কাজাখস্তান : নতুন-পুরানে ঘেরা, রহস্য-রোমাঞ্চে ভরা 

কাজাকস্তানের রাজধানীর দৃশ্য - সংগৃহীত

 

মধ্য এশিয়ার দেশের অনেক দেশের নামই আমাদের অনেকেই বেশ পরিচিত। উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান - এসব দেশের নাম শুনলেই আমাদের নাকে এসে লাগে লাগে আপেল-আঙ্গুর-আখরোট ইত্যাদির অলৌকিক সৌরভ। আমাদের মনের চোখে ভেসে ওঠে না-দেখা অথচ কত পরিচিত বোখারা-সমরখন্দের অপার্থিব ছবি। ভাবতে চাই, সেসব দেশ এখন দেখতে কেমন? 

চলুন আজ ঘুরে আসা যাক সেসব দেশের একটি - কাজাখস্তানে। সুপ্রাচীন বাণিজ্যপথ সিল্ক রুটের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। সেই সিল্ক রুটের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কাজাখস্তান। সিল্ক রুট আজ আর নেই; হারিয়ে গেছে কালের ধূলোর নিচে। কিন্তু আছে কাজাখস্তান, সময়ের সাথে সাথে যা এখন পরিণত হয়েছে মধ্য এশিয়ার অন্যতম-প্রধান আকর্ষণীয় গন্তব্যে। অনেকের জানা নেই যে কাজাখস্তান দেশটির বিচিত্র শোভা পর্যটকমাত্রকেই প্রতিনিয়ত হাতছানি দিয়ে ডাকে।


কাজাখস্তানের আয়তন ১১ লাখ বর্গমাইল। এটি বিশ্বের নবম বৃহত্তম দেশ। এত বিপুল আয়তন যার, তার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে প্রান্তরে প্রকৃতি নানা রূপে নিজেকে প্রকাশিত করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। ঠিক তা-ই ঘটেছে কাজাখস্তানের বেলায়ও। এর রয়েছে পর্বতসারি। সেসব পর্বতের চূড়ায়  জমে আছে বরফ, দেখলে মনে হয় যেন সাদা টুপি পরে আছে পর্বতমালা। আছে জলভর্তি গভীর গিরিসঙ্কট। আরো আছে মাইলের পর মাইল তৃণভূমি। আছে রুক্ষ শুষ্ক মরুভূমি। এতোই বিপুল সেই মরু, যদি তাকে আমেরিকার ওপর বসিয়ে দেয়া হয় তাহলে তা সেদেশের উটাহ থেকে ইওমিং, মিনেসোটা থেকে টেক্সাস পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা ঢেকে ফেলবে। 


যদি যান কাজাখস্তান, দেখতে পাবেন সবই। পরিচিত হতে পারবেন কাজাখদের হাজার বছরের পুরনো যাযাবর সংস্কৃতির সাথে। খেতে পারবেন এমনসব খাদ্য, যা অন্য সময় আপনি মুখেই তুলতেন না।


আর? আর আপনি ভ্রমণে যেতে পারবেন কাজাখস্তানের সিটি অব দ্য ফিউচার বা ভবিষ্যতের নগরীতেও। কিভাবে, সে কথায় পরে আসা যাবে। সব মিলিয়ে একথা নিশ্চিত করেই বলা যায়, মধ্য এশিয়ার রোমাঞ্চ উপভোগ করতে চাইলে কাজাখস্তানকে বাদ দেয়াই যাবে না, ওখানে আপনাকে স্টপওভার করতে অর্থাৎ থামতেই হবে।


