তুরস্ক -লিবিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ভুমধ্যসাগরে উত্তেজনা

জিএনএ সরকার প্রধান ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট - সংগৃহীত

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে গত ২৭ নভেম্বর দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ান এবং লিবিয়ার গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকর্ডের (জিএনএ) প্রধান ফায়েজ আল-সারাজের মধ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এখানে বলে রাখা ভালো যে লিবিয়ার একাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে সরকারবিরোধীরা। আর রাজধানী ত্রিপলিতে বসে দেশের আরেক অংশ শাসন করছে জিএনএ সরকার। এ সরকারই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

আমরা যেদিনের কথা বলছি সেদিন তুরস্ক ও লিবিয়া দু' দেশের সরকার একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। সমঝোতাটি হয় ভূমধ্যসাগরের জলসীমায় নিজেদের সীমানা চিহ্নিত করা নিয়ে। একই বৈঠকে নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতা নিয়েও দু' দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়।

তুর্কী সংসদে ৫ ডিসেম্বর  সমঝোতা স্মারকটি অনুমোদিত হয়। ৭ দিসেম্বর অফিসিয়াল গেজেটে  সমঝোতা স্মারকটি প্রকাশ করা হয়। এর মাধ্যমে তুরস্ক  সমঝোতাটি বাস্তবায়ন শুরু করে।  সমঝোতা স্মারকের একটি কপি জাতিসংঘেও পাঠায় তুরস্ক।

এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। দু'টি স্বাধীন দেশের মধ্যে জলসীমা, সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক  সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত তো হতেই পারে। কিন্তু এরপর যা হলো তা বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। গ্রীস, সাইপ্রাস ও মিশর যেন একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তারা এ সমঝোতার তীব্র সমালোচনা করে বললো, এ ধরনের  সমঝোতা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং ভৌগোলিকভাবে অযৌক্তিক। কারণ, এতে ক্রীট আইল্যান্ডকে তাদের সীমানায় দেখানো হয়নি। শুধু এসব বলেই থেমে যায়নি গ্রীস। চরম ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে তারা লিবিয়ার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারও করে বসলো। গ্রীসের সাথে সুর মেলালো ইসরাইল। তারা বললো, গ্রীসের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন আছে।

মজার ব্যাপার হলো, তুরস্ক-লিবিয়া সমঝোতায় মিশরের কিন্তু কোনো স্বার্থহানি ঘটেনি। তাহলে তারা কেন এ  সমঝোতার বিপক্ষে দাঁড়ালো? এ প্রশ্নের জবাব একটু পরে দিচ্ছি, তার আগে শোনা যাক তাদের বক্তব্য কী। তাদের বয়ান হলো, লিবিয়ান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালে সম্পাদিত স্কিরাত চুক্তির ৮ নাম্বার ধারা অনুযায়ী তুরস্ক-লিবিয়া সমঝোতা মেনে নেয়া যায় না। কেননা ওই চুক্তিতে বলা আছে, ''লিবিয়ার সরকার বা মন্ত্রীসভা কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করতে পারবে না।''

গ্রীস ও মিশরের সমালোচনার জবাবে তুরস্ক ও লিবিয়া দু'দেশই বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারেই দু'টি সার্বভৌম দেশ নিজেদের মধ্যে চুক্তি করেছে। এর মধ্যে অবৈধ কিছু থাকতে পারে না। লিবিয়ার স্টেট কাউন্সিলের প্রধান আরো কড়া ভাষায় বলেছেন, গ্রীসের পদক্ষেপ হচ্ছে ''কূটনৈতিক ঠগবাজি।'' তারা যদি আমাদের সমঝোতা মানতে না চায় তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় নেয়ার অধিকার তাদের আছে। তারা সেই ২০০৪ সাল থেকে আমাদের সাথে বিষয়টি নিয়ে সমঝোতা না-করে বরং সময়ক্ষেপণ করে আসছে। এতক্ষণ আমরা তুরস্ক-লিবিয়া সমঝোতা স্মারকের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বললাম। এবার দেখা যাক, এ সমঝোতার প্রয়োজনীয়তাটা কোথায়।

