কেন কাসেম সুলায়মানি মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ন ছিলেন

জেনারেল কাসেম সুলায়মানি - সংগৃহীত


ইরানের রেভিউলিশনারি গার্ড বাহিনীর কুদস ব্রিগেডের প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সুলায়মানি যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি জটিল অবস্থার দিকে যাচ্ছে। জেনারেল সুলাইমানিকে শুধু ইরানে নয় সারা বিশ্বে প্রভাবশালী সামরিক ব্যক্তিদের একজন হিসাবে বিবেচনা করা হতো। তার হত্যাকান্ড ইরানের ওপর বড় ধরনের আঘাত। এর প্রভাব পড়বে ইরাক, সিরিয়া এবং লেবাননের সংঘাতময় পরিস্থিতির ওপর। এসব দেশে ইরানপন্থী শিয়া মিলিশিয়া বাহিনীর ওপর ব্যাপক প্রভাব ছিলো সুলাইমানির। বলা যায় এগুলো সংগঠিত করার মুল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের রুপকার ছিলেন তিনি।


ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র কুদস ব্রিগেডের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সুলাইমানি ১৯৫৭ সালে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কেরমান শহরের উপকণ্ঠে জন্মগ্রহন করেন। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর বিজয়ের পর তিনি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে যোগদান করেন।


১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরান – ইরাক যুদ্ধে একটি ডিভিশনের নেতৃত্ব দেন। এ সময় তিনি ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের চোখে পড়েন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি ইরানের পূর্ব সীমান্তে মাদক চোরাচালান ও সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানে কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করে। ১৯৯৭ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী তাকে আইআরজিসি’র কুদস বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেন। এ সময় তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে সক্ষম। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে কাসেম সেুলায়মানি মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন।


মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ইরানের প্রভাব বাড়ানোর পেছনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন কাসেম সুলায়মানি। সুলায়মানির নেতৃত্বাধীন কুদস ফোর্স ইরানের বাইরে বিভিন্ন সময় যেসব সামরিক অভিযান চালিয়েছি তার মুল ব্যক্তি ছিলেন তিনি। ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসকে বিতাড়িত করার পেছনে সুলায়মানির সবচেয়ে বড় ভুমিকা ছিলো। ইরাকে শিয়া মিলিশিয়াদের সংগঠিত করা, সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পক্ষে যুদ্ধ করা এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ গেরিলাদের অন্যতম পরামর্শদাতা হিসাবে তাকে বিবেচনা করা হয়। তিনি তার কাজের জন্য সরাসরি ইরানের সুপ্রিম কমান্ডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কাছে জবাবদিহি করতেন। ইরানের জনগনের কাছে কাসেম সুলাইমানি একজন বীর হিসাবে পরিচিত। তার মৃত্যুর পর শুক্রবারে জুমার নামাজের পর তেহরান সহ গোটা ইরানে প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে।


২০২০ সালের ০৩ জানুয়ারি ইরাকের রাজধানী বাগদাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে দু’টি গাড়িতে এম কিউ -৯ রিপার ড্রোনের হামলায় নিহত হন কুদস ব্রিগেডের কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সুলায়মানি ও ইরাকের মিলিশিয়া বাহিনী হাশদ আশ-শাবির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড আবু মাহদি আল-মুহান্দিস। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের নীতি বাস্তবায়নে কাসেম সুলাইমানি সীমান্তের বাইরে বেশি তৎপর ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে অনেকগুলো দেশে যে যুদ্ধ চলছে, তাতে শিয়া মিলিশিয়া গ্রুপগুলো সংগঠিত করার মুল কারিগর হিসাবে মনে করা হয়। ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর সাথে সমন্বয় সাধনেও তার বড় ধরনের ভুমিকা আছে। এ জন্য তার শত্রুর অভাব ছিলো না। তাকে কয়েক দফা হত্যার চেষ্টা করা হয়। 


সুলায়মানির নেতৃত্বে আল কুদস ব্রিগেড ইরানের বাইরে সামরিক অভিযান, রাজনৈতিক বিভিন্ন পক্ষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন ও মেরুকন, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে বড় ধরনের সামর্থ্য অর্জন করে। তাকে অনেকে দুনিয়ার এক নম্বর জেনারেল হিসাবে অভিহিত করতো। ২০০৫ সালে ইরাকে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী নুর আল মালিকী ও ইব্রাহিম আল জাফরির ওপর ব্যাপক প্রভাব রাখতে সক্ষম হন। ইরাক ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ছায়া যুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিনত হয়। ২০১১ সালে সিরিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সুলায়মানি ইরাক থেকে কুদস শিয়া মিলিশিয়াদের একটি অংশকে আসাদ সরকারের পক্ষে যুদ্ধ অংশ নিতে পাঠান। আইএসএলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তার পরিকল্পনায় হাশদ আল শাবি বা পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্স গঠন করা হয়। এই মিলিশিয়া বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার আবু মাহাদি আল মাহান্দিস যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত হয়।


যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও আরব দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গত ২০ বছরে তাকে একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করে। বহুবার তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। ২০০২ সালে বিমান দূর্ঘটনায় মারা গেছেন বলে প্রচারিত হয়। ২০১২ সালে সিরিয়ার আলোপ্পোয় বোমা হামলায় তার নিহত হওয়ার খবর প্রচার হয়। গত আগস্টে সিরিয়ায় কুদস ঘাটিতে ড্রোন হামলা চালায়। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেন সুলায়মানিকে হত্যার জন্য তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ অক্টোবরে ইরানের কর্মকর্তারা জানান সুলায়মানিকে হত্যায় ইসরাইল ও আরব একটি গোয়েন্দা সংস্থার চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়া হয়েছে।


কাসেম সুলায়মানির মৃত্যু নি:সন্দেহে ইরানের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত। ইরানে সাধারন মানুষ জুম্মার নামাজের সারা দেশে শোক মিছিল বের করে। মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশে ইরানের মিত্র সংগঠনগুলো প্রতিশোধ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইরাকের পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্স যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্র সব নাগরিকদের সরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে।


মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া বাহিনী রয়েছে। কাসেম সুলায়মানির মৃত্যুর পর শুধু ইরানের নেতার নন। এসব মিলিশিয়া গোষ্টীর নেতারা প্রতিশোধ গ্রহনের ঘোষণা দিয়েছেন। ইরাকের শিয়া নেতা মুকতাদা আল সদর মাহদি আর্মিকে আবার পুনরুজ্জীবনের ঘোষণা দিয়েছেন। এই বাহিনী তৎপর হলে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়ে যেতে পারে। লেবাননে হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ প্রতিশোধ নেয়ার কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরাইলের সবচেয়ে বড় হুমকি হিজবুল্লাহ। ইয়েমেন থেকে হুথি গেরিলাদের টার্গেট হতে পারে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত। বাহরাইনে ইরান বড় ধরনের তৎপরতা চালানোর সক্ষমতা রাখে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌ বহরের সেন্ট্রাল কমান্ড। তবে ইরান এই মুহুর্তে বড় ধরনের কোনো প্রতিশোধ আক্রমনে নাও যেতে পারে। কাশেম সুলায়মানির অবর্তমানে মিলিশিয়া গোষ্টীগুলোকে সংগঠিত করা এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ন।


ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি বলেছেন, যেসব অপরাধী তাদের নোংরা হাত দিয়ে জেনারেল সুলায়মানির রক্ত ঝরিয়েছে তাদের জন্য কঠোর প্রতিশোধ অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন শহীদ সুলায়মানি প্রতিরোধ আন্দোলনের একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন বলে এই আন্দোলনের নিবেদিতপ্রান প্রতিটি কর্মী তাঁর মত্যুর বদলা নিতে প্রস্তুত রয়েছেন। কাজেই সকল বন্ধু ও শত্রুর জেনে রাখা উচিত জেনারেল সুলায়মানির মতৃ্যুর পর দ্বিগুণ উৎসাহে প্রতিরোধ আন্দোলন এগিয়ে যাবে এবং এই আন্দোলনের বিজয় অনিবার্য।


ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ বলেছেন, উগ্র জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া জেনারেল কাসেম সুলায়মানিকে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে আমেরিকা। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন একটি ভয়ঙ্কর, কান্ডজ্ঞানহীন ও উত্তেজনা সৃষ্টিকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। আমেরিকার এই ঔদ্ধত্বপূর্ণ ও হঠকারী হামলার যেকোনো পরিণতির দায় ওয়াশিংটনকে বহন করতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে ইরাকে কুদস ব্রিগেডের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সুলায়মানিকে হত্যা করা হয় বলে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের বিবৃতি তা উল্লেখ করা হয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের মধ্যে এই হত্যাকান্ড নিয়ে মতভেদ লক্ষ্য করা গেছে। এর প্রভাব মারাত্নক হতে পারে বলে সর্তক করা হয়েছে। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেনে, ট্রাম্পের এমন বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত আমাদের আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে করে অনেক প্রাণ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। খরচ হবে কোটি কোটি ডলার। ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এই অসীম যুদ্ধ শেষ করবেন। কিন্তু তার এই পদক্ষেপ তার পরিপন্থী। স্যান্ডার্স বলেন, ইরাকে সাড়ে চার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। হাজার হাজার সেনা আহত হয়েছে। কোটি কোটি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে।