আমেরিকাকে ঝুঁকিতে ফেলেছেন ট্রাম্প

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প- সংগৃহীত

  • মেহেদী হাসান
  • ০৩ মে ২০২০, ১৫:৪৬

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভাইরাসে যখন প্রতিদিন মারা যাচ্ছে ২ হাজারের বেশি মানুষ তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লকডাউন তুলে নেয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ নিয়ে পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে দেখা দিয়েছে বিভেদ আর দ্বন্দ্ব। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক টুইট বার্তায় তিনটি রাজ্য থেকে লকডাউনের অবসান ঘটিয়ে মুক্ত করার জন্য জনগনের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। এরপর এসব রাজ্যে শত শত লোক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেছে। তাদের অনেকের হাতে ছিল বন্দুক। করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের আভ্যন্তরিন নিরাপত্তা এখন গভীর সঙ্কটের মুখে পড়েছে।

লকডাউন তুলে নেয়ার দাবিতে এসব বিক্ষোভ অনেকে বহন করেছে বন্দুকের ছবিসহ প্লাকার্ড। অনেকে পরিধান করেছে বন্দুক আর গোলাগুলির ছবিসহ টি শার্ট। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্টেটের গভর্ণরদেরও পদত্যাগ দাবি করেছেন। করোনা ছড়িয়ে পড়া রোধে কড়াকড়ি আরোপ করায় গভর্ণরদের হিটলারের সাথে তুলনা করেছে বিক্ষোভকারীরা। অনেক বিক্ষোভকারী হুমকি দিয়েছে যদি ব্যালটের মাধ্যমে মুক্তি আদায় না হয় তবে তারা বন্দুকের সাহায্য নেবে। ট্রাম্পের আহবানে যেসব রাজ্যে এ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে তা সবই বিরোধী ডেমেক্রেট দলের গভর্ণরদের রাজ্য।

বিভিন্ন রাজ্য মুক্ত করার জন্য ট্রাম্পের টুইটকে দেশের জন্য খুবই বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অনেকে। ওয়াশিংটনের গভর্ণর বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিপজ্জনক কাজে জড়িত। তিনি মানুষকে আইন ভঙ্গ করে বিদ্রোহের জন্য উসকানী দিচ্ছেন।
প্রতিবাদকারীদের মতে করোনা ঠেকাতে অতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। এতে তাদের ব্যক্তিগত চলাফেরার ক্ষেত্রে অযৌক্তিক বাধা আরোপ করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি। বিভিন্ন রাজ্যের লক ডাউনের বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদ করছেন তাদের পক্ষ অবলম্বন করে টুইট করেন ট্রাম্প। তাতে তিনি লিখেন ‘লিবারেট মেনিসোটা, লিবারেট মিশিগান এন্ড দেন লিবারেট ভার্জিনিয়া’।

ট্রাম্পের আহবানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার আমেরিকান রাস্তায় নামে। ফ্লোরিডা সি বিচ আংশিক খুলে দেয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে জড়ো হয়েছে অগণিত মানুষ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টুইটের পর অন্তত চারটি রাজ্যে লকডাউন তুলে নেয়ার জন্য বিক্ষোভ হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার হান্টিংটন বিচে শতাধিক লোক বিক্ষোভ করেছে লকডাউন তুলে নেয়ার জন্য। অরলান্ডো এবং ফ্লোরিডা অনেকে ট্রাম্পের পোস্টার নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে লকডাউনের বিরুদ্ধে। ফ্রাঙ্কফুট এব কেনটাকিতে মটর শোভা যাত্রা আকারে প্রতিবাদের আয়োজন করে বিক্ষোভকারীরা।
বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীরা করোনা ভাইরাস আর সোশাল ডিসট্যান্সিং আদেশের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ব্যঙ্গ বিদ্রুপের পোস্টার বহন করেছে। করোনা ভাইরসকে উপেক্ষার জন্য অনেকে পরিধান করেনি কোনো মাস্ক। অনেকে করেছে হ্যান্ড শেক। অনেকে বহন করেছে করোনার ব্যঙ্গ ছবি। সোশাল ডিসট্যান্সিংকে মিডিয়ার ডিসট্যান্সিং বলে ব্যাঙ্গাত্মক পোস্টার বহন করেছে কেউ কেউ।