তুর্কী কর্মকর্তাদের মতে, ভূমধ্যসাগরের জলভাগে নিজ নিজ সীমানা স্থির করার লক্ষ্যে তুরস্ক সেই ২০০৯ সাল থেকে লিবিয়া সরকারের সাথে আলোচনা চালিয়ে আসছে। কাজেই এটা কারো মনে করার কারণ নেই যে, কোনো আঞ্চলিক শক্তির ইশারায় কিংবা পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার সাম্প্রতিক কোন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় এ সমঝোতা হয়েছে।

তুর্কী কর্মকর্তাদের বক্তব্যের অর্থ অবশ্য এই নয় যে, ওই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক বিন্যাস কিংবা কয়েক বছর ধরে চলে আসা মেরুকরণের ওপর তুরস্ক-লিবিয়া সমঝোতা স্মারকের কোনো প্রভাব পড়বে না। এ সমঝোতা স্মারকের মধ্য দিয়ে দু'দেশ ১৮ দশমিক ছয় মাইলের একটি কন্টিনেন্টাল শেলফ এবং এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোনের সীমানা প্রতিষ্ঠা করেছে। 

তুরস্ক ও লিবিয়া উভয় দেশের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা,গ্রীস ও সাইপ্রাস যখন সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো দেশের স্বার্থের তোয়াক্কা না-করে এবং তাদের সাথে কোনো রকম আলোচনাই না-করে অন্য দেশের সাথে মিলে একের পর এক একতরফা পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে, তখন ভূমধ্যসাগরে নিজেদের জলসীমার অধিকার সুরক্ষায় তুরস্ক ও লিবিয়ার এ সমঝোতা খুবই প্রয়োজন ছিল।

তাদের একতরফা পদক্ষেপ প্রসঙ্গে গ্রীক সাইপ্রাসের একটি পদক্ষেপের কথাই ধরা যাক। আধা-স্বাধীন এ দেশটি তুরস্ক ও টার্কিশ সাইপ্রিয়টদের অধিকারের কথা একটুও বিবেচনায় না নিয়ে মিশর, লেবানন ও ইসরাইলের সাথে একতরফা চুক্তি করে বসে। একই কাজ করে গ্রীসও। তারা দু'দেশই, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে স্বার্থ আছে এমন দেশগুলোকে সাথে নিয়ে তুরস্ককে একঘরে করে ফেলার লক্ষ্যে কঠিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

তুরস্ক-লিবিয়া সমঝোতা স্মারকের কারণে গ্রীসের এভাবে রেগে আগুন হয়ে যাওয়ার একটা বড় কারণ হলো, এর ফলে প্রায় ৩৯ হাজার হাজার বর্গকিলমিটার ই ই জেড এলাকার ওপর লিবিয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যে এলাকাটিকে গ্রীস এতোদিন অন্যায়ভাবে নিজের বলে দাবি করে আসছিল। গ্রীস চাচ্ছিল লিবিয়ার অভ্যন্তরীন অস্থিরতার সুযোগে এমন একটি এলাকা দখল করে নিতে, যা আয়তনে লেবাননের মতো চারটি দেশের সমান।

এ ছাড়াও চুক্তিটি পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ''যা হবার হয়ে গেছে, এটাই চূড়ান্ত'' - এধরনের পরিস্থিতি চলতে দেবে না, বরং একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছতে এবং একই সাথে কয়েকটি দেশের দাবি আছে এমন স্থানের সম্পদের সুষম বণ্টনের লক্ষ্যে অন্যান্য দেশকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করবে।

এ বিষয়ে তুরস্কের অবস্থান সবসময় পরিষ্কার। তারা সবসময় আলোচনার জন্য প্রস্তুত থেকেছে এবং অন্যদেরও বারবার আলোচনার টেবিলে ডেকেছে, যাতে একটি ন্যায়ভিত্তিক ঐকমত্যে উপনীত হওয়া যায়। কিন্তু তুরস্ক যতই আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনার আহবান জানাক, গ্রীস ও গ্রীক সাইপ্রাসের সকল চেষ্টা কেবল একতরফা পদক্ষেপ নেয়ার এবং সব দোষ তুরস্কের ঘাড়ে চাপানোর দিকে।

