চীনের রোবোটিক ট্রেন নিয়ে দুনিয়া জুড়ে আলোচনা

চীনের চালকবিহীন স্বয়ংক্রিয় ট্রেন-সংগৃহীত -

রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে একের পর এক বিস্ময় সৃষ্টি করছে চীন। বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে দেশটি। বিশ্বের দ্রুত গতির রেল চালুর পর এবার তারা চালকবিহীন সর্বোচ্চ গ্রতির ট্রেন চালু করছে। যা দুনিয়া জুড়ে আলোচনার বিষয়ে পরিনত হয়েছে।

চালকবিহীন বা রোবটিক এ ট্রেন ঘন্টায় ৩৫০ কিলোমিটার বা ২১৭ মাইল বেগে ছুটে চলতে পারে। রাজধানী বেইজিং থেকে ঝাংজিয়াকু যেতে বর্তমানে যেখানে ৩ ঘন্টা সময় লাগে। সেখানে চালকবিহীন এ ট্রেনে সময় লাগে মাত্র ৪৭ মিনিট। বেইজিং থেকে ঝাংজিয়াকু দূরত্ব ১০৮ মাইল। ঝাংজিয়াকুতে ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শীতকালীন অলিম্পিক। আর সে লক্ষ্যেই এ রুটে চালূ করা হয়েছে অত্যাধুনিক আর স্বয়ংক্রিয় এ ট্রেন যোগাযোগ। এ ট্রেন শুধু যে বিশ্বের দ্রুত গতির রোবটিক ট্রেন তা নয় বরং এতে রাখা হয়েছে আধুনিক আর বিলাসী সব সুযোগ সুবিধা। সম্পূর্ণ উচ্চ প্রযুক্তির সাহায্যে চলবে এ ট্রেন যা সত্যিই অবাক করার মত। গত ৩০ ডিসেম্বর বেইজিং থেকে তাইজিচেং পর্যন্ত প্রথম চলাচল শুরু করে এ ট্রেন। এখানে অলিম্পিকের কিছু ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে।

বেইজিং থেকে ঝাংজিয়াকু রেল পথে বর্তমানে ৩০টি বুলেট ট্রেন চালু রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি রয়েছে বর্তমানে চালকবিহীন আধুনিক বুলেট ট্রেন । চালকবিহীন বা স্বয়ক্রিয় এ বুলেট ট্রেন সার্ভিস স্মার্ট ট্রেন নামেও পরিচিত। দ্রুত গতির এ ট্রেন ১৯টি নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত হবে। চীনের এ নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম সারা বিশ্বে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত।

স্বয়ংক্রিয় প্রতিটি ট্রেনে রয়েছে ৫জি সিগনাল, ইন্টেলিজেন্ট লাইটিং এবং ২ হাজার ৭১৮টি সেন্সর। এ সেন্সরের সাহায্যে প্রকৃত সময়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং একই সাথে পরিচালনাগত যে কোনো ধরনের বিঘœ ঘটা থেকে বিরত থাকা যায়। প্রত্যেকের সিটের সাথে রয়েছে টাচ স্ক্রিন কন্ট্রোল প্যানেল এবং তারবিহীন চার্জিং ডকস।
ট্রেনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়, স্বয়ংক্রিয়ভাবে থামতে পারে। শুধু তাই নয়, স্টেশনের কাছাকাছি আসা মাত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধীরে ধীরে গতি কমতে শুরু করে। যদিও এ ট্রেন রোবটিক বা স্বয়ংক্রিয় তবু একজন চালক সবসময় অবস্থান করবেন ট্রেনে পর্যবক্ষেনের জন্য। ট্রেনটি চালানোর সময় রোবোটের কাজে যাতে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা না দেয়। কিংবা প্রযুক্তিগত জটিলতা সৃষ্টি না হয় তা দেখবেন এই মানব চালক। ট্রেন চালানোর ক্ষেত্রে তার কোনো ভুমিকা থাকবে না।

এই ট্রেনের রয়েছে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ন বৈশিষ্ট্য। যেমন যাত্রীদের দিক নির্দেশনা দেয়ার জন্যও প্রতি স্টেশনে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় আয়োজন। এতে রয়েছে এমন এক ধরনের রোবট যা যাত্রীদের চেহারা সনাক্ত করে তাকে দিক নির্দেশনা দিতে পারবে। মালামালও বহন করতে পারেব এসব রোবট।

চালকবিহীন স্বয়ংক্রিয় এ ট্রেনের চীনা নাম ফাক্সিং হাও বা নবজীবন । চালকবিহীন প্রথম দুটি ট্রেনের নাম দেয়া হয়েছে যথাক্রমে ডলফিন ব্লু এবং গোল্ডেন ফনিক্স। এ ট্রেন তৈরিতে চার বছর সময় নিয়েছে চীন। অলিম্পিক প্রতিযোগিতাকে সামনে রেখে ট্রেনগুলো তৈরি করা হয়েছে। চীনের তিনটি শহর বেইজিং, ইয়ানকিং এবং ঝাংজিয়ানকুতে ২০২২ সালের শীতকালীন অলিম্পিক অনুষ্টিত হবে। এই তিনটি শহরকে যুক্ত করা হয়েছে অতি আধুনিক চালকবিহনী দ্রুত গতির এ ট্রেনের মাধ্যমে। এ তিন শহরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে মোট ১০টি স্টেশনে থামবে ট্রেন। এর মধ্যে একটি হলো চীনের মহাপ্রাচীরের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্পট বাদালিং চ্যাং চেং।

