ওপেক এর নতুন চুক্তি

ছবি - সংগৃহীত -

  • মেহেদী হাসান
  • ২৬ এপ্রিল ২০২০, ২০:৩৪

বিশ্বে সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির জ্বালানি খাতে কর্মরত রয়েছে এক কোটির বেশি আমেরিকান। সম্প্রতি সৌদি - রাশিয়া তেল যুদ্ধের কারনে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয় মার্কিন অনেক বড় বড় তেল কোম্পানী। এক দিকে করোনা ভাইরাস অপর দিকে তেলের মূল্য পতনে দিশেহারা হয়ে পড়ে মার্কিন প্রশাসন। তেলের উৎপাদন কমানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি সৌদি আরব এবং রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ এবং সৌদির সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক ছিন্নের হুমকি দেয়া হয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছাড়াও মার্কিন প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হয় তেলের উৎপাদন কমানোর জন্য। অবশেষে ১২ এপ্রিল সৌদি-রাশিয়ার নেতৃত্বে তেল উৎপাদনকারী দেশের সংস্থা ওপেক চুক্তি করে তেল উৎপাদন কমানোর বিষয়ে। তবে এ তেল চুক্তি শুধু তেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারের ভূমিকায় অবর্তীন হতে যাচ্ছে এ তেল চুক্তি।

প্রথমত এ তেল চুক্তির ফলে সরাসরি লাভবান হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প প্রশাসন। আপাতত রক্ষা পেয়েছে তাদের জ্বালানি খাত। অপর দিকে এ চুক্তির সূত্র ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে গড়ে উঠতে যাচ্ছে নতুন সম্পর্ক। রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিন ট্রাম্পকে প্রস্তাব দিয়েছেন সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যের রাষ্ট্রপ্রধানদের একটি শীর্ষ বৈঠকের। সেখানে আলোচনা হবে বিশ্ব সমস্যা নিয়ে। ট্রাম্প এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন এবং চীনও আগ্রহী এ বৈঠকের বিষয়ে। করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে এ বৈঠকের সফলতার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যত বিশ্ব রাজনীতির গতি প্রকৃতি।
এই চুক্তি অনুযায়ী আগামী মে এবং জুন মাসে প্রতিদিন তেলের উৎপাদন কমানো হবে ৯৭ লাখ ব্যারেল। আর এর ফলে বিশ্ব বাজারে বাড়বে তেলের দাম। জুনের পর থেকে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৪০ মার্কিন ডলারে পৌছতে পারে। তেলের দাম বাড়ায় লাভবান হবে সব বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ। তবে মে এবং জুন মাসে তেলের উৎপাদন কমানোর চুক্তিতে ২০২২ সাল পর্যন্ত তেলের উৎপাদন দিনে ৮০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত কমিয়ে রাখার সম্ভাবনা আছে।

বিশ্বের সব বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ একত্রিত হয়েছে জ্বালানি তেল উৎপাদন বিষয়ে। ভবিষ্যত ভূরাজনীততে বড় ধরনের পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে জ্বালানি তেলের উৎপাদন বিষয়ে তাদের ঐকমত্য। জ্বালানি তেল উৎপাদন কমানোর চুক্তিতে পৌছানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ধন্যবাদ জানিয়েছেন রাশিয়া ও সৌদি রাষ্ট্র প্রধানদের। তেলের উৎপাদনর কমানোর বিষয়ে সম্মত হওয়ার জন্য এ দুই দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন ট্রাম্প।

ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকার অবস্থান হলো তেলের উৎপাদন কমানোর বিরুদ্ধে। কারন তা মার্কিন অর্থনীতির জন্য হুমকি। কিছুদিন আগেও তেলের উৎপাদন গত এক দশকের মধ্যে দ্বিগুন ছিলো এবং এর সুফল পায় যুক্তরাষ্ট্র।
সৌদি আরব এবং রাশিয়া এমন এক সময় তেল যুদ্ধে লিপ্ত হয় যখন বিশ্বে করোনার কারনে তেলের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যায়। আর অস্বাভাবিকভাবে কমে যায় তেলের দাম। তেলের উৎপাদন কমিয়ে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি কথা বলেন, সৌদি আরব, রাশিয়া এবং মেক্সিকোর রাষ্ট্রনেতাদের সাথে ।
মার্কিন বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী রাশিয়ার ওপর অবরোধ এবং সৌদির সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে সরাসরি হুমকি দেয়া হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে। তেলের উৎপাদন কমাতে রাজি না হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের ওপর ভীষন রকমের ক্ষেপে যায়। সিএনএননের ১১ এপ্রিলের খবরে বলা হয়েছে ১৩ জনের রিপালিকান সিনেটরের একটি গ্রুপ দিনের পর দিন ওয়াশিংটনে সৌদি রাষ্ট্রদূতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে তেলের উৎপাদন কমানোর জন্য। তারা সৌদি জ্বালানি মন্ত্রীর সাথেও দীর্ঘ আলোচনা করে। সৌদির ওপর তাদের প্রকাশ্য চাপ সৃষ্টির কথা মার্কিন বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এ দু: সময়ে সৌদির এ ধরনের আচরণ তারা মেনে নেবে না বলে জানায়।
তেলের উৎপাদন কমানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি ও রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করে চুক্তি করালেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজে তেলের উৎপাদন কমাতে কিন্তু রাজি হয়নি। অথচ বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো বিশ্বের শীর্ষ জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি খাতে ১ কোটিরও বেশি মানুষ কর্মরত আর জিডিপির মোট ৭ ভাগ আসে এ খাত থেকে। সৌদি-রাশিয়া তেল যুদ্ধের কারনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় বড় জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সৌদি ও রাশিয়ার সমঝোতা এবং ওপেকের তেল উৎপাদন কমানোর চুক্তির ফলে আপতত পথে বসার হাত থেকে বেচে যাচ্ছে মার্কিন অনেক তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। বড় ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে মার্কিন জ্বালানি খাতে। আর নির্বাচনের বছরে এভাবে তেল শিল্পগুলোকে চাঙ্গা রাখতে পারায় এর সুফল পাবেন ট্রাম্প।