শুরুতেই বলা হয়েছে, কাজাখস্তানের প্রাচীন জীবনধারা হচ্ছে যাযাবরের। যুগের হাওয়ায় সেই জীবনের অনেককিছু উড়ে গেলেও কাজাখরা তাদের হারানো দিনকে হারিয়ে যেতে দিতে চায় না। তাই আজকের দিনে এসেও তারা তাদের তৃণভূমির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। আর করেনি ঘোড়ার সাথে। এই রুক্ষ দেশটিতে ঘোড়া যে কাজাখদের বেঁচে থাকার বড় অবলম্বন! একটা সময় ছিল যখন কাজাখরা এই ঘোড়া থেকে পেত খাদ্য অর্থাৎ দুধ ও মাংস, ঘোড়ার পিঠে চড়ে চলে যেত দূরদূরান্তে, মালামাল পরিবহনও হতো ঘোড়ার পিঠেই। এককথায় বলা যায়, যাযাবর কাজাখদের সাথে লাখো বছর ধরে আছে ঘোড়া। জানা যায়, খ্রিস্টজন্মের প্রায় ছয় হাজার বছর আগে ঘোড়াকে পোষ মানিয়েছে মানুষ। 


পুরনো দিনের কথা কিছু তো হলোই, এবার আসা যাক আধুনিক কাজাখস্তানে। চলুন যাই কাজাখস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় মেংগিস্তাউ অঞ্চলে। ওখানে আছে কারাজিয়ে ট্রেঞ্চ বা পরিখা। এ ট্রেঞ্চটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৩৩ ফুট নিচু এবং এটিই পৃথিবীর সপ্তম গভীরতম স্থান। আর অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নে এটাই ছিল গভীরতম স্থান। এর জন্ম যে অনেক প্রাচীনকালে তা এর চুনাপাথরের ঢাল ও লবণের মজুত দেখে অনুমান করা যায়। বোঝা যায়, একসময় কারাজিয়ে ট্রেঞ্চ ছিল কাস্পিয়ান সাগরের তলায়। ভূগর্ভস্থ পানি নিষ্কাশন প্রক্রিয়ার কারণে সৃষ্ট অসংখ্য ফানেল বা সুড়ঙ্গের কারণে পুরো এলাকাটিকে চাঁদের পিঠের মতোই অদ্ভুত দেখায়। আর এসব দেখতে এখানে পর্যটকের ঢল নামে।


তবে কারাজিয়েই এ অঞ্চলের একমাত্র আকর্ষণীয় নিম্নাঞ্চল, তা নয়। ওখান থেকে ১৩০ মাইল পশ্চিমে, ওগলান্দি এলাকায় গেলেই দেখা মিলবে একটি কবরস্থান এবং একটি আন্ডারগ্রাউন্ড বা ভূগর্ভস্থ মসজিদের। নাম বেকেত আতা মসজিদ। বেকেত আতা ছিলেন অষ্টাদশ শতকে ওই এলাকার একজন সুফী সাধক। সর্বজনশ্রদ্ধেয় এই দরবেশ ওই অঞ্চলে কয়েকটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে যান।


পৃথিবীর সপ্তম গভীরতম স্থান তো ঘোরা হলো, এবার চলুন ওঠা যাক কাজাখস্তানের সবচাইতে উঁচু পর্বতে। কাজাখস্তানের দক্ষিণে কিরগিজস্তান ও চীনের সীমান্তে তিয়ান শান পার্বত্য অঞ্চলে এটির অবস্থান। মাথায় সাদা বরফের টুপি পরা এ পর্বতের নাম খান টেংরি। এর উচ্চতা প্রায় ২৩ হজার ফুট। যারা এটিতে চড়েছে তারা এর অপরূপ সৌন্দর্যে অভিভূত। তারা বলে, এটিই পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর পর্বতচূড়া।


মজার ব্যাপার হলো, অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের জীববিজ্ঞানীরা তিয়ান শান পার্বত্য অঞ্চলের উর্বর ভূমিকেই মনে করতেন 'আপেলের জন্মস্থান' বলে। ২০১০ সালে স্থানীয় বুনো জাতের আপেল মালুস সিভারসি-র জেনোম সিকোয়েনসিং বা জন্মরহস্য উদঘাটন সম্পন্ন হলে দেখা যায়, এটি দেশী জাতের আপেল ম্যালুস ডোমেস্টিকা-র ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।


