কোন দেশের পর্যটকরা কেমন

পর্যটক- সংগৃহীত

একটা সময় ছিল, যখন যোগাযোগের মাধ্যম বলতে ছিল টেলিফোন, টেলিগ্রাম ও চিঠি। তখন কেউ বাড়ি থেকে বের হওয়া মানেই একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। বিশেষ করে পর্যটকদের বেলায় এটি ছিল নিরেট সত্য। তখন পর্যটন বা দেশভ্রমণ ছিল অনেকটা এ রকম - ভ্রমণে গেলেন, সেখানে ঘোরাঘুরি যা করার করলেন, তারপর ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলেন। বদলে যাওয়া দুনিয়ায় ঘোরাঘুরি করা লোকগুলোর আচরন থাকছে না অজানা।

স্মার্ট ফোন এসে সেই আদ্যিকালের 'খেলাটা' আমূল বদলে দিয়েছে। এখন পর্যটক বা তার হোস্ট যে-ই কোনো বিরূপ আচরণ করুক না কেন, অপরজন তার ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দিতে পারছে। আর এর মাধ্যমে সারা পৃথিবী জেনে যাচ্ছে, কোন দেশের পর্যটক বা অবকাশকারীদের আচরণ আসলে কেমন। এ নিয়ে ২০১৫ সালে এক জরিপ চালায় হোটেলডটকম। এতে বেরিয়ে আসে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই যেমন, কোন দেশের মানুষ হোটেলকক্ষ থেকে ছোটখাট জিনিসপত্র চুরি করে, কাদের আচারব্যবহার কেমন ইত্যাদি।
বিমানবন্দরে নানা ঝামেলায় পড়ার কথা আমরা প্রায়-সবাই জানি। যেমন, চেক-ইন ডেস্কে হয়রানি, উড়োজাহাজে কেবিন ক্রূ-দের সঙ্গে খিটিমিটি ইত্যাদি। প্রতœতাত্ত্বিক স্থান দেখতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হাতে নাজেহাল হওয়া আছে। আবার অনেক পর্যটক হয়তো পাবলিক প্লেসে প্রস্রাব করতেও বসে যায়, যা হয়তো ওই দেশের আইনে কঠোরভাবে নিষেধ। এক্ষেত্রে সবচাইতে ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে চীনারা। ২০১৬ সালে ১২২ মিলিয়ন চীনা নাগরিক বিদেশ ভ্রমণে যায়। দেখা গেছে, তাদের বড় অংশই একবারের জন্যও কোনো ভুল পথে পা রাখেনি।

দুঃখজনক হলো, চীনা ট্যুর কম্পানিগুলো বিশ্বের অনেক দেশেই এখন আর তাদের পর্যটকদের নিয়ে যাবে না বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে মিশর ও তিউনিশিয়ার মতো দেশে। এসব দেশে বিদেশি পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার কারণেই তাদের এমন ভাবনা। চীনা ট্যুর গ্রূপগুলোর এ ভাবনা বাস্তবায়িত হলে অনেক দেশের পর্যটনশিল্পের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এবার আমরা জেনে আসি ব্রিটিশ পর্যটকদের কথা।

ব্রিটিশ পর্যটকরা এমনিতে বিনয়ী, বন্ধুত্বপরায়ন ও বিবেচক। কিন্তু তারাই আবার অতিরিক্ত মদ পান করে যখন-তখন ন্যাংটা হয়ে রাস্তায় নেমে পড়তে একটুও দ্বিধা করে না। কেউ আবার হোটেলের ব্যালকনি থেকে পুলে ঝাঁপ দেয়, অনেককে দেখা যায় নিজের ছায়ার সাথে ঘুষাঘুষি করতে।
ক্রোয়েশিয়ার পর্যটন দ্বীপ হভার-এ গিয়েও ব্রিটিশ পর্যটকরা প্রায়ই এসব করতো। এক পর্যায়ে দ্বীপের মেয়র বিরক্ত হয়ে ঘোষণা দেন যে কাউকে প্রকাশ্যে মদ পান বা মাতলামি করতে দেখা গেলেই আট শ' মার্কিন ডলার জরিমানা করা হবে। ব্রিটিশ পর্যটকরা পর্তুগালেও অঘটন ঘটিয়েছে। একবার তারা সেখানকার এক ক্লাবে রীতিমতো দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেয়। তাদের থামাতে স্থানীয় পুলিসকে ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে হয়। এসব অপকর্মে ব্রিটিশ টিনএজাররা আরো এককাঠি সরেস। দেশভ্রমণে গিয়ে নানা ঝামেলা পাকাতে রীতিমতো ওস্তাদ তারা। একবার স্পেনে বেড়াতে গিয়ে এক হোটেলে ওঠে একদল ব্রিটিশ টিনএজার। এরই মধ্যে একদিন তাদের কেউ-কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। বলা হয়, ফুড পয়জনিং বা হোটেলের খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণেই এ অসুস্থতা। তারা হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণও দাবি। পরে দেখা যায়, পুরো ব্যাপারটাই ওই তরুণদের সাজানো। কথিত 'অসুস্থ' এক তরুণ ও তার বান্ধবীকে পরীক্ষা করে জানা যায়, আগের কয়েক দিনে তারা দু'জনে ১০৯ বোতল মদ গিলেছিল। এতেই তাদের প্রচন্ড পেটব্যথা ও তীব্র ডায়ারিয়া হয়। হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কিছু নগদ অর্থ খসানোই ছিল এ নাটকের উদ্দেশ্য। এ ঘটনায় স্পেন ছাড়াও ইউরোপজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

