সাদা রাতের শহর মস্কো

মস্কোভা নদীর তীরে মস্কো - সংগৃহীত


মস্কোর শরীরজুড়ে বরফ আর ইতিহাস। শহরটি এখন ক্ষমতাধর দেশ রাশিয়ার রাজধানী। পাড়ি দিয়ে এসেছে নয়শ বছরের পথ। বরফে ঢাকা এই পথের সবটাই এখনো টাটকা। এ কারণে মস্কোকে বলা হয় জীবন্ত ইতিহাসের শহর।


তবে পুরনোতে থেমে নেই মস্কো। এগিয়ে চলছে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়েই। ওখানে যতোই তুষার ঝরুক, ব্যস্ততা থেমে নেই। বছরে নয় মাস শীতে জবুথবু মস্কোর জীবন ঝাঁ চকচকে। তুষারের পর্দার আড়ালে প্রাণের উচ্ছ্বাস। দিনের আলোয় ঝিম ধরে থাকলেও রাত নামলে জেগে উঠে শহর। আলোয় ভরপুর মস্কো ছড়ায় ঝলমলে রঙ। দিনের ক্লান্তি কাটাতে কেউ ঘরে ফেরে। কেউ যায় রাতের আড্ডায়। জিমে, থিয়েটারে অথবা নাইট ক্লাবে মস্কোর সড়কবাতিতে আলো জ্বলে। সাদা বরফে প্রতিফলিত হয়। ওই আলোর প্রতিফলন জোছনা রঙের। স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছে ‘সাদা রাত’।


সাদা রাতের মস্কোর দিনের রঙ পাল্টায় গ্রীষ্ম এলে। এই শহরের ঋতু চারটি। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীত। মার্চ থেকে মে বসন্ত। জুন থেকে আগস্ট গ্রীষ্ম। আর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত শরত। মূলত গ্রীষ্ম ও বসন্তের সময়টুকু ছাড়া সবটাতেই শীতের আধিপত্য। এপ্রিলের শুরু থেকে পাল্টাতে থাকে মস্কোর রঙ। বরফে ঢাকা মাটিতে আসে প্রাণ। গজায় সবুজ ঘাস। গাছে গাছে পাতা ফুটে। ফুল ফুটে। পাখি ডাকে। শীতের খোলস থেকে বেরিয়ে আসে রাশিয়ার রাজধানী।
এই রাজধানীকে দেখতে হলে বাইরের লোকদের জন্য ওই সময়টা আদর্শ। তবে গ্রীষ্মই হোক, কিম্বা শীত, মস্কো সারাবছরই সুন্দর। শহরটাকে এক নজর দেখার জন্য ভালো পথ মস্কোভা নদী।


হ্যাঁ, মস্কোভা নদীর তীরেই মস্কো। সুতরাং এই নদীতে নৌকা নিয়ে ভাসলে, মস্কোর সুন্দরের সবটাই আপনার কাছে ধরা দেবে। সাধারণত ট্যুর অপারেটররা নদীতে বিলাসবহুল ক্রুজের ব্যবস্থা রাখেন। ৩০০ স্কোয়ার মিটারের একেকটি ক্রুজে লোক ধরে ২০০ জনের মতো। রেডিসন হোটেল থেকে আপনাকে তুলে নিয়ে যাবে কোটেনিচেস্কায়া পিয়ারে। সময় লাগবে তিন ঘণ্টা। পুরো সময়টা হতে পারে আপনার জীবনের সেরা সময়। বিলাসবহুল নৌকায় বাজবে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। সময়ে সময়ে সামনে আসবে বাবুর্চিদের মুখরোচক রান্না। আর আপনি নদীতে ভাসতে ভাসতে দেখবেন রাশিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ক্রেমলিন, সেন্ট বেসিল দ্য গ্রেড ক্যাথেড্রাল, খৃস্ট দ্য সেভিয়ারের ক্যাথেড্রাল। দেখা যাবে লোমনোসভ বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান একাডেমির অনন্য দৃশ্য।


