করোনা থেকে ফিলিস্তিনকে রক্ষা করছে ইসরাইল!

ছবি - সংগৃহীত -

অশান্ত ভূমি ফিলিস্তিন। ইসরাইলের দখলদারি নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে দেশটি। এর মধ্যে যোগ হয়েছে নতুন লড়াই। এই লড়াই প্রাণঘাতি ভাইরাস করোনার বিরুদ্ধে। এই ভাইরাস ঠেকাতে এখন লড়াই করছে গোটা বিশ্ব। ইসরাইলও এর বাইরে নয়। এতে কিছুটা হলেও ক্ষান্ত হয়েছে দেশ দু’টির পুরনো লড়াই। তবে এই সঙ্কটের মধ্যেও পুরনো চেহারা দেখাতে ছাড়েনি দখলদার ইসরাইল।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানায় গত ১৫ এপ্রিল ফিলিস্তিনে করোনা পরীক্ষার একটি হাসপাতাল ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরাইল। পূর্ব বাইতুল মুকাদ্দাস শহরের সিলওয়ান এলাকার এই হাসপাতালটি ১৪ এপ্রিল রাতে গিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরদিন ইসরাইিলি সেনারা বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়। অথচ তখনো সিলওয়ান এলাকায় আক্রান্তর সংখ্যা ছিলো ৪০। এদেরকে এই হাসপাতালেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিলো।

হাসপাতালের পরিচালক জানিয়েছেন, এলাকাটি ঘনবসতির। ভাইরাসের প্রকোপ আরো বাড়লে চিকিৎসা দেওয়া যাবে না। এতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
ফিলিস্তিনে ভয়াবহ পরিস্থিতি নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে প্রতিদিন মৃত্যুর শঙ্কা নিয়েই বেঁচে আছেন বাসিন্দারা। আর অবরুদ্ধ গাজা তো বাইরের পৃথিবী থেকেই বিচ্ছিন্ন। করোনা ভাইরাসের প্রকোপের প্রথম দিকে ঘনবসতির এই উপত্যকার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তারা জানিয়েছিলো, উপত্যকার বসতি ঘন হওয়ায় এখানে ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দিলে সেটাকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

এই সতর্কতার পর কতটা কার্যকর ভ’মিকা নিতে পেরেছে ফিলিস্তিন? আর করোনাবিরোধী লড়াইয়ে কতটাই বা সফল হয়েছেন ফিলিস্তিনীরা? মূলত সফলতা বা করোনার বিস্তারের ব্যাপারে চ’ড়ান্ত কথা বলে দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। এই প্রতিবেদনটি তৈরি করার সময় ফিলিস্তিনে আক্রান্তর সংখ্যা ৪৯৫। এদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে মাত্র চার জনের। আর সুস্থ্য হয়ে উঠেছেন ৯২ জন। একই দিনের হিসাবে ইসরাইলে আক্রান্তর সংখ্যা ১৫ হাজার ২৯৮। মৃত্যু হয়েছে ১৯৯ জনের। এবং সুস্থ্য হয়ে উঠেছেন ৬ হাজার ৪৩৫ জন।

ইসরাইলের তুলনায় ফিলিস্তিনের জন্য হিসাবটা মোটামুটি স্বস্তির। অথচ পাশাপাশি দু’টি দেশ। কিন্তু আক্রান্তর সংখ্যায় এমন আকাশ-পাতাল তফাত!
বিশ্লেষকরা বলছেন, ফিলিস্তিনে আক্রান্তর সংখ্যা কম হওয়ার কৃতিত্ব মূলত ইসরাইলের! হ্যাঁ, ইসরাইলের দখলদারি আচরণে বরাবরই অস্থির থাকে ফিলিস্তিন। এতে বাকি বিশ্বের সঙ্গে ফিলিস্তিনের যোগাযোগ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটি থেকে অন্য দেশে লোকের যাতায়াত কম। অন্য দেশ থেকে ফিলিস্তিনেও কম লোক ভ্রমণ করেন। আর করোনা ভাইরাস ছড়াচ্ছে মানুষ থেকে মানুষের শরীরে। যে দেশ বাকি বিশ্বের সঙ্গে যত বেশি জড়িয়েছে, সেই দেশে করোনার আক্রমণ এসেছে তত দ্রুত। সেই হিসাবে ফিলিস্তিনের বিচ্ছিন্ন উপত্যকা গাজা একেবারেই অবরুদ্ধ। বাইরের লোকেরা ইসরাইলের কড়া পাহারা টপকে ঢুকতে পারে না। ভেতর থেকেও কেউ বাইরে যেতে পারে না। এমনকি ফিলিস্তিনের মূল ভূখন্ডের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয় না গাজাবাসীর।