ট্রাম্প স্পষ্টভাবে এক টুইট বার্তায় বলেন, ওপেকের সাথে বড় ধরনের চুক্তি হয়েছে। এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লাখ লাখ মানুষকে চাকরিহীন হওয়া থেকে রক্ষা করবে। আমি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এবং সৌদি বাদশা সালমানকে ধন্যবাদ দিতে চাই। এ চুক্তি সবার জন্য বিরাট অর্জন।

তেলের দাম রেকর্ড কমে যাওয়া নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয় যে এটি পুতিনের কোনো গেম প্লান কিনা। যদিও এর ফলে রাশিয়ান অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে পড়ে।

তেল যুদ্ধের ঘটনা পুতিন শুরু করুক বা না করুক বাস্তবতা হলো এর সুফল পাচ্ছেন ট্রাম্প আর আমেরিকা। অনেকে মনে করেন সৌদি এবং রাশিয়া বাঁচিয়ে দিয়েছে মার্কিন তেল শিল্প খাত।

ওপেকের তেল চুক্তির কারনে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বিগ অয়েল তথা বিশ্বের শীর্ষ ছয়টি তেল গ্যাস উৎপাদক ও বানিজ্যক প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে। মার্কিন অর্থনীতি, রাজনীতি, গণমাধ্যম, ওয়াল স্ট্রিট, থিং ট্যাংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রয়েছে বিগ অয়েলের গভীর প্রভাব। তেলের উৎপাদন কমাতে
সৌদি রাশিয়াকে বাধ্য করার সফলতার কারনে ওয়াশিংটনে রাশিয়া বিরোধী কেউ আর ট্রাম্পের সমালোচনা করতে সাহস করবে না। মার্কিন এলিট শ্রেণী মনে করে তেল সঙ্কট থেকে বের হয়ে আসার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে পুতিন।

বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেল উৎপাদন কমানোর কথা এখনো বলেনি। এটি তারা ছেড়ে দিয়েছে বাজার পরিস্থিতির ওপর। তবে বছরের শেষ নাগাদ দেশটির জ্বালানি তেল উৎপাদন দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। তেলের উৎপাদন কমানোর ফলে রাশিয়ার আয় প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাবে।


এ চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে একটি ভাল বোঝাপড়া হয়েছে। সৌদি আরব নিজেকে তাদের পথ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। নির্বাচনের হস্তক্ষেপের অভিযোগের বিষয়ে মুলার তদন্ত নিয়ে রাশিয়ার সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় যুক্তরাষ্ট্রের। অবশেষে ট্রাম্প তার বিরোধীদের পরাস্ত করেছেন এবং ইমপিচমেন্টের হাত থেকেও রক্ষা পেয়েছেন। ট্রাম্প এখন মুক্ত। পুতিন সেটা জানেন। ট্রাম্প অনেক দিন ধরে আশায় ছিলেন রাশিয়ার সাথে গঠনমূলক একটি সম্পর্ক স্থাপনের। তেলের উৎপাদন নিয়ে ট্রাম্প ও পুতিন তিন দফায় কথা বলেছেন।

আসলে ট্রাম্প যেমন চেষ্টা করছেন রাশিয়ার সাথে বৈরিতার অবসানে তেমনি পুতিন চাইছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সর্ম্পক উন্নয়নের। নভেম্বরের নিবাচনে ডেমোক্রেট প্রার্থী জো বাইডেন যদি বিজয়ী হয় তবে তা রাশিয়ার সাথে আমেরিকার সম্পর্ক চরম পর্যায়ে পৌছতে পারে। পুতিন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান বিভিন্ন বিষয়ে এক সাথে সমাধানের জন্য কাজ করার চেষ্টা করছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের সম্পর্ক উন্নত হচ্ছে। এই আলোচনার পর ক্রেমলিন থেকে যে বিবৃতি দেয়া হয় তা খুবই তাৎপর্যপূর্ন। এতে বলা হয় চলমান বিষয়ের পাশাপাশি কৌশলগত নিরাপত্তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

এই আলোচনার সময় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্র প্রধানদের একটি বৈঠকের প্রস্তাব দেন পুতিন। বিশ্বের যে কোনো স্থানে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং সেখানে করোনা পরিস্থিতিসহ বিশ্বের চলমান সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে। প্রস্তাবে রাজি হন ট্রাম্প। এ প্রস্তাব দেয়ার আগে বেইজিংয়ের সাথে আলোচনা করে মস্কো। চীনও তাতে সম্মতি প্রদান করে। চীন আশা করছে এ সম্মেলনের মাধ্যমে বৈশ্চিক চ্যালেঞ্জগুলো বিষয়ে সমাধানের আলোচনা করা যাবে।
ওপেকের চুক্তি শুধু তেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং চীন রাশিয়া আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরষ্পর কাছাকাছি হবার একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।