টিকে গেছে কাতার, পেছনের কারিগর কে

কাতারের রাজধানী দোহা - সংগৃহীত


আরব উপদ্বীপ থেকে এক চিলতে ভূমি নেমে গেছে পারস্য উপসাগরে। নাম কাতার। আয়তনে সামান্য। ১১ হাজার ৫৮১ বর্গকিলোমিটার, বাংলাদেশের তুলনায় ১৩ গুণ ছোট। লোকের বসতিও কম। ২০১৭ সালের হিসাবে ২৬ লাখ ৪১ হাজার বাসিন্দা থাকেন দেশটিতে। এদের মধ্যে মাত্র লাখ তিনেক কাতারের নাগরিক। বাকিরা প্রবাসী। বাংলাদেশ থেকেও অনেকে কাজ করতে যান সেখানে।


একটা সময় কাতারে লোকের সংখ্যা আরো কম ছিলো। অনেকটা বাসের অযোগ্য ছিলো এই মরু এলাকা। জেলেদের বাস ছিলো এখানে। উপসাগর থেকে মাছ ধরে বিক্রি করে পেট চলতো। বৃটেন থেকে দেশটি স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালে, বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়েছিলো। তখন কাতার ছিলো বৃটিশ উপনিবেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গরিব।
কিন্তু এখন দিন পাল্টে গেছে। জেলেদের ওই মরু পরিণত হয়েছে আলীবাবার গুহায়। কাতার এখন পৃথিবীর ধনী দেশের তালিকায় প্রথম সারিতে। কেবল ধন নয়, মানেও এরা বড়। বিশ্বরাজনীতিতে তুলে ধরেছে নিজেদের আলাদা পরিচয়। কাতার থেকে পরিচালিত হচ্ছে বিশ্ব তোলপাড় করা গণমাধ্যম আল জাজিরা।


কিভাবে হলো এতো উন্নতি?
উন্নতির পেছনে বড় ভ’মিকা প্রাকৃতিক সম্পদের। তবে কেবল সম্পদ থাকলেই হয় না। এর যুৎসই ব্যবহারও জানতে হয়। প্রাকৃতিক সম্পদ অফুরান নয়। ফুরিয়ে যেতে পারে। ধ্বংশ হতে পারে। তখন কি আবার দারিদ্রের দিকে নামতে থাকবে কাতার?


সম্ভবত না। কারণ, এর মধ্যে বিকল্প পথ তৈরি করে নিয়েছে দেশটি। বিশ্বের আনাচে-কানাচে জালের মতো ছড়িয়ে দিয়েছে ব্যবসা। ব্যবসাগুলো ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। সেইসব অর্থ জড়ো হচ্ছে ‘আলিবাবার গুহা’য়। গুহা থেকে আবার যাচ্ছে বিনিয়োগের মাঠে। আবার গুহায়। এই করতে করতে কাতার এখন ব্যবসার বড় জায়গা দখল করে নিয়েছে। তাছাড়া রাজনীতিতেও দেশটির অবস্থান পোক্ত। আয়তনে ছোট বলে কেউ চাইলেই কোনঠাসা করতে পারবে না। সৌদির নেতৃত্বে আরব উপদ্বীপের প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ অবরোধ দিয়েও কাতারকে বশ মানাতে পারেনি। অবরোধের পর রাজনীতিতে দেশটির অবস্থান আরো পোক্ত হয়েছে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে কাতারের আমিরের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। কিছু কিছু সিদ্ধান্তের বেলায় কাতারের দিকে তাকিয়ে থাকেন অনেক মুসলিম নেতা।


কাতারের এই আলাদা পরিচয় কিভাবে গড়ে উঠলো?
নিজের মতো চলতে চাইলেই আলাদা পরিচয় গড়ে উঠে। সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান এবং উগ্র যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের ‘বড়ভাইসুলভ’ আচরণে প্রশ্রয় দেয়নি কাতার। প্রশ্রয় না দিয়ে নিজের মতো করেই টিকে গেছে দেশটি।
কাতারের এই টিকে যাওয়ার পেছনের কারিগর কে?
পেছনের গল্পটা পিতা-পুত্রের। সাহসি পিতা পথ তৈরি করেছেন। সেই পথ ধরে হাঁটছেন তার পুত্র।
পিতার নাম শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানি। পুত্র শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি।


তাদের গল্পটা বলতে গেলে একটু আগে থেকে শুরু করতে হয়- স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই কাতার নিজের মতো করে চলতে চাইলো। কিন্তু পদে পদে নাক গলাতে শুরু করলো সৌদি আরব, আরব আমিরাত। এ নিয়ে বরাবরই বিরোধ লেগে থাকতো। উপদ্বীপে কাতার সবসময়ই ছিলো অবাধ্য প্রতিবেশি। তবে অবাধ্যতা আগে কখনো দূর পর্যন্ত গড়ায়নি। বলা যায় সৌদি বাদশাহদের মতামত নিয়েই চলতে হতো দেশটিকে।


মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর মতো কাতারের বালির নিচেও লুকিয়ে ছিলো তেল। ১৯৪০ সালে তেলের খনি আবিষ্কার হয়। কিন্তু ২০ বছর পর তেল প্রায় শেষ হয়ে যায়। এই কয়টা বছরে গরিব কাতার কিছুটা উন্নত হলেও পরে অবনতির দিকে নামতে থাকে। তবে সত্তরের দশকে আবিষ্কার হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র ‘দ্য নর্থ ফিল্ড’। কিন্তু তখন গ্যাসের ব্যবহার এতোটা ছিলো না। কেবল পাইপ দিয়েই গ্যাস সরবরাহ করা হতো। আর ছোট ওই দেশে গ্যাসচালিত বড় কোনো কারখানাও ছিলো না। তাই সেই গ্যাসে তেমন আগ্রহ দেখালো না উত্তোলকরা। সরকারেরও সামর্থ্য নেই। সুতরাং গ্যাসের আশা বাদ। কাতার চলতে থাকলো ধুঁকে ধুঁকে।তখন ১৯৯৫ সাল। কাতারের আমির শেখ খলিফা বিন হামাদ আল-থানি। ২৩ বছর ধরে শাসন করছেন তিনি। এবার বাধ সাধলেন তার ছেলে। বাবার ক্ষমতা কেড়ে নিলেন শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানি।


তিনি আবির্ভূত হলেন কাতারের রাজনীতির নায়ক হিসেবে। এসেই শুরু করলেন বদলে দেওয়ার কাজ। বদলে দিতে হলে প্রথমে অর্থনৈতিক শক্তি দরকার। এই শক্তির অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে মাটির নিচে। সুতরাং খনির গ্যাস কাজে লাগাতে হবে।


হামাদ বিন খলিফা আল-থানি গ্যাস তরলিকরণ গবেষণায় বিনিয়োগ করতে থাকলেন। এর পর গ্যাস ব্যবহারের জন্য আর পাইপের দরকার হলো না। তরল গ্যাস রফতানি হতে শুরু করলো জাহাজে করে। কাতার গ্যাস তরলিকরণে এতোটাই বিনিয়োগ করেছে যে, তারা এর উৎপাদন খরচ আমেরিকার চাইতেও চারগুণ কমিয়ে এনেছে। কাতারের ভাগ্য পরিবর্তন শুরু হলো। হামাদ বিন খলিফা আল-থানি ‘গুহা’র দরজা খুলে দিলেন। সম্পদ জমতে থাকলো আলিবাবার গুহায়। কিন্তু বেশি সম্পদ বিপদ ডেকে আনে। চল্লিশ চোর আশিটি চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে সম্পদের দিকে। তাই সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য চাই বুদ্ধি। খলিফা আল-থানি বুদ্ধির জন্য একটা বাকসো খুলে বসলেন। বুদ্ধি নিতে শুরু করলেন পৃথিবীর তাবড় তাবড় বুদ্ধিওয়ালাদের থেকে। তিনি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেন। খুললেন ‘কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথোরিটি’।


এই বাকসো থেকে সারা পৃথিবীতে লাভজনক ব্যবসায় বিনিয়োগ হতে শুরু করলো। বিদেশে রিয়েল অ্যাস্টেট, হোটেল, অফিস, অ্যাপার্টমেন্টসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করলো কাতার। রাশিয়া সরকারের তেল কোম্পানিতেও দেশটির বিনিয়োগ আছে। দেশের ভেতরটাও সাজাতে শুরু করলো স্বপ্নের মতো করে। যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিক হলো। বিলাসবহুল বিপণিবিতান হলো।


বুদ্ধির বাকসো থেকে আসা একটি ‘বুদ্ধি’ বিনিয়োগের। অন্যটি রাজনীতির। হামাদ আল খলিফা আল থানি ঠিক করলেন, বিশ্বরাজনীতিতেও কাতারের পরিচয় তুলে ধরতে হবে। তার বাবা ছিলেন সৌদি আরবের একরকম পুতুল। পুতুল হয়ে বেশিদিন টিকে থাকা যায় না। সম্পদের জন্য হামলে পড়তে পারে প্রতিবেশি যে কেউ। বুদ্ধির বাকসোতে বুদ্ধি আসতে শুরু করলো মুসলিম বিশ্বের অন্য নেতাদের কাছ থেকেও। মিশরের রাজনৈতিক দল ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর সঙ্গে সখ্যতা বাড়তে শুরু করলো কাতারের। মিশর ছাড়াও অন্যান্য কয়েকটি দেশের মুসলিম নেতারা নিয়মিত যাতায়াত করতে থাকলেন দেশটিতে।