বিক্ষোভকারীদের অনেকে বহন করে সন্ত্রাসমূলক স্লোগান লেখা প্লাকার্ড। যেমন মিনেসোটা রাজ্যের রাজধানী সেন্ট পলে বিক্ষোভের সময় একজন বিক্ষোভকারীর প্লাকার্ডে লেখা ‘ইফ ব্যালটস ডোন্ট ফ্রি আস, বুলেটস উইল।’ প্লাকার্ডে রয়েছে দুটি বন্দুকের ছবি। অর্থাৎ যদি ব্যালটের মাধ্যমে আমাদের মুক্তি না হয় তবে বন্দুকের মাধ্যমে মুক্তি আদায় করতে হবে। অনেক বিক্ষোভকারীর টি শার্টে ছিল বন্দুক আর ফায়ারিং এর ছবি।
তবে শাট ডাউন তুলে নেয়ার জন্য সবেচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছে মিশিগান আর মিনেসোটা রাজ্যে। মিনেসোটার গভর্নর টিমোথী জেমস ওয়ালজ । তিনি ট্রাম্প বিরোধী ডেমোক্রেট দলের। ট্রাম্পের টুইট বার্তায় সাড়া দিয়ে মিনেসোটার রাজধানী সেন্ট পলে গভর্নরের অফিসিয়াল বাস ভবনের সামনে শত শত লোক বিক্ষোভ করে। এসময় বিক্ষোভকারীরা বাসভবনের বাইরে লোহার গ্রিলে গভর্ণর টিমোথী জেমস ওয়ালজের একটি ছবি টানায়। ছবিতে গভর্নরের ছবিতে হিটলারের গোফ লাগিয়ে তাকে হিটলারের সাথে তুলনা করে বিক্ষোভকারীরা। গভর্ণরের পদত্যাগেরও দাবি জানায় বিক্ষোভকারীরা।

গভর্ণরের বাসভাবনের গেটে কয়েকটি পোস্টারে লেখা ‘ভ্যাকেট নাউ’, ওয়ালজ ইজ নট এসেনশিয়াল’। বিক্ষোভকারীরা গভর্নরের বাস ভাবনের দরজায় ট্রাম্পের বিশাল ছবি ঝুলিয়ে দেয়। এছাড়া লকডাউন বিরোধী প্রতিবাদের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে মিশিগান রাজ্য। এ রাজ্যের গর্ভনর হুইটমার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেট দল থেকে সম্ভাব্য একজন শক্তিশালী প্রার্থী । সম্ভবত সে কারনেই এ রাজ্য বেশি ট্রার্গেটের শিকার হচ্ছে ট্রাম্প এবং তার সমর্থকদের দ্বারা।
লকডাউন অমান্য করে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় গভর্নরের বিরুদ্ধে স্লোগাস দেয় ‘ লক হার আপ’। মানে ‘তাকে তালাবদ্ধ কর’। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও ট্রাম্পের সমর্থকরা হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছিল ‘লক হার আপ’। ট্রাম্পের টুইটের পর মিশিগানের গভর্ণর হুইটমার বলেন, মিশিগান তখন খুলবে যখন সে নিরাপদ। মিশিগান, ভার্জিনিয়া এবং মিনেসোটা ছাড়া ওহাইও, উটাহ, নর্থ ক্যারোলাইনা এবং কেনটাকি রাজ্যেও শাটডাউনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঘটনা ঘটছে।

ট্রাম্প তার টুইট বার্তায় যে তিনটি রাজ্য থেকে লকডাউন তুলে নিয়ে মুক্ত করার জন্য জনগনের প্রতি আহবান জানিয়েছেন সেই তিনটি রাজ্যে তার বিরোধী ডেমোক্রেট গর্ভনর রয়েছেন। অথচ ওহাইও এবং উটাহ রাজ্যে রিপাবলিকান গর্ভণর থাকায় সেগুলোকে মুক্ত করার জন্য জনগনকে এগিয়ে আসার কথা তিনি বলেননি। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তিনি তার বিরোধী দলের রাজ্যগুলোতে বিদ্রোহ উস্কে দেয়ার চেষ্টা করছেন। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে উইসকনসিন, মেরিল্যান্ড, ইদাহো, টেক্সাস, অরিগনসহ আরো বিভিন্ন রাজ্যে এ ধরনের প্রতিবাদের আয়োজন চলছে।

