জিবুতিতে কেন চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও তুরস্ক

আফ্রিকার ছোট্ট দেশ জিবুতি- সংগৃহীত

আফ্রিকার ছোট্ট একটি দেশ। নাম জিবুতি। আফ্রিকা মহাদেশের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। বেশির ভাগ এলাকাই বিরান, জনসংখ্যা ১০ লাখেরও কম। কিন্তু এই দেশেই একের পর এক সামরিকঘাঁটি গাড়ছে পরাশক্তিগুলো। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীনের মতো দেশের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এখানে। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী খেলোয়াড় তুরস্কের ব্যাপক প্রভাব আছে দেশটির ওপর। এমনকি ভারতও এ দেশটি নিয়ে আগ্রহী।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারনে দেশটি আফ্রিকা, পশ্চিম এশিয়া এবং অবশিষ্ট এশিয়াকে সংযুক্ত করেছে। সোমালিয়া, ইরিত্রিয়া ও ইয়েমেনের মধ্যখানে দেশটির অবস্থান। এটাই হলো দক্ষিণ দিক দিয়ে লোহিত সাগরে প্রবেশের পথ। দেশটির লাগোয়া বাব আল মানদেব প্রনালী আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য কৌশলগতভাবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, সামরিক নীতির সংঘাতময় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ কারণেই ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার বিভিন্ন বাহিনীর কাছে কোনো না কোনো কারণে জিবুতিকে কদর করতে হয়। আরেকটি কারণেও এর গুরুত্ব রয়েছে। আশপাশের দেশগুলোতে নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও জিবুতি অনেকটাই স্থিতিশীল দেশ।

বাব আল-মানদেব প্রণালী ঘেঁষে ছোট্ট আফ্রিকান দেশ জিবুতি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত জাহাজ চলাচল রুট সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার। দেশটির বন্দরই এর অর্থনীতির প্রাণশক্তি। দেশটি বলতে গেলে বিরাণভূমি। বন্দরই তাদের আয়ের প্রধান উৎস, চাকরির ব্যবস্থাও হয় এখান থেকে। আফ্রিকা আর মধ্যপ্রাচ্যের গোলযোগপূর্ণ অঞ্চলের কাছেই জিবুতির অবস্থান। অথচ বেশ শান্ত দেশটি। এ কারণেই বিদেশী সামরিক ঘাঁটির জন্য মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয় দেশটি। সাবেক উপনিবেশ শক্তি ফ্রান্স সেখানে বেশ বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটিও সেখানে।

জিবুতির অবস্থানগত কারনে বিশে^র প্রভাবশালী দেশগুলো সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারনে দেশটি সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। বেশ কয়েকটি দেশ সেখানে সামরিক ঘাটি স্থাপন করেছে।
ফ্রান্স উপনিবেশ আমল থেকে জিবুতিতে ঘাঁটি গেড়ে আছে। তারপর ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার একমাত্র স্থায়ী ঘাঁটিটি প্রতিষ্ঠা করে এখানেই। জাপানের একমাত্র বৈদেশিক সামরিকঘাঁটিও জিবুতিতে। এরপর চীন একই পথ অনুসরণ করেছে। চীন এখানে নৌ ঘাটি স্থাপন করেছে। এখানেই শেষ নয়, জার্মানি ও স্পেনের সৈন্যরাও সেখানে রয়েছে। তবে তারা রয়েছে ফরাসিদের অতিথি হিসেবে। অতি সম্প্রতি সৌদি আরব, আরব আমিরাতের মতো দেশও এ দেশটির দিকে নজর রাখছে। ইরানও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। ইয়েমেন নিয়ে সৌদি আরব ও ইরানের দ্বন্দ্বের ছায়া এখানেও পড়ে। সুযোগটা কিন্তু জিবুতি বেশ ভালোভাবে নিয়েছে। তারা কারো পক্ষে নয়, বরং সবাইকে টেনে বিনিয়োগের মাধ্যমে গরিবি দূর করার চেষ্টা করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঘাঁটিটির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভাড়া হিসেবে বছরে দেয় ৬৩ মিলিয়ন ডলার। চীন দিচ্ছে ২০ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া রেলওয়ে, বন্দর, শিল্পপার্ক আর বন্দর নির্মাণে বিলিয়ন বিলিয়ন বিনিয়োগ করছে চীন।

জিবুতিতে এখন তুরস্কের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তুরস্কের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার ঘন ঘন জিবুতি সফরে যাচ্ছেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনেকগুলো প্রকল্প নিয়েছে তুরস্ক। ২০১২ সালে তুরস্ক জিবুতিতে দূতাবাস খোলে। ২০১৫ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান জিবুতি সফর করেন। হর্ন অব আফ্রিকায় তুরস্কের সামরিক উচ্চা ভিলাষ রয়েছে। সোমালিয়াতে নৌঘাটি স্থাপন ও দেশটির সেনা কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষন দিচ্ছে তুরস্ক। আবার জিবুতি কৃষি উন্নয়নে ড্যাম নির্মান, খাদ্য সাহায্য এবং মুসলিম প্রধান দেশটিতে বড় আকারের একটি মসজিদ নির্মান করে দিয়েছে তুরস্ক। জিবুতির সাধারন মানুষের ওপর তুরস্কের প্রভাব বাড়ছে। উসমানরীয় আমলে লোহিত সাগরে নৌ নিয়ন্ত্রন ছিলো তুর্কিদের হাতে। সুদানের সোয়াকিন, সোমালিয়া ও জিবুতির বন্দর গুলো তাদের নিয়ন্ত্রনে ছিলো। এর মধ্যদিয়ে আফ্রিকার এ অঞ্চলে ছিলো ব্যাপক প্রভাব তুর্কিদের। এরদোগান এখন সেই প্রভাব ফিরে আনতে চাইছেন।

