সৌদি তেল ক্ষেত্রে হামলার পেছনে কারা?

সৌদি তেলক্ষেত্রে আগুন জ্বলছে - সিএনএন


মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আবার জটিল হয়ে উঠছে। ইরানের সাথে সৌদি আরবের দ্বন্দ্ব এখন এ অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। সৌদি আরবের দুটি তেল ক্ষেত্রে ড্রোন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। ইরান তা অস্বীকার করেছে। ইয়েমেনের শিয়া যোদ্ধারা এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। এরমধ্যে খবর এসেছে ড্রোন হামলা ছিলো একটি প্রতিশোধমুলক পদক্ষেপ। যার সাথে ইরাকের সংশ্লিষ্টতা আছে। সৌদি তেল ক্ষেত্রে হামলার পর দেশটির তেল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানী তেলের দাম বেড়ে চলেছে।


সৌদি আরবের যে দুটি তেলস্থাপনায় হামলা হয়েছে তা গোটা বিশ্বের তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে খ্বুই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো যে কতটা নাজুক অবস্থায় আছে, এই হামলা সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছে। ইয়েমেনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন থেকে বিমান হামলা চালাচ্ছে সৌদি আরব, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের মদত আছে। সৌদি আরবের এসব বিমান সরবরাহ করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। কিন্তু প্রতিপক্ষ যে পাল্টা হামলার ক্ষমতা রাখে, সৌদি তেল স্থাপনার ওপর এই আঘাত তারই প্রমান। তবে এই ঘটনা পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে, তা হলো - হুথি বিদ্রোহীদের ইরান কী পরিমাণ সামরিক এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে? মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এমনিতেই অস্থিতিশীল। সেখানে সর্বশেষ এই ঘটনা যেন পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে।


সৌদি আরবের দুটি তেল ক্ষেত্রে হামলার পর অপরিশোধিত তেলের দাম গত চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঘটনার পর বিশ্বে জ্বালানী তেলের সরবরাহ ৫ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। হামলার পর দিনের শুরুতে অপরিশোধিত জ্বালানী তেলের মূল্য ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৭২ ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। সৌদি আরবের যে দুটি তেলক্ষেত্রে হামলা হয়েছে সেগুলো পুনরায় উৎপাদনে আসতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এই তেলক্ষেত্র দুটি সৌদি আরবের তেল শিল্পের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার। সৌদি আরব পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জ্বালানী তেল রপ্তানিকারক। প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি জ্বালানী তেল রপ্তানি করে।


এই হামলার পর পরই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সরাসরি তেহরানের দিকে আঙ্গুল তুলছেন। কয়েকঘন্টা পর অবশ্য মার্কিন সূত্রগুলো দাবি করতে থাকে মোট ১৭টি স্থানে এই ড্রোন হামলা হয় এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই এসব হামলা হয়েছে উত্তর বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বলতে চাইছে এই হামলা হয়েছে ইরান বা ইরাকের দিক থেকে, দক্ষিণের ইয়েমেন থেকে নয়। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার দায় স্বীকারের দাবি পম্পেও নাকচ করে দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক টুইট বার্তায় বলেছেন কারা এই হামলার সাথে জড়িত সেটি তারা জানেন। অন্যদিকে ইরান বিষয়টিকে 'ধোঁকাবাজি' বলে বর্ণনা করেছে। এরমধ্যে অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট মিডল ইস্ট আই একজন ইরাকি গোয়েন্দার বরাত দিয়ে জানায় হামলাটি হয়েছে ইরাক থেকে। ইরাক অবশ্য তা অস্বীকার করেছে।


ইরাকের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছেন, ইরানি মিলিশিয়াদের ওপর রিয়াদের অর্থায়নে ইসরায়েলি ড্রোন হামলার জবাবে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ওই হামলা চালানো হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের হাসদ আল-শাবির নামে পরিচিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্টীর ঘাঁটি থেকে ইরানি ড্রোনগুলো হামলা চালায়।


আগস্টে সিরিয়ায় ইরান সমর্থিত ও প্রশিক্ষিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটিতে ইসরায়েল ড্রোন হামলা চালিয়েছিলো। ওই হামলার প্রতিশোধ নিতে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো’র দুই তেল স্থাপনা আবকাইক ও কুরাইসে পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে। ইরাকি গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘দুই কারণে ওই সর্বশেষ হামলা হয়েছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের একটি বার্তা দেওয়া যে, ইরানের ওপর চলমান অবরোধের ফলে ওই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা থাকবে না। দ্বিতীয় কারণ একেবারে স্পষ্ট, আগস্টে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এসডিএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকার কুর্দিস ঘাঁটি থেকে ইরানে প্রশিক্ষিত হাসদ মিলিশিয়াদের ওপর পাঁচটি ড্রোন হামলা চালানো হয়। যার প্রতিশোধ নিলো ইরান। এসব ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় সমর্থন ও অর্থায়ন করেছিল সৌদিরা। এ কারণে সাম্প্রতিক হামলা ছিল সবচেয়ে বেশি বিধ্বংসী। এর আগের হামলাগুলো বেশি প্রতীকী ও কম ক্ষতির ছিল।

ইরাক থেকে যে হামলা হয়েছে তার স্বপক্ষে যুক্তি হিসাবে বলা হয়েছে, দক্ষিণ ইরাক ও সৌদি তেলক্ষেত্রের মধ্যবর্তী দূরত্ব হচ্ছে উত্তর ইয়েমেনের হুথি ঘাঁটি থেকে ড্রোন উড্ডয়ন করলে যে দূরত্ব অতিক্রম করতো তার অর্ধেক। ওই ড্রোনগুলোকে ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। তবে হুথি ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা হলে সেগুলোকে ১১০০ থেকে ১৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হতো। তবে ইরাকি ভূখন্ড থেকে সৌদি আরবে হামলার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে ইরাক সরকার। যে কোনো ধরনের ছায়াযুদ্ধে ইরাককে ব্যবহার না করার ব্যাপারে সর্তক করে দিয়েছেদেশটির সরকার।