অলিম্পিক উপলক্ষে খেলোয়াড় ও সাংবাদিকসহ অন্যান্য যাত্রীদের কথা চিন্তা করে এতে রাখা হয়েছে বিশেষ আয়োজন। যাকে এক কথায় এলাহি কান্ড বলা যায়। কেবিনে রয়েছে নিজস্ব বাড়ি ঘরের মতো সুবিধা। অলিম্পিকের সময় ট্রেনে সাংবাদিকদের জন্য রাখা হয়েছে অত্যাধুনিক মিডিয়া সেন্টার যেখান থেকে লাইভ প্রচার করা যাবে।
এ ট্রেন চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন অবদান রাখবে। চীনে প্রথম রেললাইন নির্মিত হয় ১৯০৯ সালে বেইজিং থেকে ঝাংজিয়াকু পর্যন্ত। শুরুতে এ পথ অতিক্রম করতে সময় লাগত আট ঘন্টা। আর বর্তমানে চালকবিহীন ট্রেনে যেতে লাগবে মাত্র ৪৭ মিনিট। পুরনো এই রেললাইনের স্মরনে এ রুটেই চালু করা হয়েছে চালকবিহীন বিশ্বের দ্রুতগামী বুলেট ট্রেন।

বেইজিং-ঝাংজিয়াকু রুটে চাইলে চালকবিহীন দ্রুত গতির ট্রেনের পরিবর্তে চালকযুক্ত ধীর গতির ট্রেনেও যাতায়াত করতে পারবে । ধীর গতির এ ট্রেনের মধ্যে অন্যতম হলো ১৯০৫ থেকে ১৯০৯ সালে নির্মিত ট্রেন। ধীর গতির ট্রেনের যাত্রীরা উভভোগ করতে পারবেন যাত্রা পথের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। চালকবিহীন অতি দ্রুত গতির ট্রেন চীনের মহাপ্রাচীরের কাছাকাছি মাটির নিচ দিয়ে যাতায়াত করে। আর চালকযুক্ত ধীর গতির ট্রেন পুরো পথে যাতায়াত করে মাটির উপর দিয়ে ।

বিশ্বে মানবচালিত সর্বোচ্চ গতির ট্রেনেরও অধিকারী চীন। সাংহাই পুডং বিমান বন্দর থেকে লংগায়াং রুটের এ ট্রেনের গতি ঘন্টায় ৪৩১ কিলোমটিার বা ২৬৮ মাইল। এ ট্রেনের নাম সাংহাই মাগলেভ। চৌম্বক হালকাকরণ বা ম্যাগলেভ প্রযুক্তিতে চলে এ ট্রেন। ২০০৪ সালে চালু হয় ১৯ মাইল দীর্ঘ এ ট্রেন সার্ভিস।

২০১০ সালে চীন চালু করে বিশ্বের দ্বিতীয় দ্রুত গতির ট্রেন হারমনি। সাংহাই- নানজিং-হাংজু আর উহান-গুয়াংজু রুটে এ ট্রেনের গতি ঘন্টায় ২৩৬ মাইল। বিশ্বের অন্য কোন দেশ এখনে পর্যন্ত এ গতিও অতিক্রম করতে পারেনি। যদিও জাপান ঘন্টায় ২৪৯ মাইলের গতির ট্রেন পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়েছে তবে এর সার্ভিস শুরু হতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত লাগতে পারে।

চীনের পর বিশ্বে দ্রুত গতির ট্রেন রয়েছে জাপান, ইতালি, স্পেন, সৌদি আরব, জার্মান, দক্ষিন কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, আমস্টারডাম প্রভৃতি ।
বর্তমানে চীনে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দ্রুত গতির রেল নেটওয়ার্ক। চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সাল পর্যন্ত এ ধরনের রেলপথের দৈর্ঘ্য ছিলো মোট ৩৫ হাজার কিলোমিটার বা ২১ হাজার ৭৪৭ মাইল। পৃথিবীতে দ্রুত গতির যে পরিমান রেললাইন আছে তার তিন ভাগের দুই ভাগ রয়েছে চীনে।
চীনের মোট রেললাইনের দৈঘ্য ১ লাখ ৩৯ হাজার কিলোমিটার বা ৮৬ হাজার ৩৭০ মাইল। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি রেলনেটওয়ার্ক রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে । এর দৈর্ঘ্য ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯শ কিলোমিটার।
চীন দেশটির যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসাবে রেলনেটওয়ার্ক নির্মানে বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয় করে যাচ্ছে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশটিতে মোট ২৩ হাজার কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মানের পরিকল্পনা করা হয়।

চীনের বার্তা সংস্থা জিনহুয়া নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুসারে চীন ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রায় চার লাখ কোটি ইউয়ান ব্যয়ে ৩০ হাজার কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মান করা হয়েছে। যার অধিকাংশই দ্রুত গতিসম্পন্ন।