ধরনের অবরোধ আরোপের ঘেষণা দেন ট্রাম্প। ফলে মন্দার কবলে পড়ে ইরানের অর্থনীতি।
দুই দেশের সম্পর্ক আরো অবনিত হয় ২০১৯ সালের মে মাসে। এ সময় ট্রাম্প ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরো কঠোর অবরোধ আরোপ করে। জবাবে ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ নিতে শুরু করে চাপ সৃষ্টির জন্য। মে এবং জুন মাসে ওমান উপসাগরে ছয়টি তেল ট্যাঙ্কারের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র এ জন্য ইরানকে দায়ী করে। ২০ জুন হরমুজ প্রণালীতে ই্রান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে এটি ছিল আন্তর্জাতিক পানিসীমায়। কিন্তু ইরানের দাবি এটি ছিল তাদের সীমানায়। অপর দিকে ইরানও পারমানবিক চুক্তি ছুড়ে ফেলে ফিরে যায় পারমানবিক কর্মসূচীতে।
এ বছর ৩ জানুয়ারি ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন হামলা চালিয়ে হত্যা করে ইরানের শীর্ষ কমান্ডার জেনারেল কাসেম সুলেমানিকে। আর এর মাধ্যমে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ তিক্ত সম্পর্ক আবার একটি ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি এসে দাড়িয়েছে।