মস্কোর প্রকৃতি এবং ইতিহাস দু’টোই অনন্য। এই শহরটা গড়ে উঠেছিলো ১১৪৭ সালে। এই সময়ের মধ্যে এর ওপর দিয়ে বয়ে গেছে বহু ঝড়। মস্কোভা নদীর স্রোতের সঙ্গে ভেসে গেছে মানুষের রক্তও। একটা সময় পার হয়েছে ইউরোপিয় রাজাদের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। তারপর মোঙ্গলদের আক্রমণ। জারদের বিরুদ্ধে অগুণতি বিদ্রোহ। পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের সময়টাও লেখা আছে রক্ত দিয়ে।মস্কোর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ওইসব ঝড়ের সবটাই রাখা আছে যত্ন করে। খুঁচরা ইতিহাসের নমুনা পর্যন্ত সংগ্রহে আছে। হাজার বছরের পুরনো বাড়ি এখনো টিকে আছে রঙচঙে চেহারা নিয়েই। মস্কোতে এমন বাড়ির অভাব নেই।


রাশিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্র এবং সম্রাট ও তার সম্পদ দেখতে যাদের আগ্রহ তাদের যেতে হবে ক্রেমলিন প্রাসাদে। এই ‘ক্রেমলিন’ শব্দটি নিয়ে অনেকের বিভ্রান্তি রয়েছে। মস্কোর এই প্রাসাদ-ই কিন্তু রাশিয়ার একমাত্র ক্রেমলিন নয়। দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরের প্রতিটিতেই ক্রেমলিন আছে। ওইসব ক্রেমলিনকে ঘিরে আছে আঞ্চলিক ক্ষমতার কেন্দ্র। তবে বিশ্বের কাছে পরিচিত রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর ক্রেমলিন। যেখান থেকে বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে ভ্লাদিমির পুতিনের সরকার। শহরের শুরুর সময়েও দেয়ালঘেরা ওই এলাকাটাই ছিলো প্রধান কেন্দ্র। ক্রেমলিনের বড় আকর্ষণ প্রাসাদ। প্রাসাদের আঙিনায় ১৫ থেকে ১৬ শতকে নির্মিত চারটি অর্থোডক্স ও খৃস্টান গির্জা। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর গির্জাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। ইউনিয়নের পতনের পর খুলে দেওয়া হয়।

[ ভিডিও চিত্রে মস্কো দেখতে চাইলে বিডি ভিউজের ইউটিউব চ্যানেলে দেখুন ]


একটি গির্জা বাসিলিউস ক্যাথিড্রালে। কুখ্যাত সম্রাট বা জার ইভান দ্য টেরিবল এটি বানিয়েছিলেন। বানানোর পর কারিগরকে মেরে ফেলেছিলেন, যেন আর কেউ এমন স্থাপনা তৈরি করতে না পারে।জারদের অভিষেক ও বিয়ের অনুষ্ঠান হতো আর্কেঞ্জেল ক্যাথেড্রালে। ১৩৩৩ সালে মহা-মন্বন্তর কাটার পর এটি বানিয়েছিলেন মস্কোর গ্র্যান্ড ডিউক ইভান কালিতা। ধারণা করা হয় এই ক্যাথেড্রালটি মস্কোর রাজকুমারদের অভিভাবক আর্কেঞ্জেল মাইকেলকে নিবেদন করে বানানো হয়েছিলো।


দেশটির সর্বোচ্চ সরকারি অফিসগুলো এই ক্রেমলিনে। আড়াইশ একর জায়গাজুড়ে আছে আর্মারি অস্ত্রাগার। এর পুরোটাজুড়ে প্রাচীন রাজসম্পদের ভান্ডার। অলঙ্কারের চোখ ধাঁধানো সংগ্রহ। অস্ত্রাগারটি ১৫১১ সালে বানিয়েছিলেন মস্কোর গ্র্যান্ড প্রিন্স তৃতীয় ভ্যাসিলি। প্রথমে রাজকীয় অস্ত্র রাখা হতো। পরে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় রাজসম্পদের সংগ্রহশালায়।


মস্কোর ক্রেমলিন মানেই রেড স্কোয়ার। এই এলাকাটাকে বলা হয় রাশিয়ার হৃদয়। এর লাল রঙের তারার পেছনেই ক্রেমলিনের লাল প্রাচীর। বিপরীত দিকে বিলাসবহুল বিপণীবিতান। সন্ধ্যার পর রেডস্কোয়ার জ্বলে উঠে ঝলোমল সুন্দর। ধারণা করা হয় ‘রেড স্কোয়ার’ নামটিই এসেছে ‘সুন্দর’ শব্দ থেকে। প্রাচীন রুশ ভাষায় এলাকাটির নাম ছিলো ‘ক্রাসনায়া প্লোশচাদ’। এর অর্থ ‘সুন্দর স্কোয়ার’।