জিবুতিতে চীনা উপস্থিতির পর ভারত এ অঞ্চলে নিজের উপস্থিতি বাড়াতে চায়। দেশটির সাথে কূটনৈতিক সর্ম্পক না থাকা সত্ত্বেও ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ ২০১৭ সালে জিবুতি সফর করেছেন। এই অঞ্চলে ভারত তার কৌশলগত অবস্থান বৃদ্ধির আকাঙ্খা আছে। জলদস্যুবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে এই অঞ্চলে আগে থেকেই ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।
সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে, ভারতীয় নৌবাহিনীর কার্যক্রম শুরু হয় মালাক্কা প্রনালী থেকে বাব-আলমানদিব পর্যন্ত। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব প্রতিরোধের কথা বলে আসছেন। তাদের মতে, জিবুতিতে চীনাঘাঁটি বেইজিংয়ের প্রভাব বাড়ানোর ওই উদ্যোগের একটি উদহারন। এখন ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল প্রতিবাদ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে নৌপথ সুরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং ভারত মহাসাগরের প্রধান দ্বীপগুলোর প্রবেশপথগুলো রক্ষা করা। ভারত মনে করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ‘মূল নিরাপত্তা যোগানদাতা’ হলো নয়াদিল্লি। সে ক্ষেত্রে কৌশলগত নৌ অবস্থান জিবুতি হতে পারে সেই লক্ষ্য পূরণের অন্যতম মাধ্যম।

ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি নয়াদিল্লি বেশ চাপে রয়েছে। পাকিস্তানে চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতি তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কায় হাম্বানতোতো বন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রন স্বস্তিতে নেই নয়াদিল্লি। এখন চীনা এই অবস্থান একমাত্র প্রতিরোধ করার জন্য ভারত তার নৌবাহিনীকে ব্যবহার করার কথা ভাবছে। এই অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী নৌবাহিনীর তৎপরতার নজরদারি করার জন্য ভারতীয় নৌবাহিনী আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে কৌশলগত ফাঁড়ি হিসেবে গড়ে তুলছে। গত কয়েক বছরে ভারত বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভূখন্ডে তার সামরিক সামর্থ্য বাড়াচ্ছে। এসবের মধ্যে রয়েছে নৌ বিমান স্টেশন পুনঃগঠন, অভিযান পরিচালনার মতো কাঠামো নির্মাণ ইত্যাদি। চীনা নজরদারি কার্যক্রম প্রতিরোধের জন্য আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে ভারত সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। চীনা নৌবাহিনীর তৎপরতায় নজরদারি চালানোর জন্য শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও অন্যান্য এলাকায় রাডার কেন্দ্রও স্থান করছে ভারত।

বিশে^র প্রভাবশালী দেশগুলোর নৌশক্তি প্রদর্শন কিংবা নৌ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য লোহিত সাগরের তীরের এই ছোট দেশটি হয়ে উঠেছে অতি আদরের। ২৩ হাজার ২শ বর্গ কিলোমিটারের এই দেশটিকে কেন্দ্র করে ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের ওপর আধিপত্য বিস্তারের খেলা চলছে।

জিবুতিতে চীনের ঘাটি নির্মানের পর শুধু ভারত যে উদ্বিগ্ন তা নয় যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো দেশগুলোও উদ্বিগ্ন। আবার চীনের প্রভাব খর্ব করার মতো অর্থনৈতিক সামথ্য ভারতের নেই। লজিস্টিক একচেঞ্জ মেমোরান্ডাম অব এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নিচ্ছে ভারত। এই চুক্তি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে তাদের সামর্থ্য বৃদ্ধি, আরো ব্যাপক মানবিক সহযোগিতা কার্যক্রম পরিচালনা ও ত্রাণকার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেবে। তা ছাড়া আরো বিস্তৃত এলাকায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা করার সক্ষমতা সৃষ্টি করবে।

দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীর কার্যক্রমের পাশাপাশি বাব-আলমানদিবের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে প্রভাব বৃদ্ধি বেইজিংয়ের কৌশলগত উচ্চাভিলাষের একটি পূর্বাভাস মাত্র। ইতোমধ্যে আফ্রিকার দেশগুলোতের বিপুল বিনিয়োগ করেছে চীন। নতুন নতুন ঘাঁটি স্থাপন এবং অর্থনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে চীন বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ দিয়েই বিশ্ববাণিজ্যের প্রায় ৯০ ভাগ সম্পন্ন হয়। এসব পয়েন্টের কোনো একটায় বিঘœতা সৃষ্টি হলে সারা বিশ্বের জিডিপি, চাকরি, মুদ্রাস্ফীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। এ কারনে চীন নৌরুটগুলোর সাথে সম্পৃক্ত বন্দরগুলোতে বিনিয়োগের পরিমান বাড়িয়েছে। যার নাম দেয়া হয়েছে মেরিটাইম সিল্করুট। জিবুতিতে চীনের অবস্থান এর অংশ মাত্র।