মধ্যপ্রাচ্যে কেন বাড়ছে রশিয়ার প্রভাব

পুতিন ও মোহাম্মদ বিন সালমান - সংগৃহীত


পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোতে রাশিয়ার প্রভাব বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যর পরস্পর বিরোধী দেশগুলোর সাথে রাশিয়ার এখন ঘনিষ্ট সর্ম্পক। কয়েক বছর আগে যা ছিলো অবিশ্বাস্য। পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী তিন দেশ ইরান, সৌদি আরব ও তুরস্কের সাথে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখে চলছে রাশিয়া। আজ আমরা পশ্চিম এশিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করবো। এ মাসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছেন। ইরান ও তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠক হয়েছে কয়েক দফা।


দীর্ঘ এক যুগ পর যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব সফর করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সফরে রাশিয়ার সাথে সৌদি আরবের ২০টির মতো চুক্তি সই হয়। এর মধ্যে জ্বালানী নিরাপত্তা বিষয়ে উভয় দেশ গুরুত্বপূর্ন কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহন করে বলে জানানো হয়। রাশিয়া ও সৌদি আরব জ্বালানী, পেট্রোকেমিক্যাল, পরিবহন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে।


সৌদি আরবের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে দুদেশের নেতা কথা বলেছেন। পুতিন এমন এক সময় রিয়াদ সফর করেন যখন যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত ৩ হাজার সৈন্য পাঠানোর ঘোষণা দেয়। পুতিনের সফরের আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৭ সালে মস্কো সফর করেন। এবারের সফরের আগে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে পুতিন বলেন, সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে তার চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। তার ভাষায়, ‘সৌদি আরবকে আমরা একটি বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করি। দেশটির রাজা ও যুবরাজ উভয়ের সঙ্গেই আমার চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে।’ সৌদি আরবের নীতিতে কিছুটা পরিবর্তনের আভাষ পাওয়া যাচ্ছে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান চীন ও রাশিয়ার সাথে সর্ম্পক ঘনিষ্ট করার দিকে নজর দিচ্ছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন পুতিনের সৌদি আরব সফরে ইরান-সৌদি সর্ম্পক নিয়ে আলোচনা হয়ে থাকতে পারে।


সৌদি আরবের আরেক ঘনিষ্ট মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেন পুতিন। দুদেশ জ্বালানী সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেন। সৌদি আরব ও আরব আমিরাত সফরের মধ্যদিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার অবস্থান আরো শক্তিশালী হলো বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। ইরানের সবচেয়ে ঘনিষ্ট মিত্র রাশিয়া। দেশটির ওপর পশ্চিমা বিশ্বের বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ আরোপের পর থেকে রাশিয়া ইরানের পাশে দাড়িয়েছে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার যে কোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে রাশিয়া।


ইরানের সাথে রাশিয়ার সর্ম্পক বহুমাত্রিক। অনেক ক্ষেত্রে দুদেশের মধ্যপ্রাচ্য নীতি অনেকটা সমান্তরাল গতিতে এগিয়েছে। এই মিত্রতা আরো ঘনিষ্ট হয়েছে সিরিয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। কারন ইরানের ঘনিষ্ট মিত্র আসাদ সরকারকে টিকিয়ে দিয়েছে রাশিয়া। যা মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। একই সাথে এ অঞ্চলে বেড়েছে ইরানের প্রভাব। কারন লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকে এখন ইরানের বন্ধুরা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রন করছে। ইরানের ওপর পশ্চিমা দেশগুলো যখন একের পর এক অবরোধ আরোপ করেছে তখন রাশিয়া ইরানের সাথে বানিজ্যিক সর্ম্পক বজায় রেখেছে। প্রকৃতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার পা রাখার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে ইরান।


পারস্য সাম্রাজ্যের সাথে রুশ সাম্রাজ্যের ঘনিষ্টতা অনেক পুরানো। মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া জনগোষ্টীর ওপর ইরানের রয়েছে একচ্ছত্র প্রভাব। সিরিয়ার আসাদ সরকারের পাশে দাড়নোর মধ্যদিয়ে ভুমধ্যসাগরে রাশিয়ার উপস্থিতি যেমন নিশ্চিত হয়েছে তেমনি ইরানের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরে রাশিয়া তার প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। ফলে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর পক্ষে এখন আর রাশিয়াকে উপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। পারস্য উপসাগরে কয়েকটি তেল ট্যাংকারে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের মুখোমুখি অবস্থানের সময় ইরানের পক্ষে রাশিয়ার অবস্থান ছিলো খুবই স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প ইরানে হামলার নির্দেশ দেয়ার পরও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়েছে।


ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পেছনে রাশিয়ার বড় ধরনের ভুমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। ইরান একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন ভুপাতিত করার যে ঘটনা ঘটেছে তাতে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা মনে করেন রাশিয়ার প্রযুক্তিহত সহায়তা নিয়ে ইরান এ ধরনের সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। ইরানের দুরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবস্থার সাথে রাশিয়ার সর্ম্পক আছে বলে মনে করা হয়।


ইরানের সাথে রাশিয়ার সর্ম্পক শুধু পশ্চিম এশিয়া নয় মধ্যএশিয়া ও কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে ইরানের গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা রয়েছে। মধ্যএশিয়া কেন্দ্রিক জ্বালানী সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম অংশীধার ইরান। ফলে ইরানের সাথে রাশিয়ার সর্ম্পক একান্তই কৌশলগত। মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার অবস্থান সংহত করতে ইরান গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করছে।


পশ্চিম এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে রাশিয়া ও তুরস্ক সর্ম্পকে। ন্যাটো সদস্য হিসাবে তুরস্কের সাথে রাশিয়ার সর্ম্পক কখনো বন্ধুত্বপূর্ন ছিলো না। এখন ন্যাটো সদস্য দেশটি হয়েছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার অন্যতম গ্রাহক। এটি প্রেসিডেন্ট হিসাবে সম্ভবত পুতিনের সবচেয়ে বড় সাফল্যর একটি। পরিস্থিতি এতটাই বদলে গেছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এখন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বন্ধু। এই বন্ধুত্বে কে লাভবান হচ্ছে রাশিয়া না তুরস্ক?


রাশিয়ার সাথে তুরস্কের ঘনিষ্টতা দিন দিন বাড়ছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুদেশের সর্ম্পক নতুন মাত্রায় পৌছেছে। এর সর্বশেষ উদহারন তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে নিরাপদ অঞ্চল গঠনে রাশিয়ার সমর্থন। কুর্দি বিদ্রোহীদের হটিয়ে ৩০ কিলোমিটারের দীর্ঘ একটি করিডোর প্রতিষ্টা করেছে তুরস্ক। যেখানে সিরিয়ান শরনার্থীদের পুর্নবাসন করা হবে। এই নিরাপদ অঞ্চলে যাতে কুর্দিরা প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য সীমান্তে রাশিয়ার সৈন্য আর তুরস্কের সৈন্যরা এক সাথে যৌথ টহল দেবে। আসলে সিরিয়ার ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রনের মধ্যদিয়ে এ অঞ্চলের দৃশ্যপট অনেকটা বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা অনেক কমে এসেছে। তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ট মিত্র হওয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখার জন্য রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্টতা বাড়াচ্ছে। সিরিয়ায় একটি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য রাশিয়া-ইরান ও তুরস্ক এক সাথে কাজ করছে।


শুধু সিরিয়া ইস্যুতে নয় দুদেশের মধ্যে বাড়ছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। ইতোমধ্যে রাশিয়া থেকে এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েছে তুরস্ক। আরো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ব্যাপারে দুদেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। স্বাভাবিক ভাবে তুরস্কের এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো ভালো ভাবে গ্রহন করেনি। তুরস্কের ওপর নানা ভাবে চাপ প্রয়োগ করা হলেও এরদোগান ছিলেন অনঢ় অবস্থানে। এর অন্যতম কারন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশ গুলো তুরস্কে আভ্যন্তরিন বিষয়ে কলকাঠি নাড়ার চেষ্টা করছে। এর সাথে এরদোগানকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রক্রিয়াও ছিলো। শেষ পর্যন্ত কৌশলগত সর্ম্পকের পুরানো ছক বদলে গেছে। ন্যাটো সদস্য দেশ হয়ে উঠেছে রাশিয়ার ঘনিষ্ট মিত্র। এতে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার অবস্থান আরো সংহত হয়েছে। অপরদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে তুরস্কের দরকষাকষির সক্ষমতা বেড়েছে। একই সাথে দেশটির ভূখন্ডগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। এখন রাশিয়ার মধ্যস্থততায় সিরিয়ার সাথে একটি সমঝোতায় আসতে পারলে দেশটি অবস্থান আরো শক্ত হবে। কারন তুরস্কে যে ৩৬ লাখ শরনার্থী আশ্রয় নিয়েছে তাদের ফেরত পাঠানো তুরস্কের প্রধান চ্যালেঞ্জ।


ইরান ও তুরস্কের মতো প্রভাবশালী দেশ রাশিয়ার মিত্র হওয়ার কারনে মধ্যপ্রাচ্যে দেশটি অপ্রতিদ্বন্দ্বি শক্তি হিসাবে আর্বিভুত হয়েছে। ফলে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নীতিতে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। যা আগামি দিনে আরো দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে। পুতিনের সৌদি আরব ও আরব আমিরাত সফরের মধ্যদিয়ে এ অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আসলে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রভাব এ অঞ্চলে এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করছে।