এরদোগান কী নতুন সুলতান?

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে এরদোগান - আনাদুলু

  • আলফাজ আনাম
  • ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:১৩


তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিজেপ তাইয়েপ এরদোগানকে পশ্চিমা বিশ্বে ডাকা হচ্ছে নতুন সুলতান হিসাবে। তিনি দেড় দশকের বেশি সময় ধরে তুরস্কের ক্ষমতায় আছেন। তার কর্তৃত্ববাদী শাসনের সমালোচনার পাশাপাশি তার রাজনৈতিক দর্শনকে নিউ অটমানিজম বা উসমানীয় সাম্রাজ্যর নীতি কৌশলে প্রভাববিত বলে মনে করা হয়। পশ্চিমা অনেক বিশ্লেষক মনে করেন তুরস্ক ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রভাব বাড়াচ্ছে। আরব দেশগুলো এখন তুরস্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তুরস্ক কি সত্যিই অটোম্যান সাম্রাজ্যর মতো প্রভাব বিস্তারের মতো অবস্থায় গেছে? ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থল হিসাবে তুরস্কের ভূকৌশললগত অবস্থান আর্ন্তজাতিক রাজনীতিতে দেশটিকে গুরুত্বপূর্ন করে তুলেছে। ১৯৫২ সালের ন্যাটো জোটে যোগ দেয় তুরস্ক। এরপর থেকে দেশটি এই সামরিক জোটের ইস্টার্ন কমান্ড হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। ন্যাটোতে যোগ দেয়ার পর তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে কৃষ্ণসাগর, আজিয়ান সাগরসহ ওই অঞ্চলের বিস্তীর্ন বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে। বর্তমানে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আয়তনের দিক থেকে তুর্কি সামরিক বাহিনীর অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই। তুরস্কে মোট ২৪টি ঘাঁটি রয়েছে ন্যাটোর।


বিশ্বের নৌ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ন বসফরাস ও দার্দেনেলিস প্রনালীর ওপর তুরস্কের কর্তৃত্ব নৌ শক্তির ক্ষেত্রে দেশটির কৌশলগত শক্তি বহুগুন বাড়িয়েছে। ইস্তাম্বুল থেকে উসমানীয় শাসকরা ৭০০ বছর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো শাসন করেছে। এছাড়া পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর ওপর তুরস্কের রয়েছে বিশেষ দূর্বলতা। স্বাভাবিকভাবে এসব দেশের সাথে সর্ম্পকের ক্ষেত্রে তুরস্কের আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে।


ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে যে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় তুরস্কের বিশেষ ভুমিকা বা গুরুত্ব থেকে। প্রেসিডেন্ট এরদোগানের শাসনামলে এই প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা আরো বেড়েছে। যা দৃশ্যমান হয়ে উঠে আরব বসন্তের সময়। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে যে গন আন্দোলন গড়ে উঠে তাতে তুরস্কের ভুমিকা কোনো গোপন বিষয় ছিলো না। এ অঞ্চলের ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সাথে তুরস্কের রয়েছে ঘনিষ্ট যোগাযোগ।


ভূকৌশলতগত অবস্থানের গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে তুরস্ক আবার উসমানীয় সাম্রাজ্যর মতো এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক অভিযোগ করছেন। উদহারন হিসাবে তুরস্ক কিভাবে এ অঞ্চলে সামরিক ও নৌঘাটি স্থাপন করছে তার উদহারন টানা হচ্ছে। আসুন আমরা জেনে নেই কোথায় কোথায় তুরস্কের এমন কৌশলগত অবস্থান রয়েছে।


অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক বলছেন তুরস্ক খুব পরিকল্পিতভাবে পারস্য উপসাগর, হর্ন অব আফ্রিকা, ককেসাশ, লোহিত সাগর ও ভুমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করে সামরিক ঘাটি নির্মান করছে। যার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বের জ্বালানী নিয়ন্ত্রনের পথগুলোর সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করা। এছাড়া জ্বালানী উৎপাদকারী দেশ যেগুলো এক সময় উসমানীয় সাম্রাজ্যর অধীনে ছিলো সে সব দেশের সাথে সামরিক সর্ম্পক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।  ভূখন্ডগত সম্প্রসারন তাদের লক্ষ্য বলে পশ্চিমা অনেক বিশ্লেষক অভিযোগ করছেন। বিশেষ করে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে তুরস্কের অভিযান শুরু হওয়ার পর এমন অভিযোগ আরো জোরদার হয়েছে। তুরস্ক বলছে দেশটিতে আশ্রয় নেয়া ৩৬ লাখ শরনার্থীকে তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে নিরাপদ অঞ্চল গঠনের জন্য সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে অভিযান চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ এলাকা তুরস্কের নিয়ন্ত্রনে এসেছে। এর আগে সিরিয়ার আফরিন শহর তুরস্ক নিয়ন্ত্রনে নেয় এবং সিরিয়ার শরনার্থীদের পুর্নবাসন করে।


ইরাকে ১৯৯০ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তি মিশনের আওতায় তুরস্কের সৈন্যরা অবস্থান করছে। ইরাক সরকার তুরস্কের সৈন্যদের অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছে। আলাদা কুর্দি রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টায় ইরাক ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কুর্দিস্থান ওয়াকার্স পার্টি বা পিকেকে উন্থান ইরাকের জন্য হুমকি। উত্তর সাইপ্রাস ১৯৭৪ সালে তুরস্ক নিজের নিয়ন্ত্রনে নেয়। এ নিয়ে গ্রিসের সাথে তুরস্কের বিরোধ অনেক পুরানো। পূর্ব ভুমধ্যসাগর উপকূলে নতুন একটি গ্যাস ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে ইসরাইল ও সাইপ্রাসের সাথে তুরস্কের বিরোধ রয়েছে।


