চীনাদের খাদ্যাভাস ও করনো ভাইরাস

চীনাদের-খাদ্য-সংগৃহীত -

দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়তে থাকা করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। চীনের বিভিন্ন শহর বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। অনেক বিমান সংস্থা চীনের সাথে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করেছে। অপরদিকে বিশ্বের বহুদেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগি পাওয়া গেছে।

করোনাভাইরাসের কারণ হিসেবে বিজ্ঞানী ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা এখনও নিশ্চিত ভাবে কোনও বিষয়কে চিহ্নিত না করলেও কয়েকটি ‘দাবি’ উঠে এসেছে। এই ধরনের ভাইরাসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় ‘ফ্রুট ব্যাট’ বাদুড়ের শরীরে। চীনে এই ধরনের বাদুড়ের স্যুপ রান্নার অন্যতম উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং তা বেশ জনপ্রিয় একটি খাদ্য।
বাদুড় খায় এমন সাপের শরীরেও এই ভাইরাস ঢুকে পড়ে। সেই সাপ চীনে মাছের বাজারে বিক্রি হয়। সাপও সেখানকার অতি জনপ্রিয় একটি খাবার। তেমন সাপ খেলেও শরীরে প্রবেশ করতে পারে করোনাভাইরাস।

এই ধরনের সাপ বা বাদুড় ধরা, জবাই করা বা খাওয়ার সময় শ্বাসের মাধ্যমে এই ধরনের ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করে। তাদের রক্তের সংস্পর্শে এলে বা শ্বাসের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে, অন্য মানুষদের মধ্যে। এমনকি, সাপ ও বাদুড়ের রক্ত অন্য কোনও জায়গায় লাগলে, সেখানে হাত দিয়ে সেই হাত নাকে বা মুখে দিলে বা অন্য কাউকে ছুঁলেও অসুখের জীবাণু হাতের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাদুড়, সাপ ইত্যাদির স্যুপ থেকে চিনে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে এমন দাবি থেকে এ সব খাবার ইতিমধ্যেই চিনাদের খেতে নিষেধ করেছেন সে দেশের চিকিৎসকেরা। যেসব দেশে বন্য জন্তু বা মাংস খাওয়া হয় সে সব দেশে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ হওয়ার তথ্য জানা যথেষ্ট নয়। শরীরের অভ্যন্তরে এই ধরনের ভাইরাস কী ভাবে ছড়িয়ে পড়বে তা না জানলে এর উপযুক্ত চিকিৎসাপদ্ধতি গ্রহন করাও অসম্ভব। প্রতিষেধক তৈরি না হলেও অসুস্থ মানুষদের আয়ুষ্কাল কিছুটা বাড়িয়ে দিতে বা ভাইরাসের থাবাকে গুটিয়ে আনতে গিয়ে চিকিৎসকরা এর সংক্রমণের পদ্ধতি সম্পর্কেও অবগত হয়েছেন। শরীরে বাসা বাঁধার ক্ষেত্রে আর পাঁচটা ভাইরাসের মতোই এর আচরণটি সরল।

চীনের হুবেই প্রদেশের উহান প্রদেশে প্রথম এই ভারইরাসে আক্রান্ত হওয়া রোগির সন্ধান পাওয়া গেলেও এখন কমপক্ষে ১৭টি দেশে রোগির সন্ধান পাওয়া গেছে। এই ভাইরাস থেকে মানুষকে রক্ষা ও চিকিৎসার ব্যাপারে চীন সরকারের উদ্যেগে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা প্রথমে আশ্বস্ত হলেও তার এখন জরুরি অবস্থা জারি করেছে। আসুন আমরা জেনে নেই বিশ্ব সাস্ব্য সংস্থা কী বলছে। আর অন্য দেশগুলো বা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, চীনে হাজার হাজার মানুষ নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশে মানুষের শরীর থেকে অন্যের আক্রান্ত হওয়ার স্পষ্ট নজির দেখা গেছে। এছাড়াও সংস্থাটির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ভাইরাস সংশ্লিষ্ট কারণে মারা যাওয়া প্রতি আট জনের মধ্যে এক জনের মৃত্যু হয়েছে ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল হুবেই প্রদেশের বাইরে। অর্থাৎ ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

চীনের করোনা ভাইরাসের আরও হাজার হাজার বাহক থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন হংকংয়ের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ওই ভাইরাস বিশ্বব্যাপী মহামারি আকার ধারণের আগেই ভ্রমণে কড়াকড়ি আরোপের আহ্বান জানান তারা। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এটা বিশ্বজুড়ে মহামারি আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। হংকংয়ের একজন বিশেষজ্ঞ বলেন সতর্ক করেছেন, মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত এই ভাইরাস ছড়িয়ে অন্যান্য শহরেও বিস্তার ঘটছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে যে এই বিশেষ রোগ বিশ্বব্যাপী মহামারি রুপ ধারণ করতে চলেছে।’