ব্রিটিশ পর্যটকরা তো দেখিয়েছে কী করে ফুড পয়জনিং বা হোটেলের খাদ্যে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখাতে হয়, আর তদেরও ছাড়িয়ে যায় জার্মানরা। নানা অভিযোগ তোলাকে তারা রীতিমতো আর্ট বা শিল্পে পরিণত করেছে। খানাপিনা গতানুগতিক, ব্রোশিওরে যেমন বলা হয়েছে, পরিবেশটা ঠিক সেরকম নয় - এ রকম সব বিচিত্র অভিযোগ তুলে ক্ষতিপূরণ দাবি করাটা জার্মান ট্যুরিস্টদের কাছে ডালভাত।   আমেরিকানরাও কম কিসে! একটা কথা ঠিক, তারা বিদেশ ভ্রমণে যায় কম, বরং ট্যুরিস্টদের হোস্টিং বা আপ্যায়নই করে বেশি। আর সাধারণ আমেরিকান, যারা তেমন বৈচিত্র্যপিয়াসী নয়, তাদের ভেতর একটা গোঁ বেশ লক্ষ্য করা যায়। তা হলো, তারা যেমনটি চাইবে সবকিছু ঠিক সেভাবেই হতে হবে। মজার ব্যাপার হলো, সবকিছুকে নিজেদের মনমতো করার জন্য তারা কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার খরচ করতে একটুও ভাবে না। এমনই গোঁ তাদের। তাদের এই গোঁয়ার্তুমিকে অনেকে ক্ষ্যাপা চীনা ষাঁড়ের সাথেও তুলনা করে থাকে।

আমেরিকার পেয়ারে দোস্ত ইসরাইলীরাও কম যায় না। ইসরাইলীরা পর্যটক হিসেবে কেমন, সে বিষয়ে খোদ ইসরাইলী পত্রিকা ''হারেৎস''-এ এক লেখক লিখেছেন, ইসরাইলী পর্যটকরা অমার্জিত, অসহিষ্ণু, হট্টগোলপ্রবণ এবং উচ্চ মাত্রায় মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচিত। হোটেলের রুম ভাড়া নিয়ে তর্কাতর্কি করা থেকে শুরু করে রুমের ভাড়া ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাওয়া পর্যন্ত নানা প্রতারণায় এদের ওস্তাদী এতোই সুবিদিত যে, অনেক হোটেল-মোটেল অলিখিতভাবে ''নো ইসরাইলী'' নীতি নিয়েছে। অর্থাৎ ইসরাইলী পাসপোর্ট দেখলেই তারা সাফ জানিয়ে দেয়, রুম নেই।
লোনলি প্ল্যানেট ট্র্যাভেল ফোরামের একজন কন্টিবিউটর দুঃখ করে লিখেছেন, ইসরাইলী পর্যটকদের এ ধরনের আচরণ না দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে, না অন্য ইসরাইলীদের জীবনে কোনো সুবিধা আনছে। সবচাইতে লজ্জাজনক ঘটনা ঘটে বিদেশে কোনো হোটেলে চেক ইন করতে গেলে। যেইমাত্র ইসরাইলী পাসপোর্ট দেখে, অমনি অভ্যর্থনাকারীদের হাসিমুখগুলো অন্ধকার হয়ে যায়।
দুনিয়া জুড়ে রাশিয়ান পর্যটকদের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। রাশিয়ানদের বেলায় আরেক কান্ড। কোনো ঘটনায় যে তাদের হাসিমুখগুলো অন্ধকার হয়ে যায়, তা কিন্তু নয়। তারা এমনিতেই গোমড়ামুখো। রুশ পর্যটকদের ভাবখানাই এমন যে, কেউ আমাদের পছন্দ করে না? না-করুক, আমাদের ওতে বয়েই গেল! তা ওদের বয়ে না-গেলেও রুশ সরকারের কিন্তু যায়। তাই রাশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশগামী রুশীদের পর্যটকসুলভ আদবকেতা শেখানোর একটা উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন, তাদের বলা হচ্ছে, কক্ষনোই কেনীয়দের উত্যক্ত করতে যেয়ো না, তাদের কখনোই ''বান্দর'' বলবে না ইত্যাদি। এর ফলও পেতে শুরু করেছে দেশটি। আগে প্রায় ৪২ শতাংশ রুশ পর্যটক ছিল কর্কশভাষী, অভদ্র, মদাসক্ত। তারা মদ পান করে মেতে উঠতো হোটেলের আসবাব ভাঙচুরে। এখন সে প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে। তারা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, তাদের এসব কান্ডকীর্তি দেখলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আর তাদের দেশে আসতে চাইবে না। অথচ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রুশী মুদ্রা রুবলের ক্রমাগত পতন ঠেকাতে বিদেশি বিনিয়োগ খুবই জরুরি।

যাদের কথা বলা হলো তাদেরকে সবাই খারাপ বলবে, তাও নয়। অনেক সময় দেশি পর্যটকদেরও খারাপ আচরণ করতে দেখা যায়। যেমন, গ্রীসের শান্ত দ্বীপগুলোতে বেড়াতে গিয়ে সেদেশেরই রাজধানী এথেন্সের অবকাশ যাপনকারীরা যেমন হৈ চৈ এবং জিনিসপত্রের দরদাম নিয়ে কথা কাটাকাটি করে থাকে, তাতে স্থানীয়রা খুবই বিরক্ত। কাজেই দেশি-বিদেশি বলে কথা নেই, যে খারাপ, সে তো খারাপই।