ন্যাটোর আওতায় আফগানিস্তানে তুরস্কের সৈন্যরা অবস্থান করছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তুরস্ক আফগানিস্তানে সৈন্য উপস্থিতির মেয়াদ বাড়িয়েছে। এছাড়া আফগানিস্তানসহ মধ্যএশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলের দেশ আজারবাইজান, কাজাকস্তান, মঙ্গোলিয়া, উজবেকিস্তান ও জর্জিয়ার সাথে তুরস্ক ঘনিষ্ট সামরিক সর্ম্পক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।


সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত সর্ম্পকের নানামুখী মেরুকরনে তুরস্কের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব রয়েছে আরব দেশগুলো। এর প্রধান কারন আরব দেশগুলোতে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে তুরস্কের রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। এছাড়া ফিলিস্তিন সঙ্কট নিয়ে আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে তুরস্ক এখন সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। যা আরব শাসকদের আভ্যন্তরিন ভাবে চাপে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইলের সাথে এসব দেশের সর্ম্পক আরো ঘনিষ্ট হচ্ছে।


অনেক বিশ্লেষক মনে করেন প্রেসিডেন্ট এরদোগানের মধ্যে রয়েছে উসমানীয় সাম্রাজ্যর প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাংঙ্খা। মধ্যপ্রাচ্যের আরব শাসকরা তাকে দেখছেন ভয়ের চোখে। লোহিত সাগরের উপকূল ঘিরে তুরস্ক-কাতার মিত্রতার বিপরীতে সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও মিশর এক সাথে সাথে তুরস্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অপরদিকে ভুমধ্যসাগরে তুর্কি উপস্থিতির বিপরীতে গ্রিস- সাইপ্রাস-ইসরাইল ঐক্য গড়ে তুলছে।


এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে তুরস্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা কিংবা কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত দূর্বল। বিশেষ করে আরব দেশগুলোর অবস্থান মোটেই সংঘত নয়। সম্প্রতি উত্তর সিরিয়ায় তুরস্কের অভিযানের পর আরব দেশগুলো কুর্দিদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সিরিয়ার অখন্ডতার পক্ষে কথা বলেছে। বিস্ময়রকর ভাবে ইসরাইল যখন সিরিয়ায় হামলা চালিয়েছে তখন এসব আরব দেশ ছিলো নিশ্চুপ। আবার ইরানের সবচেয়ে ঘনিষ্ট মিত্র হচ্ছে সিরিয়া।
মধ্যপ্রাচ্যে এখন সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় রাশিয়া। ইরান ও সিরিয়ার সাথে রাশিয়ার মিত্রতা অনেক পুরানো। সিরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহারের পর রাশিয়ার প্রভাব আরো বেড়েছে। অপরদিকে রাশিয়ার সাথে তুরস্কের ঘনিষ্টতা বাড়ছে। যা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সর্ম্পকে রুপ নিয়েছে। অপরদিকে ইরানের সাথে তুরস্ক ভারসাম্যমুলক সর্ম্পক বজায় রেখে চলছে। তুরস্কের মতো কূটনৈতিক দক্ষতা আরব দেশগুলোর পক্ষে দেখানো সম্ভব নয়।


মধ্যএশিয়া, বলকান ও ককেশাস অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে তুরস্কের এই সর্ম্পকের পাশাপাশি পারস্য উপসাগর ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সাথে তুরস্ক কৌশলগত মিত্রতার সর্ম্পক গদে তুলেছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকরা এই প্রচেষ্টাকে দেখছেন তুরস্কের নতুন উসমানীয় উচ্চাকাঙ্খার অংশ হিসাবে।


পারস্য উপসাগরের দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র কাতার একমাত্র তুরস্কের ঘনিষ্ট মিত্র। আরব বসন্তের তুরস্কের মতো কাতারের সমর্থন ছিলো। ২০১৭ সালে কাতারে সামরিক ঘাটি স্থাপন করে তুরস্ক। কাতারের ওপর সৌদি আরবের নেতৃত্বে অবরোধ আরোপের প্রেক্ষিতে তুরস্কের সাথে কাতারের এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সর্ম্পক গড়ে উঠে।


তুরস্ক ২০১৭ সালে সোমালিয়ার মোগাদিসুতে সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাটি স্থাপন করে। যেখানে ১০ হাজার সোমালি সৈন্যকে প্রশিক্ষন দেয়া হয়। সোমালিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতিকে দেখা হচ্ছে হর্ন অব আফ্রিকা ও এডেন উপসাগরে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসাবে।


একই বছর সুদানের সোয়াকিন দ্বীপ ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেয় তুরস্ক। এটি উসমানী আমলে একটি সামরিক ঘাটি ছিলো। লোহিত সাগরে তুরস্কে সামরিক ঘাটি স্থাপনের পরিকল্পনা হিসাবে এটি লিজ নিয়েছে বলে মনে করা হয়। এই দ্বীপ লিজ দেয়ার সিদ্দান্তের পর সুদানের ওমর হাসান আল বশির সরকারকে উৎখাতে আরব দেশগুলো তৎপর হয়ে উঠে। ওমর বশির সরকার উৎখাতে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত বিশেষ ভুমিকা পালন করে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন ভুমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরকে কেন্দ্র করে মুক্তোর মালার মতো তুরস্ক তার সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালে তুরস্কের যুদ্ধজাহাজের কমিশনিং উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্টানে এরদোগান বলেন তুরস্কের নৌবাহিনী সুয়েজ খাল থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। উসমানীয় আমলে তুরস্কের নৌশক্তির পরিসীমা এমন ছিলো।