ইতোমধ্যে হুবেই প্রদেশের ৫ কোটি ৬০ লাখ মানুষের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আরও ২০ শহরে যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি উহানে আক্রান্তদের জন্য দুইটি হাসপাতাল প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন ঘোষণা দিয়েছে, তাদের জন্য ১০ হাজার বেড প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। আক্রান্তদের তথ্য বিশ্লেষন করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ৩ কোটি মানুষের শহর চংকিং হচ্ছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত শহর। তারা সতর্ক করে বলেছেন, উহান পর্যটন কেন্দ্র ও এর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকায় বেইজিং, সাংহাই, শেনজেনের মতো বড় শহরে দ্রুত এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দুনিয়া জুড়ে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস মানব শরীরে নানা ধরনের জটিলতার সৃষ্টি করে। একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়ে।

নাক-মুখ দিয়ে প্রবেশ করার পর শ্বাসতন্ত্রের যে কোনও একটি কোষকে টার্গেট করে এই ভাইরাস। সেই কোষটি তখন হয়ে ওঠে ‘হোস্ট সেল’। অতিথি এলে যেমন তাকে যতœআত্তি করতে হয়, শ্বসতন্ত্রে এই কোষটিও ভাইরাসের যতœআত্তি শুরু করে। অধিক যতœ পাওয়া ভাইরাসের কারণে ফুলেফেঁপে ওঠে হোস্ট সেল। শেষে এক সময় হোস্ট সেল ফেটে ভাইরাসকে উগড়ে দেয় বাইরে। হোস্ট সেলের কাছাকাছি থাকা সবক’টি সেলে তা ছড়িয়ে পড়ে।
ভায়রোলজিস্ট ও চিকিৎসকদের মতে, এই ভাইরাসের প্রধান ও অন্যতম উপসর্গ একটানা সর্দি-কাশি ও বুকে কফ জমে থাকা। সাধারণত কোনও প্রকার ওষুধেই শ্লেষ্মা সমস্যা না সারলে ‘পিসিআর’ বা পলিমারেস চেন রিঅ্যাকশন পরীক্ষা করে এই ধরনের ভাইরাসের অস্তিত্ব খোঁজা হয়।
সর্দি-কাশির উপসর্গ দিয়ে শুরু হলেও এই ধরনের ভাইরাসের কারণে তা দ্রুত বাড়ে। এক সময় প্রবল জ্বর ডেকে আনে। সঙ্গে শ্বাসকষ্টও থাকে। নাক থেকে পানি পড়া, বুকে কফ জমে যাওয়া, মাথা যন্ত্রণা, গলাব্যথা এগুলিও এর লক্ষণ। শ্লেস্মাজনিত অসুখ বেড়ে নিউমোনিয়ার দিকে বাঁক নেয় ও সিভিয়ার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত করে।

করোনা ভাইরাস চীন সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার কারনে বিভিন্ন দেশ বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। যার মধ্যে প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে চীনের সাথে সাধারন মানুষের যোগাযোগ সীমিত করা। একই সাথে চীনের নাগরিকেদের বিভিন্ন দেশে প্রবেশে অনানুষ্টানিক বিধিনিষেধ আরোপ করা। আবার চীন থেকে যারা আসছে তাদের সতর্ককতার সাথে পর্যবেক্ষনে রাখা। আসুন জেনে নেই বিভিন্ন দেশ কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'গ্লোবাল হেলথ ইমার্জেন্সি' এর মাধ্যমে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে,পরিস্থিতিকে মারাত্মক হিসেবে বিবেচনা করছে সংস্থাটি। এই ঘোষণার মাধ্যমে সরকারগুলো নিজ নিজ দেশের সীমান্ত বন্ধ, ফ্লাইট বাতিল, বিমানবন্দরে আগতদের পরীক্ষাসহ বিভিন্ন সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বের আকাশসেবা সংস্থাগুলো চীনে সব ধরনের সেবা বাতিল করতে শুরু করেছে। ম্যানুফ্যাকচারাররাও চীনা কার্যক্রমগুলো বন্ধ করছেন।

নতুন করোনা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চীন সম্পর্কে বৈরি মনোভাব বেড়ে যাচ্ছে। অনেক সময় তা বাস্তবিক উদ্বেগের মাত্রাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জাপানে টুইটার ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে ‘চীনারা জাপানে এসো না’ হ্যাশট্যাগ। সিঙ্গাপুরে কয়েক হাজার মানুষ দেশটিতে চীনা নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে একটি আবেদন করেছেন সরকারের কাছে। হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের ব্যবসায়ীরা একটি প্রতীক তুলে ধরছেন যাতে বলা হচ্ছে, চীনা ক্রেতাদের স্বাগত জানানো হবে না। ফ্রান্সে একটি আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকায় ‘হলুদ সংকেত’ প্রকাশ করে সতর্কতা জারি করেছে।

ভাইরাসের কারণে চীনে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের ধস বৈশ্বিক গাড়ি উৎপাদন ও প্রযুক্তি খাতকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভাইরাসের কারণে চীনের অর্থনীতি স্বল্পমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। যা দেশটির ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীগুলোও ক্ষতির মুখে পড়বে।