করোনার প্রকোপ যখন চীনের বাইরেও দেখা দিতে থাকে, তখন ইসরাইল এবং মিশর তাদের সীমান্তের চেকপোস্ট বন্ধ করে দেয়। বাইরের বিশ্ব থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় গাজা। এতে করোনা ভাইরাস থেকেও একটি দূরত্ব তৈরি হয় উপত্যকাটির। কিন্তু তারপরও রক্ষা হয়নি। মার্চের শেষের দিকে ফিলিস্তিনে প্রথম করোনার খোঁজ মেলে দুইজনের শরীরে। আক্রান্ত দুইজন পাকিস্তান থেকে মিশর হয়ে গাজায় প্রবেশ করেছিলেন।

করোনার উপস্থিতি পাওয়ার পরই সতর্ক হয়ে যায় ফিলিস্তিন। অবরুদ্ধ গাজার ঘনবসতি নিয়ে আলোচনা হতে থাকে বিশ্বমিডিয়ায়। বিশ্লেষকরা শুনাতে থাকেন শঙ্কার হিসাব। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ফিলিস্তিনের জন্য দরকার হয়ে উঠে করোনাকেন্দ্রিক বিপুল প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের। এসব সরঞ্জাম নিয়ে এগিয়ে আসে বিশ্বের কয়েকটি মুসলিম দেশ। মানবিক সহায়তা আসতে থাকে কাতার ও তুরস্ক থেকে।

২৩ মার্চ ফিলিস্তিনে ঘোষণা হয় জরুরি অবস্থা। এর দুই সপ্তাহ পর জারি করা হয় কারফিউ। জরুরি অবস্থার সময় থেকেই চলতে থাকে সচেতনতামূলক প্রচার। ডাক দেওয়া হয় করোনাবিরোধী লড়াইয়ের। ফিলিস্তিনের বাসিন্দারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় জন্ম থেকেই লড়াই করে আসছেন। আর গাজার বাসিন্দাদের জন্য তো অবরোধ নতুন কিছু নয়। ইসরাইলের অবরোধের কারণে এরা বরাবরই ঘরে থাকতে অভ্যস্ত। করোনার বিরুদ্ধে নতুন লড়াইয়ে দেশকে নিরাপদ রাখতে ঘরের দরজা আটকে দেন গাজাবাসী। স্বেচ্ছাসেবকরা নামেন মাঠে। আর এর সবকিছু তত্ত্বাবধান করতে থাকে প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস।
বাইরের বিশ্ব থেকে আসা মানবিক সহায়তা দিয়ে খোলা মাঠে বানানো হয় বিশেষায়িত হাসপাতাল। উপত্যকার দক্ষিণ এলাকার এই হাসপাতালটি তৈরি হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে। এতে আছে ৩৮টি সাধারণ বিছানা। ছয়টি নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা। মাঝারি পরিচর্যার জন্য রাখা হয়েছে ৩০টি বিছানা। আর করোনা ভাইরাস সন্দেহে কোয়ারেন্টাইনে রাখার জন্য রয়েছে আরো ৫৯টি কামরা। যদি এসবেও সঙ্কুলান না হয়, তবে উপত্যকার বাইরে নিয়ে আলাদা চিকিৎসা দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। গাজা উপত্যকার আয়তন মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার। এইটুকু ভ’মিতে ১৮ লাখ ৫০ হাজার লোকের বসতি। করোনার বিস্তার আরো বড়লে পরিস্থিতি মোকাবেলা কঠিন হতেই পারে। কেবল গাজা নয়, কঠিন হবে গোটা ফিলিস্তিনের জন্য।