আরব উপদ্বীপের ওই বুদ্ধির বাকসো থেকে ছড়িয়ে পড়লো প্রভাবশালী গণমাধ্যম আল-জাজিরা। তখন ১৯৯৬ সাল। পয়লা নভেম্বরে গণমাধ্যমটি যাত্রা শুরু করে। হামাদ বিল খলিফা আল থানি এর প্রতিষ্ঠা করেন। আল-জাজিরা ঢেউ তুললো পৃথিবীতে। আফগানিস্তানে মার্কিন আক্রমণের সময় বিশ্বের ডাকসাইটে সংবাদমাধ্যমকে পেছনে ফেলে এগিয়ে ছিলো আল-জাজিরা।

আল-জাজিরার প্রভাবে ২০১০ সালে শুরু হয় আরব বসন্ত। কয়েকটি দেশে পরিবর্তন হতে থাকে সরকার, ফুটতে থাকে ফুল। এতে ভয় পেয়ে যায় সৌদি আরব এবং আরব আমিরাত। মাথাব্যথা শুরু হয় মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির। তিনি ইসরাইলঘেঁষা হিসেবে পরিচিত। দেশটির প্রথম এবং শেষ নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন সিসি।


প্রেসিডেন্ট মুরসি ছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা। তাকে কারাবন্দী করা হলো। কোনঠাঁসা অন্য নেতাদের অনেকেই কাতারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিলেন। দলের কয়েকজন থিঙ্ক ট্যাঙ্কার আশ্রয় নিলেন কাতারে। কিন্তু এটা চলতে দেওয়া যায় না। সৌদি আরবের উগ্র যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের প্ররোচনায় তার বাবা সালমান বিন আবদুল আজিজের নেতৃত্বে উপদ্বীপের কয়েকটি দেশ কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণা করলো। তাদের আতঙ্ক আল-জাজিরা টেলিভিশন। অবরোধ তুলে নেওয়ার শর্ত হিসেবে জানিয়ে দিলো, আল-জাজিরা বন্ধ করতে হবে। এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যাবে না।


অবরোধ চললো। কাতারের পাশে দাঁড়ালো পারস্য উপসাগরের ওপারের দেশ ইরান। এগিয়ে এলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। শেষে পুরো অবরোধটাই মুখ থুবড়ে পড়লো। তখন ২০১৩ সাল। শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির শাসনের ১৮ বছর। ততদিনে কাতারকে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন তিনি। এবার সিদ্ধান্ত নিলেন অবসরের। ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন তার ছেলে শেখ তামিম বিন আমাদ আল-থানির কাছে। তামিমের বয়স তখন ৩৩।


খলিফা আল থানির দ্বিতীয় স্ত্রী মোজা বিনতে নাসের তামিমের মা। তার জন্ম ১৯৮০ সালের ৩ জুন, রাজধানী দোহায়। তামিম বৃটেনে পড়ালেখা করেন। উচ্চশিক্ষা শেষে ফিরে আসেন কাতারে। ভাবতে শুরু করেন দেশ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে। ২০০৩ সালের ৫ আগস্ট যুবরাজের দায়িত্ব নেন। এর আগে যুবরাজ ছিলেন তার ভাই শেখ জাসেম বিন হামাদ আল-থানি। তামিম আমির হওয়ার পর গোটা বিশ্বের চোখ ঘুরে যায় তার দিকে। অবসর নেওয়া ‘পিতা’ জানান, তিনি নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। বিশ্ব প্রজন্মের হাতেই ভালো চলবে।


খলিফা আল থানি জানান, তিনি কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতা গ্রহণ করেননি। ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতা থেকে সরেও দাঁড়ান নি। যা করেছেন সবটাই জাতির স্বার্থে। তিনি নিশ্চিৎ তামিম দায়িত্বশীল, আস্থাভাজন। ক্ষমতা নেওয়ার পর বাবার মতো করেই দেশ চালাতে থাকেলন তামিম। বাবার মিত্রকে মিত্র ভাবলেন। বাবার শত্রু থেকে সাবধান থাকার কৌশল নিলেন তিনিও। তার সব কার্যক্রমের ওপর চোখ রাখলো সৌদি। সৌদির চোখরাঙানিতেই অবরোধের মুখে পড়তে হয় কাতারকে। এই অবরোধের পেছনের আরেক কারিগর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি নিজের মুখে এর দায় স্বীকার করেছেন। পরে অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্যও হয়েছেন। 


কাতারে রয়েছে মার্কিন বিশাল সামরিক ঘাঁটি। এছাড়াও জ্বালানিসহ নানা দিক থেকে দোহার কাছে দায়বদ্ধ ওয়াশিংটন। এসব সাত-পাঁচ ভেবে সৌদির আহ্বানে কাতারের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে জড়াননি বেপরোয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
কারো সঙ্গে বিরোধে জড়াতে চান না তামিমও। সৌদি আরবের শাসকদের সঙ্গেও না। হাসি-খুশি, খোলা মনের এই আমিরের সুনাম বিশ্বজুড়ে। আভিজাত্য, বিলাসিতার ভেতরে থেকেও সাধারণ জীবনযাপনের জন্য তিনি প্রশংসিত। আর প্রশংসিত আপোষ না করার জন্য।