এই চেষ্টা থেকেই এবারও শুরু হয়েছে তুরস্ক-লিবিয়া চুক্তির পর থেকে। এ কাজে গ্রীস ও গ্রীক সাইপ্রাসের সাথে জুটেছে ইসরাইল ও মিশর। তারা পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তুরস্ককে একঘরে করে ফেলতে এবং ওই অঞ্চলের হাইড্রোকার্বন সম্পদের অধিকার থেকে দেশটিকে বঞ্চিত করতে চায়। নিজেদের দাবি সংহত করতে এ দেশগুলো এমনকি তুরস্ককে বাদ দিয়েই ইস্টার্ন মেডিটারেনিয়ান গ্যাস ফোরাম নামে একটি আঞ্চলিক প্ল্যাটফরম পর্যন্ত গঠন করে ফেলেছে।

কিন্তু তাদের আশার গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছে তুরস্ক-লিবিয়া চুক্তি। এ চুক্তির ফলে তুরস্কের সাথে কোনো রকম বোঝাপড়া না করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইউরোপে গ্যাস রফতানির জন্য কোনো পাইপলাইন বানানো ওই দেশগুলোর পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে।

শুরুতেই আমরা বলেছি যে  তুরস্ক-লিবিয়া চুক্তির ফলে মিসরের কোনো স্বার্থহানি ঘটছে না। সম্প্রতি রোমে এক বক্তৃতায় কথাটা স্বীকারও করেছেন মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু তারপরও দেশটি জোট বেঁধেছে গ্রীসের সাথে। মজার ব্যাপার হলো, মিশর সরকারের এ অবস্থান দেশের স্বার্থে নয়, দেশটির স্বৈরাচারী শাসক আব্দল ফত্তাহ আল সিসি-র একান্ত ব্যক্তিগত স্বার্থে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এক সমঝোতা চুক্তির বিবরণে জানা যায়,  গ্রীস ও গ্রীক সাইপ্রাসের কাছে মিশর তার স্বার্থ বিকিয়ে দেবে আর তার বিনিময়ে ওই দু' দেশ মিশরের শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন পেতে সাহায্য করবে।

তুরস্ক-লিবিয়া চুক্তির বিপক্ষে মিশরের আরো একটি যুক্তি হলো, স্কিরাত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ত্রিপলির জিএনএ সরকার কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে পারে ন। করলেও তা বৈধ হবে না। সে হিসেবে তুরস্ক-লিবিয়া চুক্তিটিও বৈধ নয়।

এর বিপরীতে তুরস্কের যুক্তি হলো, লিবিয়ার জিএনএ সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সরকার। এর বিরুদ্ধে লড়াই করছে জঙ্গি নেতা জেনারেল খলিফা হাফতার। তাকে রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা দিয়ে মিশর কি অবৈধ কাজ করছে না!

আসলে ব্যাপার হলো, ত্রিপলি সরকারের সাথে তুরস্কের যে সামরিক ও নিরাপত্তা চুক্তিটি হয়েছে তাতে করে জঙ্গি নেতা হাফতারের বিজয় প্রায়-অসম্ভব হয়ে উঠেছে, যদিও তার পেছনে আছে মিশর, আরব আমীরাত, ফ্রান্স এবং আরো কয়েকটি দেশ। জঙ্গি নেতার প্রতি তাদের এ সমর্থনকে তুরস্ক বিবেচনা করছে ''ত্রিপলি সরকারের আত্মরক্ষার অধিকারকে অস্বীকার করা'' হিসাবে। এ অবস্থায় ত্রিপলিভিত্তিক জি এনএ সরকারকে সমর্থন দেয়াকেই ন্যায়সঙ্গত মনে করছে তুরস্ক। এ ভাবনা থেকেই তারা ওই সরকারের সাথে নিরাপত্তা ও সামরিক চুক্তি করেছে। এ চুক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ত্রিপলির জিএনএ সরকারের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে আর তুরস্ককে দিয়েছে ওই সরকারের পক্ষে বৈধ পন্থায় সব কিছু করার সুযোগ। এর ফলে ত্রিপলিকে নিয়ে মিশরের যে নিজস্ব পরিকল্পনা ছিল, তা ভেস্তে গেছে।

আর তাই গ্রীস ও গ্রীক সাইপ্রিয়টের সাথে জোট বেঁধেছে মিশর, সাথে দোসর জুটেছে ইসরাইল। সবারই মনে-মুখে এক কথা : তুরস্ককে ঠেকাও!!