ফিলিস্তিনীরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চান না। তাই লড়াকু বাসিন্দারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে শুরু করেছেন লড়াই। নিজেরাই তৈরি করছেন মুখোশ। কোনো কোনো আঁকিয়ে ওইসব মুখোশে দিচ্ছেন বাহারি রঙ। মাস্কের গায়ে লিখে দিচ্ছেন ‘স্টে হোম’। মুখোশগুলো দেখতে নান্দনিক হওয়ায় অনেকেই কিনে নিচ্ছেন। মানুষকে সচেতন করতে মাঠে নেমেছে স্থানীয় কিছু সংস্থা। একটি ছবিতে দেখা গেছে, করোনা ভাইরাসের আকৃতিতে সেজে একজন সরু গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। পাশে সতর্ক দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে কৌতুহলি শিশুরা। সচেতনতা বাড়াতে গাজার বেকারিগুলোতে বিক্রি হচ্ছে মাস্ক পরা মানুষের চেহারা আঁকা কেক। যারা মুখোশ কিনতে পাচ্ছেন না তারাও বসে থাকছেন না। ফেলনা জিনিস দিয়ে তৈরি করে নিচ্ছেন মুখোশ। কেউ তৈরি করছেন প্লাস্টিকের বোতল কেটে। কেউ টিন ও কাপড়ের টুকরো ব্যবহার করছেন। চমকে দেওয়ার মতো এইসব মুখোশের ছবি এখন আলোচিত সারা বিশ্বে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে গাজায় মুখোশের সঙ্কট প্রকট। পাওয়া যাচ্ছে না হ্যান্ড স্যানিটাইজার। যদিও আলজাজিরা জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মধ্যস্ততায় গাজা প্রশাসনকে উন্নত থার্মাল সাইকলার ডিভাইস দিয়েছে ইসরাইল। এই ডিভাইসের মূল্য ১০ হাজার মার্কিন ডলার। অন্যদিকে ইসরাইলে মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে তুরস্ক। এ কারণে তুরস্কসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশের সহায়তা গাজায় পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে না ইসরাইল।

এতে সঙ্কটের মধ্যেই প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করতে পারছেন প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের কর্মীরা। উপত্যকার বাসিন্দাদের সুরক্ষায় তৎপর রয়েছেন তারা। ফিলিস্তিনের মূল ভ’খন্ডের বাসিন্দারাও সীমিত চলাচলের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। খুব দরকার না হলে বাইরে বের হচ্ছেন না তারা। সমাগমের স্থানগুলো এড়িয়ে চলছেন। আক্রমণের শুরু থেকেই আল আকসাহ মসজিদ বন্ধ রাখা হয়েছিলো। পরে দেশটির গ্র্যান্ড মুফতি ঘোষণা করেন, রমজান মাসেও ঐতিহাসিক এই মসজিদটি বন্ধ থাকবে। কেবল আল আকসা নয়, ফিলিস্তিনের কোনো মসজিদই আপাতত খোলা হচ্ছে না। ধর্মীয় কিম্বা সামাজিক কোনো সমাগম তৈরি হচ্ছে না। তবে ফিলিস্তিনের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান গুরুত্ব পেয়েছে বিশ্বমিডিয়ায়।