জার সম্রাটদের উৎখাত করেই যদিও কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়, উভয় গোষ্ঠীর শাসকদের মধ্যে একটা বিষয়ে মিল ছিল। সেটা হলো অ্যাপ্রট নামে স্থানীয় একজাতের আপেল। এর প্রকাণ্ড আকৃতি,  রসালো মাংস এবং চারদিক মাতোয়ারা করা সৌরভের জন্য জার সম্রাট এবং সোভিয়েত নেতৃবৃন্দ - উভয়েরই প্রিয় ছিল অ্যাপ্রট আপেল। আপনিও যদি কাজাখস্তান যান, তবে পুরনো রাজধানী আলমাতি-র সবচাইতে বড় বিপণী গ্রীন বাজারে পাবেন অ্যাপ্রট আপেল।


এবার একটু কাজাখস্তানের মরু এলাকা ঘুরে দেখা যাক। মরুভূমি পৃথিবীর আরো অনেক দেশেই আছে, কিন্তু কোথাও কি মরু-বালিয়াড়ির 'গান' শোনা যায়? কাজাখস্তানে কিন্তু এমন-একটা বিরল অভিজ্ঞতার অধিকারী হতে পারেন আপনি। কিভাবে, বলছি শুনুন।


কাজাখস্তানের দু'টি প্রাচীন নদী - আমু দরিয়া ও সির দরিয়ার মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থিত কিজিলকুম মরুভূমি। এটি ওই দেশের সবচাইতে গরম এলাকা। গ্রীষ্মে এর তাপমাত্রা প্লাস ১২৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠে।

 

সেই কিজিলকুম মরুভূমির পূব দিকে অবস্থিত আলতিন-এমেল ন্যাশনাল পার্ক। এর কাছেই পুরনো রাজধানী আলমাতি। সেখান থেকে লোকজন প্রায়ই পার্কে আসে গায়ক ব্রাচান রহস্য দেখতে। কী সেই রহস্য?


আবহাওয়ার একটি বিশেষ অবস্থায় ব্যাপারটি প্রত্যক্ষ করা যায়। আবহাওয়া যখন শুষ্ক হয়ে যায় এবং ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে, তখন দেখা যায়, দু'মাইল এলাকার বালিয়াড়িগুলোর বালি প্রায় ৪০০ ফুট উঁচুতে উঠে গিয়ে ওড়াউড়ি করতে থাকে। এরকম অবশ্য সব মরুভূমিতেই হতে পারে। কিন্তু এখানে তার সাথে আরো যেটা হয় সেটা হলো, এ সময় একটা ভারি গলার আওয়াজের গুনগুন শব্দের মতো শোনা যেতে থাকে। এটাই হলো বালিয়াড়ির 'গান'।


জলে-স্থলে-মরুতে তো অনেক হলো। ক্লান্তি লাগছে না! চলুন একটু গলা ভেজানো যাক। এতক্ষণে তো জেনেই গেছেন যে, লাখো বছর ধরে যাযাবরের জীবনযাপন করেছে কাজাখরা। ঘোড়া ও উটের পাল নিয়ে তৃণভূমি থেকে তৃণভূমিতে ছুটেছে, পাড়ি দিয়েছে দুস্তর মরু। আজকাল সেই যাযাবরজীবনেও এসেছে স্থিতি। তবে তারা ভুলে যায়নি যাযাবর সংস্কৃতি। তাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনে তা স্পষ্ট। যেমন, যাযাবরকালের মতো এখনও কাজাকস্তানের জনপ্রিয় পানীয় হলো 'কুমিজ' ও 'সুবাত'। প্রথমটি ঘোড়ার এবং পরেরটি উটের ফারমেন্টেড বা গেঁজানো দুধ। বেশিরভাগ রেস্তোরাঁয়, এমনকি রাস্তার ধারের স্ট্যান্ডেও এ দু' পানীয় পাবেনই। পুষ্টি ও ওষুধী গুণের জন্য 'সুবাত'কে বলা হয় 'সাদা সোনা'। এটি নিয়মিত পান করলে অনেক কঠিন রোগও কাছে ঘেঁষতে পারে না বলে মনে করা হয়।