এই সুন্দর স্কোয়ারে দেখা মেলে লেনিনের মতো দেখতে এক লোকের। তিনি পেশায় গাড়ির মিস্ত্রি। তবে চেহারা লেনিনের মতো হওয়ায় তাকে ঘিরে চলে কৌতুহলী মানুষের উৎসব। তার নাম সের্গেই সালোভইয়ভ। তিনি লেনিন সেজে পর্যটকদের সঙ্গে ছবি তুলছেন।


প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক বেড়াতে যান ওখানে। নকল লেনিনের সঙ্গে ছবি তুলেন। তার আগে ছবি তুলেন আসল লেনিনের সমাধিতে। ক্রেমলিনের সামনে রাখা আছে তার মরদেহ। ১৯২৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত তার দেহটিকে রাসায়নিকের মাধ্যমে রেখে দেওয়া হয়েছে। সোভিয়েতের ইতিহাস জানতে চাইলে ভøাদিমির লেনিনের সমাধি হতে পারে আদর্শ।


মস্কোর পর্যটনের বড় আকর্ষণ রেড স্কোয়ার হলেও গোটা মস্কো শহর-ই পর্যটকদের ‘স্বর্গ’। শহরের রঙের ৪০ শতাংশই সবুজ। এ কারণে মস্কোকে ডাকা হয় সবুজের শহর। ওইসব সবুজ দেখতে পর্যটকরা যান মস্কোতে। এদের একটি দনস্কয় মঠ। সবুজের ভেতর গোলাপি ভবন। ওপরের দিকে কয়েকটি কালো মিনার। ওখানে হই-হই করা পর্যটকদের ভীর নেই। যারা একটু গভীর থেকে দেখতে চান, তারা যান এই মঠে। ওখানে সমাহিত আছে আলেকজান্ডার সোলঝেনিৎসিন। ১৫৯১ সালে মঠটি বানিয়েছিলেন কুখ্যাত জার ইভান দ্যা টেরিবলের ছেলে জার ফিউডো। তাতারদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ের স্মারক হিসেবে এটি বানানো হয়।


মস্কোর আরেক আকর্ষণ গোর্কী পার্ক। নব্বই দশকে গোর্কি পার্ক ছিলো প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায়। তবে এখন ফিরে পাচ্ছে যৌবন। এই পার্কটি রাশিয়ার রাজধানীর নতুন সময়ের প্রতীক। এতে চলে তরুণ-তরুণিদের সালসা নাচ।


সবুজ উদ্যানের ভেতর রাজবাড়ি ‘জারিতসিনো প্রাসাদ’। মস্কোর দক্ষিণ এলাকায় আশ্চর্য্য শৈলির এই প্রাসাদটি বানানো হয় ১৭৭৫ সালে। এটি এখন জাদুঘর। এখানে কয়েকটি মনোরম ভবনে আছে অপেরা হাউস। আছে পানির ফোয়ারা, গাছ ও সবুজ ঘাস। সঙ্গে অসাধারণ মিউজিক।


মস্কো শহরের নিচে আছে আরেক শহর। এই শহরটা মূলত মেট্রোরেল এলাকা। অন্যভাবে বললে বলা যায়, আস্ত এক শিল্পকর্ম। এতে আছে শ্বেতপাথর ও সোনার কারুকাজ। গোটা এলাকাটাকে ডাকা হয় ‘মস্কো মেট্রো’। এতে আছে ১৬টি সড়ক ও ২২৪টি স্টেশন। প্রতিদিন যাতায়াত করেন ৭০ লাখ যাত্রী। মাটির ওপরে থাকা লোকেরা ঢুকে যান কারুকাজ করা বিশাল অট্রালিকার ভেতর। সেখান থেকে লিফটে করে নামেন পাতালে। পাতাল থেকে ট্রেন ছাড়ে। এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে যায়। মেট্রোতে একবার উঠলে খরচ হয় ৫৬ রুবল। যে কোনো স্টেশনের ভাড়া এক-ই।