গত ১৮ এপ্রিল এই অনুষ্ঠানটি হয় পশ্চিম তীরের রামাল্লাহতে। ৩৮ বছর বয়সি বরের নাম রাফি কাসিম। আর ৩১ বছর বয়সি কনের নাম মানার আওসি।
অবাক করা ব্যাপার হলো, করোনাকালে তাদের এই বিয়ের অনুষ্ঠানে আপত্তি জানায়নি স্থানীয় কর্তৃপক্ষও। যেখানে দেশজুড়ে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার আদেশ বলবৎ রয়েছে, সেখানে এমন একটি বিয়ের আয়োজনে কেন অনুমতি দিলো কর্তৃপক্ষ! এর পেছনেও রয়েছে মানবিক কারণ। রাফি কাসিম আর মানার আওসি, দু’জনের প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। একজন অন্যজনকে পছন্দ করতেন। কিন্তু তাদের প্রেম পরিণত হয়নি দখলদার ইসরাইলের কারণে। রাফি কাসিমকে জীবনের পনেরোটি বছর কাটাতে হয়েছে ইসরাইলের কারাগারে। আর এই বছরগুলো প্রেমিকের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন আওসি।

অপেক্ষার পালা শেষ হয়। বছরখানেক আগে ইসরাইলি কারাগার থেকে মুক্তি পান রাফি। শুরু হয় বিয়ের প্রস্তুতি। দিন তারিখ ঠিক করা নিয়েই কেটে যায় আরো কিছু সময়। কিন্তু এই কেটে যাওয়া সময়ের মধ্য দিয়েই বিশ্বজুড়ে শুরু হয় করোনার প্রকোপ। এর মধ্যে ফিলিস্তিনেও আক্রামণ করে ভাইরাসটি। এতে শঙ্কিত হয়ে যান প্রেমিক-প্রেমিকা। সেইসঙ্গে অস্থিরতা পেয়ে বসে তাদের।

অবশেষে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় বিষয়টি। মানবিক বিবেচনায় এই বিয়ের অনুমতি দেয় ‘দুরা আল কারা’ গ্রামের জরুরি কমিটি।
গত ১৮ এপ্রিলের এই বিয়ের অনুষ্ঠানটি পাল্টে দিয়েছে গোটা বিশ্বের চিত্রকে। হাতে গ্লোভস আর মুখে মুখোশ পরে অনুষ্ঠানে দেখা গেছে বর-কনেকে। বর রাফি কাসিম সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘করোনা ভাইরাসের মধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠানটি করা সহজ কাজ ছিলো না। এই সঙ্কট কবে কাটবে, আদৌ কাটবে কি না এ ব্যাপারে অনিশ্চয়তা ছিলো। তাই অনুষ্ঠানটি করে ফেলেছি।’

অনুষ্ঠানে স্থানীয় রীতিতে বিয়ের গীত গাচ্ছিলেন কয়েকজন নারী। তাদের সঙ্গে বসেছিলেন বরের মা ফাতিমা কাসিম। তিনি বলেন, ‘এই বিয়ের জন্য ওরা পনেরো বছর অপেক্ষা করেছে। আমার ছেলে পনেরো বছর কারাগারে ছিলো।’ কিন্তু করোনা সঙ্কটের মধ্যে আয়োজনটি না করলে হতো না!
ফাতিমা কাসিম বলেন, ‘মহামারি যখন শুরু হয়ে যায়, তখন আমরা বিয়ের আয়োজনটি করতে চাইনি। কিন্তু রাফি জেদ করে বসে।’ রাফির জেদ রাখতে গিয়ে বিয়ের আয়োজন করা হলেও এ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে অনেক জৌলুশ আর ঐতিহ্য। অনুষ্ঠানের জন্য বড় কোনো হলঘরও ব্যবহার করা হয়নি। কেবল কয়েকজন কাছের আত্মীয়কে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। দুরা আল কারা গ্রামের ইমারজেন্সি কমিটি জানিয়েছে, এই বিয়ের মাধ্যমে সংক্রমণ যেন না ছড়ায় সে ব্যাপারে যথেস্ট সতর্ক ছিলেন তারা। কমিটি জানায়, এই বর কনে সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনেই বিয়েটা উদযাপন করতে চেয়েছে। ঘটনাটা ব্যতিক্রম।