প্রিয় শ্রোতা-দর্শক, এবার আপনিই বলুন, কুমিজ ও সুবাত দিয়ে একটু গলা ভেজাবেন কি না। এখানে সিদ্ধান্তটি একান্তই আপনার। কিন্তু যদি কখনো কোনো কাজাখ পরিবারে 'দস্তরখানে' অর্থাৎ আপনার সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজে আমন্ত্রিত হন, তখন? তখন অবশ্যই আপনার সামনে পরিবেশন করা হবে 'বেসবারম্যাক' অর্থাৎ আলু ও পেঁয়াজ সহযোগে বানানো ঘোড়ার মাংসের স্টূ। পাশেই থাকবে একই মাংসের সসেজ।


বলে রাখি,  কাজাখরা আমাদের দেশের মতো ঘোড়ার মাংসকে 'মাকরুহ' বা প্রায়-নিষিদ্ধ মনে করে না, বরং তারা মনে করে, গরু ও ভেড়ার মাংসের চাইতে ঘোড়ার মাংস স্বাস্থ্যকর। তাই তাদের যে কোনো বড় বা বিশেষ অনুষ্ঠানে ঘোড়ার মাংসের পদ থাকবেই। তাই কখনো কোনো কাজাখ বাড়িতে আমন্ত্রিত হলে ঘোড়ার মাংস খেতে ভুলেও অস্বীকার করবেন না। করলে তারা সেটাকে ভালোভাবে নেবে না।

 

ভোজনপর্ব এখানেই শেষ, চলুন যাওয়া যাক তারার মেলায়। এই তারা-রা কিন্তু নাটক-সিনেমার নায়ক-নায়িকা নয়। তবে? তবে শুনুন - কাজাখস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে বাইকোনুর নামে একটি ছোট শহরের কাছে  ১০০ বর্গমাইল এলাকা ইজারা নিয়ে রাশিয়া গড়ে তুলেছে রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র। এখানে আবার কাজাখস্তানের কিছু বেসরকারি কম্পানি পর্যটকদের জন্য কয়েক দিনের প্যাকেজে এলাকাটি ঘুরে দেখা এবং রকেট উৎক্ষেপণের সব ধাপ দেখানোর ব্যবস্থা করে থাকে। চাইলে আপনিও এভাবে যেতে পারেন 'তারার কাছাকাছি'। 


প্রিয় শ্রোতা-দর্শক, আমরা কাজাখস্তান ভ্রমণের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। তার আগে যাওয়া যেতে পারে শুরুতে যে 'ভবিষ্যতের নগরী'র কথা বলা হয়েছে, সেদিকে। সেটি আর কিছু নয়, কাজাখস্তানের নতুন রাজধানী অ্যাসতানা।


একসময় কাজাখস্তানের রাজধানী ছিল আলমাতি। দেশটির প্রেসিডেন্ট নূরসুলতান নাজারবায়েভ ১৯৯৭ সালে সিদ্ধান্ত নিলেন রাজধানী সরানোর। নতুন রাজধানীর স্থান নির্ধারণ হলো এক তৃণভূমিতে, যেখানে সারাক্ষণ ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে।  হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয়ে এখন গড়ে উঠছে নতুন রাজধানী অ্যাসতানা। বিশাল ও বিচিত্র নির্মাণপরিকল্পনার অনেক কিছুই এখন দৃশ্যমান। তবে সেসব নিয়ে আরেকদিন হাজির হবো আপনাদের সামনে।