এই হামলার পর একটি বিষয় স্পষ্ট যে মধ্যপ্রাচ্যে যে কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তা সব দেশে ছড়িয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে ইরাক ও লেবানন এই যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে। ইসরাইলও নিরাপদ থাকবে না। ইয়েমেন, লেবানন ও ইরাকের সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর সাথে রয়েছে ইরানের ঘনিষ্ট যোগাযোগ। এসব সংগঠন যে ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে।


সৌদি আরবের তেল ক্ষেত্রে এই হামলার পর প্রমান হলো মধ্যপ্রাচ্যের পরস্পর বিরোধী দেশগুলো কেউই নিরাপদ নয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব ইরানের নির্মম শত্রু। এর আগে পারস্য উপসাগরে বিভিন্ন জাহাজে হামলার জন্য তারা ইরানকেই দোষী করছে। ইরান তাদের একটি তেলবাহী জাহাজ জিব্রাল্টারে আটক হওয়ার পর পাল্টা একটি ব্রিটিশ জাহাজ জব্দ করে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, সৌদি আরবের তেল স্থাপনার বিরুদ্ধে হুথি বিদ্রোহীদের যত হামলা, তার সবকটিতে ইরানের হাতের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিতে পারে? বাস্তবতা হচ্ছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বেশি কিছু করার নেই।


ইয়েমেনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের পক্ষে। কিন্তু এই যুদ্ধের ব্যাপারে মার্কিন কংগ্রেসে অতটা উৎসাহ নেই। কংগ্রেসে এমন মত প্রবল হচ্ছে যে, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে এই সৌদি বিমান হামলার কোন মানে নেই। একটা গরীব দেশের ওপর এই হামলা এক বড় মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাথে বৈঠকে বসার ব্যাপারে নানা ভাবে বার্তা দিচ্ছেন। সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন ইরানে হামলার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী ছিলেন। সম্প্রতি তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তেহরান ভালো করেই জানে, ট্রাম্প মুখে যত কথাই বলুন, আসলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোন যুদ্ধে জড়াতে চান না, বরং যুদ্ধ থেকে বের করে আনতে চান। এর ফলে ইরানই বরং এখন পাল্টা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। ইরান এবং হুথি বিদ্রোহীরা যুদ্ধে যে ধরণের কৌশল নিয়েছে, সেটা শক্তিমানের বিরুদ্ধে দুর্বলের লড়াইয়ের চিরাচরিত কৌশল।


মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে রয়েছে নানা পক্ষের স্বার্থের দ্বন্দ্ব। এখানে শুধু সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে দ্বন্দ্ব নয়। স্বার্থ রয়েছে রাশিয়া, চীন ও তুরস্কের। অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সৌদি আরবের স্বার্থের বিরুদ্ধে রয়েছে এসব দেশের স্বার্থ। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান একা বা বিচ্ছিন্ন কোনো দেশ নয়।


সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলা নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিজেপ তাইয়েপ এরদোগান আংকারায় বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন তেলক্ষেত্র রক্ষায় সৌদি আরবের উচিত রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনা । ভলাদিমির পুতিন বলেন, সৌদি আরবের কাছে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিক্রি করে দেশটির জনগণ ও তেলক্ষেত্রগুলোকে রক্ষায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত মস্কো।সৌদি আরবকে রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার প্রস্তাব দিয়ে দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্রকে উপহাস করেছেন পুতিন। তিনি যতটা না রিয়াদকে বার্তা দিতে চেয়েছেন; তার চেয়ে বেশি বার্তা দিতে চেয়েছেন রিয়াদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ওয়াশিংটনের প্রতি।


সৌদি আরবের সমরাস্ত্র ক্রয়ের বড় উৎস যুক্তরাষ্ট্র। পুতিনের উপহাস শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিই ছিল; এমন নয়। যে সংবাদ সম্মেলন থেকে পুতিন রিয়াদকে রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার প্রস্তাব দেন সেখানেই তার পাশে ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। আর এই ইরানকেই তেলক্ষেত্রে হামলার জন্য দায়ী করে আসছে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র। পুতিন যখন এ বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দুজনের চোখেই হাসির ঝিলিক ফুটে উঠে।
এই বৈঠকে তুরস্ক ও সিরিয়ায় কুর্দি সশস্ত্র গোষ্টীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনে তিন দেশ একমত হয়েছে। এই কুর্দি সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সৌদি আরব। এই বৈঠকে তাৎপর্যপূর্ন বক্তব্য এসেছে তুরস্কের পক্ষ থেকে যেখানে বলা হয়েছে সিরিয়ায় রাজনৈতিক ঐক্য ও সিরিয়ার ভূখন্ডগত সার্বভৌমত্বের বিষয়ে তিন নেতা একমত হয়েছে। অর্থাৎ সিরিয়া প্রশ্নে এই তিন দেশ এক ধরনের সমাঝোতায় আসতে যাচ্ছে। সিরিয়ায় ইরান ও রাশিয়ার প্রভাব অপরিসীম। সিরিয়া প্রশ্নে যদি এই তিন দেশ একমত হতে পারে তাহলে ইসরাইল ও সৌদি আরব আরো বেশি চাপে পড়বে। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরব প্রতিশোধমুলক ব্যবস্থা গ্রহনের দিকে এগুলো মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট আরো জটিল রুপ নিতে পারে।