বিভিন্ন রাজ্যকে লকডাউন থেকে মুক্ত করার জন্য আমেরিকানদের প্রতি আহবান জানিয়ে ট্রাম্পের টুইট বার্তা বিষয়ে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন ওয়াশিটন গভর্ণর জে ইনসলি । তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশের মানুষকে বিদ্রোহের উসকানী দিচ্ছেন আর মিথ্যাচার ছড়াচ্ছেন। তিনি বিপজ্জনক কাজের সাথে জড়িত। বিভিন্ন রাজ্যকে মুক্ত করার যে টুইট বার্তা দিয়েছে তা অবৈধ এবং বিপজ্জনক কাজে নাগরিকদের উসকানি দিচ্ছেন । ট্রাম্প লাখ লাখ মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়ার আয়োজন করছেন। বিভিন্ন রাজ্য মুক্ত করার আহবানের মাধ্যমে সন্ত্রাস ছড়ানোর চেষ্টা করছেন।

করোনা ভাইরাস আর লকডাউন তুলে নেয়া নিয়ে ট্রাম্পের একের পর এক বিতর্কিত আর উসকানী মূলক বক্তব্য শেষ পর্যন্ত আমেরিকানদের মধ্যে বিভক্তি, বিদ্বেষ আর রাজনীতিতে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্পের কারনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভাইরাস সঙ্কট এখন রাজনীতিতেও ধারালো ভূমিকায় অবর্তীণ হয়েছে। ট্রাম্পের উসকানীর কারনে মিশিগান, ভার্জিনিয়া এবং মিনেসোটা রাজ্যের ডেমোক্রেট গভর্নরদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছেন ট্রাম্পপন্থীরা। তারা লকডাউনের বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

নিউ ইয়র্কের গভর্নর করোনা মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ করেছেন।নিউ ইয়র্ক গভর্ণরের এ বক্তব্য টিভিতে দেখছিলেন ট্রাম্প। গর্ভনরের বক্তব্যের জবাবে ট্রাম্প সাথে সাথে টুইট বার্তায় লেখেন, কুয়োমোর উচিত অভিযোগের পেছনে সময় কম দেয়া আর কাজের জন্য সময় বেশি দেয়া। আর ট্রাম্পের এ টুইটের জবাবে নিউ ইয়র্ক গভর্ণর বলেন, ট্রাম্পের উচিত টিভি দেখা বন্ধ করে কাজে যোগ দেয়া।
ট্রাম্পের টুইট নিয়ে অনেকে বিস্মিত একজন প্রেসিডেন্ট কেমন করে এ ধরনের উস্কানিমুলক বার্তা ছড়াতে পারেন। ট্রাম্প একের পর এক যেসব বক্তব্য দিয়ে আসছেন তা যেন অনেকটা আমেরিকানদের জীবন নিয়ে তামাশার শামিল। একদিকে অকাতারে মানুষ মরছে আরেক দিকে লক ডাউন তুলে নেয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। লকডাউন তুলে নেয়ার জন্য ট্রাম্পের জোর চেষ্টার বিরুদ্ধে বারবার আমেরিকান স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদদের পক্ষ থেকে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে এর পরিণত হবে ভয়াবহ।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশব্যাপী লকডাউন তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে নিজেকে একক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে দাবি করেছেন। যে কোনো রাজ্যের ওপর থেকে লকডাউন তুলে নেয়া এবং পুনরায় লকডাউন জারি করার বিষয়ে তার হাতে একক ক্ষমতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে গভর্ণর ও আইন বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের এ দাবির বিরোধীতা করেন। আইন বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রেসিডেন্ট এর হাতে এ ধরনের ক্ষমতা নেই। পেনসিলভেনিয়ার গভর্নরট টম উলফ বলেন, কখন লকডাউন তুলে নেয়া হবে এ বিষয়ে প্রাথমিক দায়িত্ব আমাদের। লকডাউন তুলে নেয়া বিষয়ে ট্রাম্পের একক ক্ষমতা প্রয়োগের দাবি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিভক্তি দেখা দেয়।


  • মেহেদী হাসান
  • ০৩ মে ২০২০, ১৫:৪৬