কোলাহল ভালো না লাগলে, আপনি চলে যেতে পারেন শান্ত এলাকায়। সময়টা কাটিয়ে আসতে পারেন বরফ টানা কুকুরের সঙ্গে। জানতে পারেন স্লেজিংয়ের দুর্দান্ত ইতিহাস। আর নামতে পারেন কুকুরের সঙ্গে দুঃসাহসিক অভিযানে।


ওইসব কুকুরের নাম ‘হাশকি’। এদের আলাদা বাড়ি আছে, মস্কো শহর থেকে একটু দূরে, মস্কোভা নদীর তীরেই। বরফের ওপর ওই বাড়ির মালিক নাতালিয়া। বাড়িটা কিন্তু কোনো চিড়িয়াখানা নয়। পরিত্যক্ত এবং হারিয়ে যাওয়া হাশকি কুকুরদের জড়ো করা হয়েছে এখানে। তারপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কুকুরগুলো নাতালিয়ার এলাকায় ভালো খেতে পায়। এ কারণে এরা মানুষদের ভালোবাসে। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের প্রতি এদের ভালোবাসার প্রকাশ মানুষদের চাইতেও বেশি।
নাতালিয়ার হাশকি পরিবার একেবারে রুপকথার মতো। এরা আপনাকে স্লেজে করে নিয়ে যাবে চার কিলোমিটার বরফপথ। অভিযান শেষে ফিরে আসার পর আপনার জন্য থাকবে ফায়ার প্লেস। সঙ্গে গরম চা এবং মিষ্টি।


এ তো গেলো একরকম অ্যাডভেঞ্চার। এবার বলা যাক, মস্কোর আরেক অ্যাডভেঞ্চারের গল্প।একটি দুঃসাহসিক ইতিহাস অভিযানে আপনি ডুব দিতে পারেন সোভিয়েত ইতিহাসের অন্ধকার গোপনীয়তায়। এর জন্য আপনাকে যেতে হবে ইউনিয়নের সময়কার গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সদর দফতর লুবিয়াঙ্কায়। সোভিয়েতের পতনের পর কেজিবি বিলুপ্ত হয়, এখন রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার নাম এফএসবি।


কেজিবির সদর দফতর নিয়ে পৃথিবীব্যাপি আছে আলাদা উৎসাহ। কিন্তু লুবিয়াঙ্কায় এখনো পর্যটক প্রবেশ নিষেধ। এই বাড়িটি তৈরি হয়েছিলো ১৯০০ সালে। প্রথম দিকে ছিলো বিমা সংস্থার সদর দফতর। নভেম্বর বিপ্লপের পর ১৯১৯ সালে বলশেভিক গুপ্ত পুলিশ ‘চেকা’ ওটা দখল করে। পরে গুপ্তচর বাহিনীর নাম বদলাতে থাকে। চেকা থেকে ওজিপিইউ, এককেভিডি, এমজিবি এবং সবশেষ কেজিবি। ইউনিয়নের পতনের পর একমাত্র দেশ হিসেবে বেলারুশের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এখনো কেজিবি নামেই রয়েছে।


সোভিয়েত সময়ে পৃথিবীব্যাপি ছিলো কেজিবির দাপট। এরা বৈধ ও অবৈধভাবে পৃথিবীর প্রায় সবগুলো দেশে কাজ করতো। আর নিজেদের দেশে যারা ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ছিলো, তাদের অনেককে নিয়ে এই সদর দফতরে নির্যাতন করা হতো। সেইসব নির্যাতনের চিহ্ন এখনো আছে।ভবনটির অনেক কিছু দেখতে দেওয়া না হলেও কিছু এলাকা দেখার অনুমতি আছে। গোয়েন্দা সদর দফতরের ওইসব এলাকা ধরে হাঁটলে দেখা মিলবে আন্ডারগ্রাউন্ড কারাগার, নির্যাতনের চিহ্ন। কেজিবি সম্পর্কে আগে যা শুনেছেন, এই ভ্রমণ আপনার চোখের সামনে তুলে ধরবে সেইসব চিত্র। আবার এমন চিত্রও এসে ধরা দিতে পারে, যা কখনো কল্পনাতেও আনতে পারেননি।